
ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ আসলেই শিক্ষার্থীদের সামনে ভেসে আসে ভয়ংকর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা। ৮০’র দশক থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকারদলীয় এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা প্রায় সকল ছাত্র সংগঠনের দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, পেশিশক্তির প্রদর্শনই এই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কারণ। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরাজনীতিকীকরণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম কারণ হিসেবে এসব কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, ছাত্ররাজনীতিকে কি এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিয়েই বিবেচনা করা উচিত, বা বিরাজনীতিকীকরণের সংস্কৃতিকে সমর্থন করাই কি একমাত্র সমাধান? প্রথমত ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে যে ভীতিকর ভাবনা শিক্ষার্থী এবং জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে তার জন্য দায়ী এযাবৎকালে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বা ক্ষমতার অংশ ছিলেন সেইসবদল এবং তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোই। কারণ, যে ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণ-আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিল, সে ছাত্ররাজনীতি হঠাৎ করেই কলুষিত হয়ে যায়নি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ’৫২ থেকে ’৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। স্বাধীনতার পর থেকে ছাত্রলীগের হাত ধরেই ছাত্ররাজনীতি প্রতি মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধারণা পরিবর্তন হতে শুরু করে। এ সময় ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ব্যস্ত ছিলেন চাঁদাবাজিতে। এছাড়াও তৎকালীন মহসীন হলে সেভেন মার্ডারসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হতে থাকে ছাত্রলীগ। আর তখন থেকেই আওয়ামী লীগ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে দলীয়ভাবে এই সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় দেয়। তখন সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের প্রতি ছাত্রদের নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে তখনও ইতিবাচক ধারণা পোষণ করত। যার ফলশ্রুতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সর্বপ্রথম জয়লাভ করল ছাত্র ইউনিয়ন এবং ’৯০ পর্যন্ত প্রায় অধিকাংশ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বামপন্থি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোই বিজয়ী হল।
ছাত্র রাজনীতির মোড় ঘোরা শুরু করে মূলত জেনারেল জিয়ার শাসনামল থেকেই। কারণ, জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেন, আর সেই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা চালানোর দায়ে নিষিদ্ধ ছাত্র সংঘ আত্মপ্রকাশ করে ছাত্র শিবির হিসেবে। তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো শুরু করল। তাছাড়া ছাত্ররাজনীতি উপর প্রথম অফিসিয়াল আঘাত করে স্বৈরাচার এরশাদ। ১৯৮৩ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং ছাত্ররাজনীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩)। এরশাদ এই ধরনের গণবিরোধী তৎপরতার উদ্যোগ নিয়েছিল তার স্বৈরশাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে। কিন্তু ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররাজনীতি বলতে শিক্ষার্থীদের সামনে ছিল ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও ছাত্র শিবিরের দখলদারিত্বের রাজনীতি।
পেশিশক্তি ও দখলদারিত্ব নির্ভর রাজনীতির কারণে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা হ্রাস পায় অনেকটুকু, ফলে যে মাত্রায় এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার ছিল সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারপরও সীমিত শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে যখন সশস্ত্র সংঘর্ষ চলমান, তখন গোলাগুলির মধ্যেই ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল সংগঠিত করেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজু। মিছিলটি টিএসসির দিকে এগোলে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ।
৯০ এর পর পেশিশক্তি সন্ত্রাসী নির্ভর ও দখলদারিত্বের ছাত্র রাজনীতির কারণ আমার বিবেচনায় দুইটি। প্রথমত, ছাত্র সংগঠনগুলোকে সরকারি দল ব্যবহার করতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের গণবিরোধী কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্যাম্পাসে হল দখল এবং বিরোধী মত ও সংগঠনের ওপর দমন-পীড়নের জন্য। দ্বিতীয়ত, ছাত্র রাজনীতির প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহা তৈরি করার মাধ্যমে সুকৌশলে শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ করা ও বিনা বাধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লুটপাট করা। বিরাজনীতিকীকরণের প্রথম ধাপ হিসেবে বন্ধ করা হল সারাদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ফলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার শেষ সম্বল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নানান সময়ে সরকারি দল এবং তাদের অংশীদার দলের ছাত্র সংগঠন গুলো আরো বেপরোয়া হতে থাকে।
৯০‘র দশকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে একাধিক সশস্ত্র সংঘর্ষ, গুলিবিনিময় ও হল দখলকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ঘটে। বিভিন্ন সময়ে বহু শিক্ষার্থী আহত হন এবং ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় । ১৯৮৪-২০০০ সময়ে শিবিরের সন্ত্রাসী হামলায় ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য বাম প্রগতিশীল অনেক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ শিক্ষার্থী শহীদ হয়। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা সঞ্জয় তলাপাত্র, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ছাত্রমৈত্রীর নেতা ডা. জামিল আক্তার রতন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমৈত্রী নেতা জুবায়েদ চৌধুরী রিমুসহ আরো অনেক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা হত্যা করে (দৈনিক জনকণ্ঠ ১৯৯৪-৯৬, দৈনিক আজাদী ৩ অক্টোবর ১৯৯৪, দ্যা বাংলাদেশ অবজারভার ১৯৯২-১৯৯৪)। ‘১৯৮৮ সালের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৯ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন’ (ঢাকা ট্রিবিউন ২ জানুয়ারি ২০১৫)।
২০০৯-২০১৪ সময়ে ছাত্রলীগ জড়িত ছিল ৪৩২টি সংঘর্ষে যেখানে অন্তত ৫৪ জন নিহত হন, যার মধ্যে ৩৯ জনই ছাত্রলীগের নিজস্ব নেতা-কর্মী (প্রথম আলো, ৮ অক্টোবর ২০১৯)। একই সময়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তি বাণিজ্য, হল দখল, শিক্ষক-সাংবাদিক-পুলিশের ওপর হামলাসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল ছাত্রলীগ। ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন (দ্যা ডেইলি স্টার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাসকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের কয়েকজন রুমে ডেকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের পর হত্যা করে। আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে এবং অপরাধীরা গ্রেফতার হয়। বুয়েটে নিষিদ্ধ হয় ছাত্ররাজনীতি। ছাত্র রাজনীতির নিয়ে সবচেয়ে বড় নেগেটিভ ধারণা তৈরি করল, বিভিন্ন সময়ে যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের দ্বারা গেস্ট রুমে নির্যাতন। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের দলীয় মিছিল মিটিংয়ে জোরপূর্বক অংশগ্রহণ করানো। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নবীন শিক্ষার্থী হাফিজুর মোল্লাকে গেস্টরুম নির্যাতনে দীর্ঘ সময় শীতের রাতে দাঁড়িয়ে রাখার পর অসুস্থ হয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন এবং পরে মারা যান (প্রথম আলো, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।
কিন্তু এই সন্ত্রাসী ধারার বাইরেও ছাত্রদের স্বার্থ এবং এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোই। সেটা ২০১৫ সালে বর্ষবরণে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে গড়ে উঠে নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন, বিএনপির আমলে গড়ে উঠা শামসুন্নাহার হল নির্যাতন আন্দোলন থেকে শুরু করে, ক্যাম্পাস সন্ত্রাস, গেস্টরুম ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বা ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান প্রায় প্রতিটি যৌক্তিক আন্দোলনেই প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব ছিল।
তারপরও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মসূচি বা উদ্যোগ বাজারি মিডিয়ায় তেমন প্রচার পায় না, ফলে শিক্ষার্থীরা ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রসমাজ ও ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিয়েই ছাত্র রাজনীতিকে বিবেচনা করতো। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা জীবন দিয়ে ছাত্রলীগকে প্রতিরোধ করলো, অসংখ্য শিক্ষার্থী জীবন দিল শুধুমাত্র ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করতে? “না”! এই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিলা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত রাজনীতি বন্ধ করা। শিক্ষার্থীরা জীবন দিয়েছে এমন এক ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখে যেখানে তাদের আবাসন সংকট দূর হবে, গেস্টরুম নির্যাতনের শিকার হতে হবে না। তাছাড়া নিজেদের ইচ্ছার বাইরে কেউ জোর করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য করবে না।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ’১৮-এর কোটাসংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে অংশগ্রহণ না করার অন্যতম কারণ ছিল ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি তাদের অনাস্থা। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সময়ে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে এবং গণতান্ত্রিক সহঅবস্থান না থাকায় অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলোকে কার্যক্রম চালাতেও নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকার ফল খুব একটা ভাল হয়নি। কারণ যখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে না তখনই উগ্র ডানপন্তি শক্তির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বাড়ে। কারণ তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠল, জীবন দিল মূলত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়ন, গুলি ও বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগের হামলার বিরুদ্ধে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস আবারও ভূলুণ্ঠিত হতে থাকল। শিক্ষার্থীদের সামনে পরিষ্কার হতে লাগল উগ্র ডানপন্থি ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠনের অগণতান্ত্রিক চরিত্র। সবচেয়ে বড় কথা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাদের ওপর আস্থা রেখে, যাদের নেতৃত্ব মেনে শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হল- জীবন দিল- অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা তাদের থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে কেউ কেউ উপদেষ্টা হয়ে ক্ষমতার স্বাদ নিল কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা বা সংকট উত্তরণে কোনো ভূমিকা রাখল না। যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিষিদ্ধ ছিল তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়ার নাম করে যে শিবির বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য নিষিদ্ধ ছিল তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিল।
উগ্র ডানপন্থি এই ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ পাবলিকলি নারী শিক্ষার্থীদের স্লাট-শেমিং, হেনস্তা করা শুরু করল। যে নারীরা অংশগ্রহণ না করলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সফলই হতো না সেই নারীদের নানাভাবে হয়রানি হতে হল।
একটা উদাহরণ দেয়া যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার পর সেই কর্মচারীকে মব করে থানা থেকে বের করতে আনতে যায় কিছু লোক এবং জামিন পাওয়ার পর তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে। এভাবে নারী হেনস্তাকারীদের উগ্র ডানপন্থিরা সেলিব্রেট করতে থাকে। ৫ আগস্টের পর এই ধর্মভিত্তিক ডানপন্থি ছাত্র সংগঠনের হাত ধরেই ক্যাম্পাসগুলোতে শুরু হয় মব কালচার। ঢাবিতে ভাত খাইয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা বা জাহাঙ্গীরনগরে নির্মমভাবে মাদক কারবারি বলে মেরে ফেলা বা রাজশাহীতে ছাত্রলীগ বলে মব করে মেরে ফেলা– এগুলো সব জ্বলন্ত উদাহরণ মব কালচারের। তাছাড়া ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কারচুপি, টাকা খরচ করে বা কোচিং সেন্টারের শিক্ষকদের দিয়ে ফোন করিয়ে ভোট দিতে বাধ্য করা কিংবা নির্বাচনের পর নীলক্ষেতে ব্যালট পাওয়া যাওয়া- এই সমস্ত ঘটনা অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ডানপন্থি ছাত্র সংগঠনের এবং তাদের জোটসঙ্গীদের অগণতান্ত্রিক এবং সন্ত্রাসী চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এই উগ্র ডানপন্থি ধর্মভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির দ্বিচারিতা শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করেছে। কারণ ৫ আগস্টের পর অনেকে সাধারণ ছাত্রদের ব্যানারে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলন করলেন বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পরে দেখা গেল তারা কেউ ছাত্র শিবির বা কেউ ছাত্র শক্তির নেতা। দলীয় লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের কথা বলে ছাত্র শক্তির নেতারা নিজেরাই এখন এনসিপির লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি করতে ব্যস্ত। কোটা আন্দোলনের সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলা বা বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দেয়া অনেকে ৫ আগস্টের পর রাজাকারদের নরমালাইজেশন করতে লাগল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা শুরু করল। তাই এই সকল দ্বিচারিতাও শিক্ষার্থীদের কাছে ডানপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোকে বিচ্ছিন্ন করতে লাগল। ফলে ছাত্রদল ছাত্রলীগ, ছাত্র শিবির, ছাত্রশক্তি বা অন্যান্য উগ্র ডানপন্থি ধর্মভিত্তিক সকল ছাত্র সংগঠনের শিক্ষার্থীবিরোধী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা বিনির্মাণের অন্তরায়।
যদি একটি সন্ত্রাস দখলদারিত্ব মুক্ত গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গণ নিশ্চিত করতে হয় তাহলে ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের এখনই ভূমিকা পালন করার সবচেয়ে ভাল সময়। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে পাশে থাকতে হবে আরও জোরালোভাবে। কারণ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো দলীয় স্বার্থের থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, এখনো দেয়। তার অন্যতম উদাহরণ বর্তমানে ঢাবিতে চলমান নারী শিক্ষার্থীদের সান্ধ্য আইন বাতিলের দাবিতে ‘অবোরোধবাসীনি’ আন্দোলন। নারীদের জন্য গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে এ আন্দোলনকে সফল করতে হবে এবং এভাবে আরো ব্যাপকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ রোধ, আবাসন সংকট নিরসনসহ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেই একটি গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গণ নিশ্চিত করতে হবে। তাই গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গণ নিশ্চিত করতে এবং পেশিশক্তি নির্ভর সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ