চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি ও বামপন্থিদের দায়
মো. কিবরিয়া
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এক গভীর সম্ভাবনা ও সংকটের যুগসন্ধিক্ষণে প্রবেশ করেছিল। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের মরণপণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল।
ইতিহাস একথা বলে যে- যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আগে পরে যে কোন সময় গণবিস্ফোরণ ঘটাটা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই গণবিস্ফোরণের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো দুর্বল থাকলে, সেই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী ও নয়া উদারবাদী শক্তির দুরভিসন্ধিমূলক হস্তক্ষেপের সুযোগ তদানুপাতে কম বেশি হয়। একারণেই নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এক নয়; আবার ইরাক, আফগানিস্তান বা ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাস্তবতাকে হুবহু মেলানো যাবে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি স্বতন্ত্র বাস্তবতা- যাকে কোন একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলে ব্যাখ্যা করলে গণঅভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বহুমাত্রিকতা বোঝা যাবে না। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও কর্তাসত্তাকে স্বীকৃতি দিয়ে, জনগণের সাথে দেশি-বিদেশি কায়েমি স্বার্থবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীসমূহের বাস্তব দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমেই এই অস্থির সময়কে আমরা বুঝতে পারব।
একথা সকলেরই উপলব্ধিতে আনা জরুরি যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা ইশতেহার সামনে নিয়ে হয়নি। পুরো জুলাই মাসে কোনো বিপ্লবী কর্মসূচি, ক্ষমতার পালাবদলের কোনো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জনগণের সামনে হাজির ছিলো না। স্বৈরাচারের পতনের পর ক্ষমতাপ্রশ্নের সমাধান কিভাবে হবে, কিংবা রাষ্ট্র ও রাজনীতির ক্ষেত্রে কী কী মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হবে, সে বিষয়ক কোন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়াই মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্যাম্প ও মতাদর্শের মানুষের নানামাত্রিক সুপ্ত আকাঙক্ষা ছিলো বটে, কিন্তু কোটা সংস্কারের প্রাথমিক দাবি ছাপিয়ে মূর্তভাবে এক দফা, অর্থাৎ স্বৈরাচারী রেজিমের পতনই ছিলো মাঠে নামা জনগণের মূল লক্ষ্য। সারা দেশের মানুষ প্রাথমিক যে লক্ষ্যে মাঠে নেমেছিলো, বিগত রেজিমের পতনের মধ্য দিয়ে তা অর্জিত হয়েছিলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠী নানাভাবে এই অভ্যুত্থানে ভূমিকা পালন করলেও, সাধারণ মানুষ কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির উপর এককভাবে নির্ভর না করে, নিজেই সক্রিয় কর্তাসত্তা হয়ে তার আশু লক্ষ্য আদায় করে নিয়েছিলো। যারা নেমেছিল, ভুল বুঝে নামেনি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই নেমেছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামার অর্থ হচ্ছে বিগত রেজিমের পতনকে বেগবান করা–তা নিয়ে কোন সংশয় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছিলো না।
তবে, সুনির্দিষ্ট ইশতেহার না থাকলেও মোটাদাগে বৈষম্যবিরোধী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়বার আকাঙ্ক্ষা জুলাইয়ে বিভিন্ন গান, স্লোগান, গ্রাফিতিতে প্রকাশিত হয়েছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় কারা আসবে, কোন প্রক্রিয়ায় আসবে, কোন পথে আগামীর বাংলাদেশ চলবে তা নিয়ে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ঐকমত্য ছিলো না, কিছুক্ষেত্রে ছিলো মৌলিক বিরোধ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সরকার পতনে মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে জনগণ আর কর্তাসত্তার ভূমিকায় থাকতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানের পর পরই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়েছিল জনগণের সক্রিয় ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করেই। এমনকি শেখ হাসিনা দেশত্যাগের আগেই পশ্চিমা সমর্থিত অলিগার্কি ও দক্ষিণপন্থি শক্তির অক্ষ রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। ৫ আগস্ট (কেউ বলে আগস্টের প্রথম দিকেই) থেকেই সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির এক অংশ ও পশ্চিম অনুগত ধনিক শ্রেণির অভিজাতগোষ্ঠীর কাছে প্রকৃত ক্ষমতা চলে গিয়েছিল, যারা কাজে লাগিয়েছে ও ক্ষমতায়িত করেছে উগ্র দক্ষিণপন্থি গোষ্ঠীকে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার ছিল মূলত “উগ্র দক্ষিণপন্থি জনতুষ্টিবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তির সহায়তায় গঠিত, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমর্থিত নয়া উদারবাদী অভিজাততন্ত্র’-এর শাসন। বস্তুতঃ এই শাসনের অন্যতম লক্ষ্য ছিলো এদেশে নয়া উপনিবেশিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, এবং দেশের রাজনৈতিক অভিমুখকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত করা, এ নিয়ে এখন আর কোনো সংশয় নেই।
রাষ্ট্রক্ষমতার উপর এই দখল পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যেই গণআন্দোলনের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্রকে একটি তথাকথিত “মেটিকুলাস ডিজাইন তত্ত্ব”-এর কাঠামোতে আবদ্ধ করে তার সমস্ত কৃতিত্ব গুটিকয়েক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। পরিণতিতে, গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক- জনগণ ও তাদের বৈষম্যবিলোপের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা- ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বয়ান থেকে মুছে যেতে থাকে। পরাজিত বা বিতাড়িত শক্তিগুলোও অপরাধ বা ভুল স্বীকার না করে নিজেদেরকে নিছক ‘‘ষড়যন্ত্রের শিকার’’ হিসেবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে এই ‘‘মেটিকুলাস ডিজাইনের’’ বয়ানকে সমর্থন করে। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুটিকয়েকের সম্মতিকেই “গণসম্মতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ছক অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত লাভ করে।
ক্ষমতা সংহত করার সাথে সাথেই শাসকশ্রেণি উগ্র দক্ষিণপন্থা ও মববাজি-মাস্তানিকে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় দিতে শুরু করে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করে রাজনীতির গতিমুখকে পশ্চিমা-প্রতিক্রিয়াশীলতা অভিমুখী করে ফেলা হয়। পরিবর্তনকামী জনগণকে বিভ্রান্ত, সন্ত্রস্ত ও বিভাজিত করে সংস্কারের নামে রাষ্ট্রকে শুধু লুটেরা পুজিবাদের পুরনো নয়া উদারবাদী মডেলের একটি আপডেটেড রক্ষণশীল সংস্করণে রূপান্তর করাই নয়, তাকে চরম দক্ষিণপন্থা ও উগ্র সাম্প্রদায়িক অন্ধকারে টেনে নামানোর অপচেষ্টা শুরু হয়। উপরিকাঠামোকেন্দ্রিক কিছু সংস্কারের তর্কে রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যস্ত রেখে দেশের মৌলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়। জনগণের দৈনন্দিন জীবনসংক্রান্ত প্রশ্ন- দাম, মজুরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার ইত্যাদি পাস কাটিয়ে এই অলিগার্কি নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখে। জনগনের অগোচরে অতি সংগোপনে চুপচাপ করে বন্দর ইজারা দেওয়ার চক্রান্ত হয় পশ্চিমা শক্তির হাতে, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে করা হয় দাসত্বের বাণিজ্য চুক্তি। এ যেন নাওমি ক্লেইনের শক ডকট্রিন তত্ত্বের আরেকটি ক্লাসিক উদাহরণ-সংকটকে পুঁজি করে নয়া উপনিবেশিক নীতি চাপিয়ে দেওয়া।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে ভারতের অন্যায্য আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে যে ক্ষোভ জন্ম হয়েছে তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের ভাষায় উপস্থাপন করা হতে থাকে। ন্যায্য ভারতবিরোধী ক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষমূলক রূপ দেওয়া হয়। এতে লাভবান হয় উভয় দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি, যার নিদর্শন আমরা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নির্বাচনের ফলাফলে দেখেছি। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও এই ভারতবিরোধিতার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে তৎপর। পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য ভারতের আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করা নয়; উদ্দেশ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ভারতকে “লাইনে” রাখা। ফলে ভারতের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য ক্ষোভকেও এ ধরনের নানা পক্ষ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে সচেষ্ট ছিলো। এই সুযোগে প্রতিক্রিয়ার শক্তি সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের গতিমুখকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে সচেষ্ট হয়। সেই ধারাতেই ‘ভারতপন্থি’ ট্যাগ দিয়ে হামলা চালানো হয় প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মত পত্রিকায়, উদীচী-ছায়ানটের মত প্রতিষ্ঠানে।
জুলাই-পরবর্তী টালটামাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার তৎপরতা জোরদার করেছে। পশ্চিমা শক্তির প্রধান একটি উদ্দেশ্য হলো সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র ও মুক্তবাজারবিরোধী সকল ধারাকে অপসারণ করা। এদিকে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও চরম দক্ষিণপন্থিদের একটি মূল লক্ষ্য হলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের নাম নিশানা সংবিধান থেকে মুছে ফেলা। এই দুই শক্তি এখানে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। একদিকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ‘নয়া উদারবাদী নয়া উপনিবেশবাদ’, অন্যদিকে ‘সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ’–দুটিই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর ছিল ও আছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সিভিল মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি, দেশি বিদেশি নানা ইন্টারেস্ট গ্রুপ এখনও তৎপর আছে তাদের মত করে জুলাইয়ের বয়ান তৈরি করতে এবং তার মাধ্যমে ক্ষমতায় নিজেদের স্টেক নিশ্চিত করতে। একথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ডানপন্থিরা, কতকক্ষেত্রে উগ্র ডানপন্থি শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। উগ্রডানপন্থি-মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বুক ফুলিয়ে তাদের বয়ান শুধু প্রচার করছে তাই নয়, কতকক্ষেত্রে তা চাপিয়ে দিচ্ছে, ভিন্নমতের ওপর হামলে পড়েছে। ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের দৌরাত্ম্য থামেনি।
একথা ভুললে চলবে না যে, জনগণই ছিল এই চব্বিশের গণঅভুত্থানের মূল শক্তি। জনগণের কাতারে থেকেই বামপন্থিরা এই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বামপন্থিদের বড় অংশই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিলেও তারা কেন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানের আর্থ-সামাজিক নানা উপাদানের কারণে ডানপন্থিরা সমাজে ও রাষ্ট্রে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, দেশি বিদেশি নানা স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থের সাথেও ডানপন্থি শক্তি নানাভাবে নিজেদের অভিযোজিত করে নিয়েছে। ইন্টেরিম সরকার ও রাষ্ট্রশক্তিও প্রকাশ্যেই ডানপন্থিদের মদদ দিয়েছে। বর্তমান সরকারও দক্ষিণপন্থিদের সাথে আপস সমঝোতা করেই এগুচ্ছে, এমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। সাংগঠনিক দুর্বলতা, দ্বিধাবিভক্তি, নিজেদের বয়ানকে জনগণের সামনে উপস্থিত করতে না পারা ইত্যাদি কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেওয়া বা নিদেনপক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে বামপন্থিরা পারছে না।
এসব কারণের পাশাপাশি এটাও ভুললে চলবে না যে, বামপন্থি দাবিদারদের এক অংশ আওয়ামী লীগের সাথে দীর্ঘসময় জোটবদ্ধ ছিলো, এক অংশ দক্ষিণপন্থিদের উত্থানের ভয়ে আওয়ামী পতনের লড়াইয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো। বামপন্থি দাবিদারদের কারো কারো এ ধরনের অবস্থানের কারনে বামপন্থিদের মার্জিনালাইজ করা ডানপন্থি শক্তির জন্য সহজ হয়েছে। আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বামপন্থি দলের বহু নেতাকর্মী ১৫-১৬ বছর মার খেয়েছে, জেলে গিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের মধ্যে বামপন্থিরাও রয়েছেন, কিন্তু সেই লড়াইকে নানাভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামীপন্থিরা যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগকে সমার্থক হিসেবে প্রচার করেছে, একইভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বামপন্থিদের যেকোন অবস্থানকে আওয়ামী বয়ান হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছে। এই সুযোগে পতিত স্বৈরাচার ও তাদের মদদপুষ্টরা নানাভাবে জুলাই অভ্যুত্থানে বামপন্থিদের অংশ নেয়ার জন্য নানাভাবে আক্রমণ করছে, সে অংশগ্রহণকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে চেষ্টা করছে। গণঅভ্যুত্থাণ পরবর্তী সময়ে ডানপন্থিদের উত্থানও তাদের বয়ানকে শক্তিশালী করছে।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বামপন্থিরা কিন্তু সাধ্যমতো লড়াই করছে। ডানপন্থিদের এক অংশ প্রথমেই চেয়েছিল সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলতে, মুক্তিযুদ্ধকে ৪৭ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে। এর বিরুদ্ধে বামপন্থিরা লড়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী বয়ানের বাইরে নিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষার লড়াই তারা করেছে এবং করে যাচ্ছে। ৭১-এর বিভিন্ন নিশানা মুছে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া তার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে বামপন্থিরা। সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলার নামে, পুনর্লিখনের নামে তাকে ডানপন্থি চেহারা দেওয়ার আয়োজনের বিরুদ্ধেও লড়ছে বামপন্থিরা। দৃঢ় এ অবস্থানের জন্য উগ্র ডানপন্থি ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি কিছু ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত নেই জেনেও বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিকভাবেই ঐকমত্য কমিশনে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য উপরিকাঠামোর কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার করেও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে যদি কিছুটা অগ্রসর হওয়া যায়, সেটি ছিলো তাদের লক্ষ্য। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের পটভূমিতে যেভাবে একতরফা ইতিহাসের বয়ান দিয়েছে, তফসিল থেকে যেভাবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল মুছে ফেলতে চেয়েছে, সংবিধানের মূলনীতির মত আদর্শিক বিষয় যেভাবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, সনদের অঙ্গীকারনামায় যেভাবে হাত-পা বেঁধে দিতে চেয়েছে, তাতে বোঝা গেছে, জুলাই সনদের উদ্দেশ্য নিছক গণতান্ত্রিক সংস্কার নয়, বরং এর অন্যতম এজেন্ডা ইতিহাসের একতরফা বয়ান প্রতিষ্ঠিত করা এবং সংবিধানকে ডানপন্থি, মুক্তবাজারউপযোগী করা। এরকম হবার সম্ভাবনা আছে জেনেও বামপন্থিরা ঐকমত্য কমিশনে অংশ নিয়েছে, কেননা এর মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থানকে স্পষ্ট করতে চেয়েছে, রাষ্ট্রের উপরিকাঠামোর অধিকতর গণতান্ত্রয়নের এজেন্ডায় অবদান রাখতে চেয়েছে এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানের অন্যতম স্টেকহোল্ডার হিসেবে বোঝাতে চেয়েছে সেই গণঅভ্যুত্থান কেবল ডানপন্থিদের নয়। ঐকমত্য কমিশনের ভেতরে ও বাইরে বামপন্থিদের নীতিনিষ্ঠ অবস্থান বিভিন্ন ক্ষেত্রে উগ্র ডানপন্থিদের বিভিন্ন প্রস্তাবনাকে সফল হতে দেয়নি। এই সময়ে বামপন্থিরা একই সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। করিডোর প্রদান, বন্দরকে আলাপ আলোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়া করে বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়ার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। মার্কিনীদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে একমাত্র বামপন্থিরাই সাহসের সাথে লড়ছে। এই লড়াইকে অগ্রসর করার বিকল্প নেই।
একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণা ও প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সমর্থক বামপন্থি প্রগতিশীল শক্তি নির্দ্বিধায় লড়াই চালিয়ে যাবে। কিন্তু এই লড়াই করতে গিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের কর্তাসত্তাকে অগ্রাহ্য করে নিছক কিছু ষড়যন্ত্রের ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করার পতিত স্বৈরাচারী শক্তির বয়ানকে ধারণ করলে বামপন্থিরা অগ্রসর হতে পারবে না। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী হিসেবে গণঅভ্যুত্থানের স্টেক জনগণকে কিছুটা হলেও বুঝিয়ে দেয়ার জন্য লড়াই করার দায় থেকে বামপন্থিরা মুক্ত হতে পারে না। এই দায় থেকে পিছু হটা মানে দক্ষিণপন্থি শক্তিকে ওয়াকওভার দেয়া। গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত শক্তি এবং উগ্র দক্ষিণপন্থি অংশ উভয়েই দাবি করে যে, এই আন্দোলন কেবল দক্ষিণপন্থিদের আন্দোলন, তারাই ছিলো আন্দোলনের মূল শক্তি। কিন্তু সত্য হলো, দেশের মানুষ স্বৈরাচারী বিগত রেজিমের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে গণতন্ত্র ও প্রগতির পথে আরোও সামনের দিক এগুনোর জন্য, পেছনের দিকে যাওয়ার জন্য নয়। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী গণমানুষের গণআকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছিলো বৈষম্য বিরোধিতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্লোগানে। গ্রাফিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো বহুত্ববাদী অসাম্প্রদায়িক সাম্যের সমাজের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেনি, দেশকে বিভাজিত করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। এ অবস্থায়, চব্বিশের জুলাইয়ে জনগণের মরণপণ লড়াইকে শ্রদ্ধা করে, প্রকৃত বৈষম্যবিরোধী ও গণতন্ত্রের সংগ্রামকে অগ্রসর করার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ তোষণকারী উগ্র দক্ষিণপন্থি ও জুলাইয়ে পরাজিতদের বয়ানকে পরাস্ত করাই এখন বামপন্থিদের কর্তব্য।
প্রথম পাতা
ডেঙ্গু, হাম ও উপসর্গে প্রাণহানি বাড়ছেই
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসম্পদ বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ বন্ধ কর
সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ
সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে সিপিবির শোক
‘কৌশলবিদ’
দেশকে মার্কিন ‘করদ রাজ্যে’ পরিণত করার চক্রান্ত রুখতে হবে
ফুটবলকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ইনফান্তিনো?
সারা বছর কাজের নিশ্চয়তা ও রেশনিং চালুর দাবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন