
এদেশের মানুষ জানে কিভাবে দেশ ও দেশবাসীর দুশমনকে মোকাবেলা করতে হয়, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় এবং সেই লড়াইয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়। দেশের জনগণ বুকের রক্ত ঢেলে এসব অনন্য বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। এ আমাদের পরম গৌরবের বিষয়। কিন্তু, বিজয়-গৌরবের সাথে মিশে আছে পরাজয়ের গ্লানি। কারণ, অর্জিত বিজয়কে আমরা অনেক সময়ই ধরে রাখতে পারিনি। বারবার এমনটাই ঘটেছে, এখনও ঘটে চলেছে। বিজয় আসবে এবং প্রতিবারই তা হাতছাড়া হয়ে যাবে- এই কি তবে আমাদের জন্য বিধিলিপি হয়ে থাকবে? এ থেকে বেরিয়ে আসার কি কোনো পথ নেই। এসব নিয়ে সংক্ষেপে আজ দু-চারটি কথা বলবো।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জনগণের স্বার্থবিরোধী দেশি-বিদেশি কোনো দুশমনি-শক্তি এদেশের জনগণকে চিরস্থায়ীভাবে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। সেই দুশমন মহাশক্তিধর বিদেশি ঔপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী কোনো শাসক হোক, কিম্বা হোক সে স্বদেশেরই অত্যাচারী দানবীয় কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণি– তার বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ বারবার বিদ্রোহ করেছে, বুকের রক্ত ঢেলে ‘ইতিহাসে দাগ কাটার মতো’ একের পর এক যুগান্তকারী ‘বিজয়’ অর্জন করেছে। সে বিজয়কে বাহবা দিয়েছে বিশ্ববাসী। তাতে গর্বে ফুলে উঠেছে আমাদের বুক।
কিন্তু হায়! আমরা দুর্ভাগা জাতিও বটে। দুর্ভাগা এ কারণে যে, আমার বিজয় অর্জন করতে পারি, কিন্তু সে বিজয়কে আমরা ধরে রাখতে পারি না। ফলে হারানো বিজয়কে পুনঃরুদ্ধারের জন্য জনগণকে বারবার আরও বড় সংগ্রামে নামতে হয়েছে। রক্তঝরা গণসংগ্রামের ক্ষেত্রে হার-জিত হয় পরাজয় থাকে। সেই সংগ্রামে যদি হয় ‘জয়’ না আসে তাহলে নিঃসন্দেহে তা খুবই দুঃখ, বেদনা, পরিতাপের বিষয়। কিন্তু অসীম সাহসী সংগ্রামে বিজয় অর্জন করার পরেও যদি সে বিজয় হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে তা হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যে হাহাকার জাগিয়ে তোলে, তার যন্ত্রণা তুলনাহীন। তদুপরি, এধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে, তাহলে তো কথাই নেই!
একথা ঠিক যে, ইতিহাসের সুদীর্ঘ চলার পথে, নানান ঘটনাবলীর ঘাত-প্রতিঘাতে, প্রতিটি দেশ ও জাতি গুণগত বিচারে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে এবং তা থেকে এবং তার সমাজ ও জনগণের মাঝে নতুন নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম হয়। এসব কারণে নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জনগণকে আবার নতুন করে লড়তে হয়। সংগ্রামের নবতর অধ্যায় রচনা করতে হয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। এ ধরনের লড়াইয়ে জয়-পরাজয় থাকে। সে পরাজয়ে দুঃখবোধ থাকে, কিন্তু গ্লানি থাকে না।
শত-সহস্র প্রবাহমান নদ-নদীর শীতল কোলে সৃজিত আমাদের এই নদীমাতৃক দেশটি হল ‘পলিমাটির দেশ’। এদেশের মানুষও পলিমাটির মতো। বর্ষায় যে মাটি মাখনের মতো নরম, চৈত্রের খরতাপে সে মাটিই প্রস্তর খণ্ডের মতো শক্ত পাথরে পরিণত হয়। অনেকটা সেরকমই, দিনের পর দিন ধরে চলতে থাকা ধীর, শান্ত, উত্তাপহীন আপাতঃ প্রশান্ত দেশে হঠাৎ জেগে ওঠে উত্তাল জনশক্তি, দানা বাঁধে গণ-বিদ্রোহের আগুন। জাগ্রত গণজোয়ার অসীম শক্তিকে অবলম্বন করে আসে ‘বিজয়’। কিন্তু যে জনশক্তি বিজয়ের স্রষ্টা, অর্জিত বিজয়ের ফসলের হিস্যা তাদের ঘরে উঠে না, চলে যায় ‘লুটপাটে’ তেমন বিশেষ সুবিধা করতে না পারা, পূর্বেকার সেই একই বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির অন্তর্গত ‘নতুন’ কোনো অংশ বা গোষ্ঠির হাতে। এতোদিন শাসক শ্রেণির যে অংশ বা গোষ্ঠীটি সরকারি ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে বেপরোয়া ‘লুটপাটের’ সুযোগ ভোগ করেছে, গণজোয়ারের উন্মত্ত শক্তির সামনে তাদের তখতে-তাউশ চুরমার হয়ে যায়।
কিন্তু, গণশক্তির অমোঘ ক্ষমতা গদিনাসীন সরকারের পতন ঘটানোকে সম্ভব করলেও, রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় অক্ষত-অটুট থেকে যায়। থেকে যায় রাজনীতির উপাদানগুলো, সমাজে শ্রেণি বিভাজনের বাস্তবতা ইত্যাদি। সরকার অপসারিত হলেও ‘জনগণের সেবকের’ মিথ্যা ক্রেডেনসিয়াল ব্যবহার করে, দক্ষতার সাথে শাসক-শোষক শ্রেণির স্বার্থের দেখভাল করার নিমিত্তে কয়েক শতাব্দি ধরে স্থায়ীভাবে নির্মিত আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক নীতি ব্যবস্থার মূল চরিত্র অব্যাহতভাবেই বহাল থেকে যায়। গণজাগরণের অমোঘ শক্তির মুখে পরে আমলাতন্ত্রসহ পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতার হাতবদল ঘটালেও বা ঘটতে দিতে বাধ্য হলে, সবকিছু সামাল দিয়ে তাদের শ্রেণিগত ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শুরু করে দেয়। শোষক শ্রেণির ‘লুটপাটের’ কাজ ম্যানেজ করার জন্য তৈরি করা আমলাতন্ত্র ছল-চাতুরি-প্রতারণা-ষড়যন্ত্রসহ নানান ‘কারসাজি’ করে রাষ্ট্রকে তার আদি শ্রেণি চরিত্র ও লক্ষ্য-উদ্দ্যশ্যে ফিরিয়ে আনে। সে এমনভাবে অ-মৌলিক কিন্তু ‘চটকদার’ কিছু উপর ভাসা পদক্ষেপের ধুম্রজাল ও প্রতারণার আশ্রয় নেয় যাতে করে জনগণের মনে এমন একটি ধারনার জন্ম হয় যে, যে অনেক কিছু হচ্ছে, হতে যাচ্ছে।
যে ‘জনতার’ শক্তিতে ক্ষমতাসীনদের কুপোকাত করা সম্ভব হলো, যারা কিনা জমি চাষ দেয়ার কঠিন কাজটি সম্পন্ন করলো, তাদেরকে ‘ঘরে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে’ এবং কোনভাবেই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করা তো বটেই, এমনকি ভবিষ্যত রচনায় তাদের ন্যূনতম ভূমিকা নেয়ার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। বুর্জোয়া শাসকরা বলত থাকে যে “কাজতো হয়ে গেছে, এখন আমরাই তোমাদের অবিভাবক, আমরাই তোমাদের স্বার্থ দেখবো। আমাদের উপর বিশ্বাস রাখো”। সহজ কথায়- “সংগ্রামের জমিন চাষ দেয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এবার তোমরা ঘুমাও। তোমাদের স্বার্থ আমাদের কাছে ‘বর্গা’ দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকো”। এদেশের মানুষ ‘বর্গা’ কী তা জানে-চিনে। সেই ভরসায় সে হাত গুটিয়ে সে থেকেছে এই আশায় বসে থাকে এ কথা মনে করে যে তাদের সংগ্রামলব্ধ ফসলের প্রাপ্য হিস্যা নতুন শাসকদের স্বদিচ্ছায় এভাবেই আপনা-আপনি তাদের ঘরে পৌঁছে যাবে। শ্রেণি স্বার্থ সম্পর্কে সে সচেতন না হয়ে উঠায়, এবং ‘জমি বর্গা’ দেওয়া যায় বটে, কিন্তু ‘স্বার্থ যে বর্গা দেয়া যায় না’ সে শিক্ষাও তার পূর্ণ না হওয়ায় যা ঘটেছে এবারই সেটিই ঘটে, জনগণ সম্পূর্ণ রূপে বঞ্চিত হয়, অর্থাৎ যেটাকে বলা হয়ে থাকে - “ডিম পাড়ে হাসে, খায় বাগডাসে” , কিম্বা ‘খায় দায় ফজর আলী- মোটা হয় জব্বর” -এর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। এমতাবস্থায় নিজেরাই নিজেদের মাথার চুল ছিড়ে আর্তনাদ করা ছাড়া তখন সে অন্য কিছু করার খুঁজে পায় না। তারা বুকে আগুন জ্বালিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে গণক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। সে সুযোগ আসে। আবার সে জীবন বাজি রেখে লড়াইতে নেমে পড়ে। কিন্তু শ্রেণি চিন্তায় সচেতন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় ‘বর্গা’ দেয়ার বদলে নিজের শ্রেণিকে যে অধিষ্ঠিত হতে হবে- সে কথাটি তাদের উপলব্ধিতে না আসার কারণে আবার তারা একই ভুল করে। এই ভুলের কারবার থেকে তাদের নিজেদেরই বের হয়ে আসতে হবে।
এভাবেই, সুনিশ্চিত বিজয় অর্জনের পর যে বিজয় চুরি হয়ে গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া বিজয়কে পূনরুদ্ধারে জন্য জনগণকে ফের লড়াই করতে হয়েছে। এক শতাব্দির মধ্যে এদেশের জনগণ তাদের ‘ভাগ্য বদল হবে’- এই আশায় তিন-তিনবার ‘দেশ বদল করেছে, ডজন-ডজন বার সরকার বদল করেছে। রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনী, নাগরিক সমাজ, ‘জেন-জি’ – প্রভৃতি বহু ধরণের শক্তি দ্বারা পরিচালিত সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে তারা দেখেছে। কিন্তু, কোনো কিছুতেই জনগণ মৌলিক ক্ষেত্রে তাদের ‘ভাগ্য বদলের’ মতো কোনো কিছু ঘটতে দেখেনি। দেশে ‘উন্নয়ন’ যে একেবারে কিছুই হয়নি, তা নয়। কিন্তু, সেই সীমিত উন্নয়নের ছিটেফোঁটা জনগণকে দিয়ে (অ্যান্টি-ইনসারজেন্সি ব্যবস্থা হিসেবে- অর্থাৎ জনগণ যেন আবার বিপ্লব-বিদ্রোহ না করে বসে- সে জন্য), সাম্রাজ্যবাদের সাথে সাথে মিলে সেই উন্নয়নের সিংহ ভাগ লুটে নিয়েছে হাতে গোনা লুটেরা বুর্জোয়া গোষ্ঠী। ‘কেও খাবে আর কেও খাবে না’-র ব্যবস্থার অবসান হবে, বৈষম্য দূর হবে, জনগণ উন্নয়নের ও ক্ষমতার প্রকৃত অংশিদার হবে- এসব আশা নিয়ে তারা যে রক্তঝরা সংগ্রাম করেছে, তাহলে তারা বারবার নিস্ফল হতে দেখেছে। কেন বারবার এমনি ঘটছে? সবটাই কি নিস্ফল, নাকি এর মাঝেও এই প্রগাড় সত্যটি লুকিয়ে আছে যে “যে নদী মরুপথে হারালো ধারা, জানি সে জানি তাও হয়নি হারা”। এসব নিয়ে যেমন কিনা চিন্তা জগতে বিভ্রান্তি বিরাজ করছে তেমনি গণচেতনাকে পথভ্রান্ত করার পরিকল্পিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এ সব নিয়ে কিছু কথা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
বিশ্বের সব দেশ ও জাতির জনগণকেই ইতিহাসের ধারায় ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে উদ্ভব হওয়া পরিস্থিতির নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। আমাদের দেশকেও তা করতে হয়েছে। এ দেশের জনগণ সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে এবং সে ক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সে সংগ্রামে অনন্য সাহসী গৌরজ্জ্বল ‘বিজয় গাঁথা’ রচনা করেছে।
কিন্তু গৌরবের পাশাপাশি আমাদের চরম গ্লানির বিষয় হলো-সেসব সংগ্রামের পাশাপাশি সমানভাবে, অথবা আরও বেশি পরিমাণে, আমাদেরকে ‘বারবার’ সংগ্রাম করতে হয়েছে এ কারণেও যে, ‘বিজয়’ অর্জন করেও প্রায়শই আমাদের সে ‘বিজয়’ হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফলে আমাদেরকে নতুন করে আবার ‘বিজয়’ অর্জনের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইতিহাসে এ দেশবাসির সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ বিজয়। দেশের যে জনগণ ছিল এই বিস্ময়কর দুনিয়া কাঁপানো বিজয়ের প্রকৃত কারিগর, শক্তি ও রূপকার- তাদের আশা ছিল যে তারা তাদেরই রক্তের দামে অর্জিত বিজয়ের ফসল হিসাবে উন্নত, সমৃদ্ধ, প্রগতিমুখীন, আধুনিক জীবন-সমাজ-রাষ্ট্র পাবে। মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে হানাদার বাহিনীকে সশস্ত্র লড়াইয়ে পরাভূত ও বিতাড়িত করার কাজে দেশের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের সংখ্যা ছিল ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। ন্যায়বিচার ও ইনসাফ এটাই দাবি করে যে বিজয়ের ফসলের, আরও বেশি না হলেও, তার অন্ততঃ ৭০-৮০ শতাংশ এই শ্রেণির মানুষের ঘরে উঠবে। কিন্তু, বিজয়ের ফসল তাদের ঘরে উঠেনি। তারা যা পেয়েছে তা তাদের প্রাপ্য ৭০-৮০ শতাংশের ধারে-পাশেও না। বরঞ্চ তার উল্টাটিই ঘটেছে। গরিব আরও গরিব, ধনী আরও ধনী হয়েছে, বৈষম্য আরও বেড়েছে, গণতন্ত্র আরও খর্বিত হয়েছে ইত্যাদি। যদিও ইতোমধ্যে সে বিজয়ের ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে।
দেশের মুক্তিকামী জনগণ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া তাদের প্রত্যাশা-স্বপ্ন ৫৫ বছরেও পূরণ হতে দেখেনি। কিন্তু সেকারণে তারা হাত গুটিয়ে বসেও থাকেনি। ছোট-বড় নানান দাবিতে তারা সংগ্রাম করেছে। এমনকি দেশে তোলপাড় তোলা ’৯০-এ, ’২৪-এ গণ-অভ্যুত্থান রচনা করেছে। এসব বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমেও তারা ৭১-এ সৃষ্ট সম্ভাবনার পথে দেশের অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি।
মাত্র দু’বছর আগে দেশে ছাত্র-জনতার ‘ বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী’ উত্তাল গণবিস্ফোরণ দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। উত্তাল জনশক্তির ক্রান্তিকালীন বিশাল জাগরণ দেশে অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে মৌলিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিমুখীন ধারায়, (যা কিনা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সময় অভিমুখীন) ‘মৌলিক সংস্কারের’ সুযোগ ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এবারো গণ-অভ্যুত্থানে ‘প্রবল আশা জাগানিয়া’ এই জনজাগরণের ফসল জনগণের ঘরে আসেনি। সবাই চোখের সামনে সরাসরিভাবে দেখতে পেয়েছে ও পাচ্ছে - কিভাবে ‘সম্ভাব্য বিজয়কে’ জনপ্রত্যাশা পূরণের পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ও হচ্ছে। পূর্ব-পরম্পরা অপরাপর সব বিজয় হাতছাড়া হওয়ার ঘটনার মতো এবারের বিজয়ও একই পরিণতি লাভ করতে চলেছে। গণ-অভ্যুত্থানের অসীম সম্ভাবনা জনগণের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে গেছে। তাই, এখন প্রাসঙ্গিক অ্যাজেন্ডা হলো ‘ হারানো বিজয়কে পুনঃরুদ্ধারের জন্য নতুন গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেয়া। এমনভাবে এবার প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে করে এবার সত্যিকারের বিজয় অর্জন করার পাশাপাশি সে বিজয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
এ ক্ষেত্রে এবার আশাবাদী হওয়ার একটি প্রণিধানযোগ্য কারণ হলো, সম্ভাব্য বিজয় হাতছাড়া হওয়ার ঘটনার কারণ খোঁজার জন্য এর আগেকার যেকোনো প্রচেষ্টার তুলনায় এবার তা আরও ব্যাপক ও তীব্র হয়েছে। ’২৪ এর আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ, তত্ত্বায়ন করার চেষ্টা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী অভিমত ব্যক্ত হচ্ছে।
আলোচনায় ঊনসত্তরের ১১-দফার গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান এবং এমনকি একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গগুলোও উঠে এসেছে। মধ্যে চরম দক্ষিণপন্থি ,উগ্র সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা বিরোধী, পশ্চাদমুখী মধ্যযুগীয় ভাবনাও আছে। ইতিহাসকে উলটে দিতে তারা বিপুল অর্থ-সম্পদ, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদত নিয়ে আদা জল খেয়ে চরিত্র হনন, চরম মিথ্যাচার, ‘মব শক্তি প্রদর্শন ফেইক নিউজ, ভয়-ভীতি-প্রলোভন ইত্যাদি ব্যবহার করে মাঠে নেমে পড়েছে। এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা সহজ হবে। খোলা মনে এ আলোচনাকে চলতে দিলে তা প্রকৃত সত্য জানার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। বিভিন্ন অভিমত যে বস্তুতঃ পৃথক-পৃথক শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলক, সে কথাটাও প্রমাণ পাওয়া যাবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো- কেন আমরা বিজয়ী হয়েও সে বিজয় রক্ষা করতে পারি না–সে প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটি আমাদের জন্য ‘বিজয় যেন হাতছাড়া না হয়’ - তার কার্যকর পথ নির্দেশ দিবে।
বহুদিন নিরব থাকা একাত্তরে হানাদার বাহিনীর সহায়তাকারী উগ্র সাম্প্রদায়িক একটি মহল গণসংগ্রামের এসব ঐতিহাসিক বিজয়ের ঘটনাবলীকে কলঙ্কজনক এবং ইতিহাসের বিচারে ‘পেছন দিকে’ যাত্রা বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা সেগুলোকে কেবল প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, এসব ঐতিহাসিক অর্জনগুলোকে তারা তাদের আঘাতের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করেছে। এভাবে ‘ইতিহাসকে উল্টে দেয়ার’ প্রকাশ্যে অভিযানে তারা নেমে পড়েছে।
এক্ষেত্রে তাদের সহজ (কিন্তু ভ্রান্ত) যুক্তি হলো, যেহেতু এসব সংগ্রামের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-স্বপ্ন-প্রত্যাশা-কোনোটিই অর্জিত হয়নি, এবং মানুষের অবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নতি ও আকাঙ্ক্ষার পূরণ হয়নি, তাই এগুলোকে ‘বিজয়’ বলে আক্ষায়িত করা যায় না। এগুলো সবই হলো ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারার ‘নেতিকরণ’। তথা, এগুলো হ’লো ঈশ্বর নির্দেশিত সঠিক ঐতিহাসিক পথ থেকে বিচ্যুতি। তার ‘নেতিকরণ’ ইতিহাসকে ঈশ্বর নির্দেশিত সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে এসব ‘নেতিকরণের’ ‘নেতিকরণ’ ঘটাতে হবে। যার অর্থ দাঁড়ায়- মানব সভ্যতার আধুনিক যুগের যাবতীয় অগ্রগতিগুলোকে বাতিল করে দিয়ে ইতিহাসকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে হবে। যেহেতু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল, তাদের বয়ান অনুসারে ইতিহাসের খুবই বিপদজনক পদস্খলন, তাই এগোতে হলে একাত্তরের অর্জনকে কবর দেয়ার কাজটি একটি প্রধান কর্তব্য।
বিপুল সংখ্যক দেশবাসী এমন পরিণতি চায় না। ’২৪-এর অভ্যুত্থানে সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে যত গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে তার মধ্যে প্রধান একট ছিল “স্বাধীনতা এনেছি - সংস্কারও আনবো”। গণ-অভ্যুত্থানের এবং বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল জনগণ না পাওয়ার কারণেই তাদের হতাশাজনিত ক্ষোভ। কিন্তু এই না পাওয়ার প্রকৃত কারণ কিছুটা বুঝে উঠতে শুরু করলেও তাদের মাঝে সে উপলব্ধি এখনো পরিপক্ক ও পর্যাপ্ত হয়ে ওঠেনি।
সাধারণ পাবলিকের কথা নাহয় বাদই দিলাম, দেশের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সমাজ, তরুণ সমাজ এবং এমনকি বামপন্থিদের মাঝেও ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে চিন্তা ও উপলদ্ধিতে নানা প্রকার ত্রুটি ও ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমার দু’চারটি কথা।
অনেকে মনে করেন যে এটি কোনো গণ-অভ্যুত্থান ছিল না। এটি ছিল স্রেফ সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণে একটি ষড়যন্ত্রমূলক ‘কালার রেভেলিউশন’। এমন যারা ভাবেন তাদের এক্ষেত্রে চিন্তার প্রধান ত্রুটিটি হলো- তারা এ কথা বিবেচনায় রাখেন না যে, যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানে যে প্রধান দু’টি উপাদান থাকে সেগুলো হলো- এক. গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শক্তি এবং দুই. যারা স্টিয়ারিং করায়ত্ত্ব করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী গতি ধারার নিয়ন্ত্রক হয়ে বসেন। প্রায়শই এ দুটির চরিত্র ও লক্ষ্য ভিন্ন রকমের হয়। সে কারণে গণ-অভ্যুত্থানের সামগ্রিক চরিত্র মূল্যায়ন করা জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু এই দু’টি যদি একই ধারার হয় তাহলে মুল্যায়নে সেই জটিলতা থাকে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তি, কারিগর, রচয়িতা ও নায়ক হলো জনগণ। নানা ঘটনায় জনগণের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে তাদের মাঝে জন্ম নেয়া পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, তাদের মনের গভীরে লালিত স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা, কোন বিশেষ ঘটনা দ্বারা ট্রিগার্ড হয়ে গণবিক্ষোভের এক ক্রমাগত তীব্র হতে থাকা বিস্ফোরণে রুপ নেয়। সমাজ, রাষ্ট্রীয় জীবন, রাজপথে ‘গণদেবতা’ প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। নিম্নলিখিত বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট দেখে বুঝতে হয় যে দেশে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে-
১) জনগণ তাদের সম্মিলিত শক্তির ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হতে শুরু করে,
২) জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার অকল্পনীয় উল্লম্ফন ঘটে,
৩) নেতৃত্ব যেটুকু নির্দেশ দেয় জনগণ তার থেকে আরও বেশি মাত্রার অ্যাকশনে নিয়োজিত হতে থাকে
৪) জনগণ গণশক্তির আধিপত্যের আওতা প্রসারিত করতে থাকে- ইত্যাদি।
যাকে জনগণ বলে বিবেচনা করা হয়, মনে রাখতে হবে যে তারা সবাই একই স্বার্থ চিন্তায় গণ-অভ্যুত্থানে সামিল হয় না। এক সময়, বিশেষত ক্ষমতার মসনদ ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে সবাই একাট্টা থাকলেও, এ কাজটি শেষ হওয়ার পর যে প্রশ্নটি অবধারিতভাবে প্রধান হয়ে ওঠে তা হলো- কোন শ্রেণির স্বার্থে এখন রাষ্ট ্রচলবে। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী মানুষের নিজ নিজ শ্রেণিগত স্বার্থ কোনো পর্যায়েই মুছে যায় না। নানাভাবে তার প্রকাশ ঘটে। বুর্জোয়া শ্রেণি অধিকতর মাত্রায় শ্রেণি সচেতন থাকায় এবং ‘চলতি হাওয়ার’ অতীত থেকে প্রবাহমান ধারাবাহিকতা বুর্জোয়াদের পক্ষে থাকায়, তারা তাদের আধিপত্বকে দ্রুত প্রতিষ্ঠা করতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
ফলে, এই বাস্তবতা বজায় থাকলে কখনই জনগণ এখন আশা করতে পারে না যে, তাদের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। এটি বদলে দিতে হলে বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন এবং বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে অন্যান্য শোষিত বঞ্চিত, অবহেলিত শ্রেণির মানুষকে জোটবদ্ধ করে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখীন অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা করার ‘বিকল্প’ পথ গ্রহণ করতে হবে। কেবলমাত্র বুর্জোয়া শাসনের অবসান ঘটিয়ে মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প সরকার এবং লুটেরা ধনবাদকে অবলম্বন করে চলতে থাকা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বদলে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ক্রমাগত সমাজতন্ত্র অভিমুখীনতা নিশ্চিত করার পথ ধরে দেশে ক্ষমতাসীন শ্রেণির চরিত্র আর্থ সামাজিক বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারলেই অর্জিত বিজয় রক্ষা করতে না পারার গ্লানি দূর করা সম্ভব হবে।
এবার বিজয়কে বিজয়ী করার জন্য প্রস্তুত হোন! সামনে আছে সেই নতুন অধ্যায় রচনার সংগ্রাম। সবাই বুক বেধে দাঁড়ান। বিজয় এবার সুনিশ্চিত।