ফিদেল কাস্ত্রো

শতবর্ষ পেরিয়ে আমাদের ফিদেল

শেখ মোহাম্মদ ফরহাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ফিদেল কাস্ত্রো বেঁচে থাকলে আজ বয়স হতো ১০০ বছর। তাঁর পুরো নাম ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুৎজ, জন্ম ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলের বিরান জেলায়। মা লিনা রুৎজ গনজালেজ, আর বাবা আনহেল মারিয়া বাউতিস্তা কাস্ত্রো স্পেন থেকে কিউবায় এসে বসবাস শুরু করা একজন ধনী কৃষক। ফিদেলের লেখাপড়া শুরু হয় কিউবার সান্টিয়াগোর একটি ক্যাথলিক স্কুলে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলাতেও ছিলেন পারদর্শী। এই দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪৪ সালে তিনি কিউবার সেরা অলরাউন্ডার স্কুল অ্যাথলেটের পুরস্কার পান। হাভানার এল কলেজিও ডে বেলেন কলেজ পেরিয়ে হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শেষ দিকে তিনি বামপন্থি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন, তবে সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর। ওই সময়ে শাসক ছিলেন ফুলজেনসিও বাতিস্তা, যে সরকারের মূলনীতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। এই সময়ে কিউবা পরিণত হয়েছিল শৃঙ্খলহীন ধনীদের স্বর্গরাজ্যে। জুয়া, মাদক আর যৌনব্যবসা সমাজে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। ফিদেল উপলব্ধি করলেন, কিউবার নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজিবাদই দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। জনগণের বিপ্লবের মধ্য দিয়েই এর সমাধান সম্ভব। বাতিস্তা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ফিদেল গড়ে তোলেন “দ্য মুভমেন্ট“ নামে এক গোপন সংগঠন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই সান্টিয়াগোর কাছে মনকাডা সেনানিবাসে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে আক্রমণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়, অনেক সহযোগী নিহত হন, আর বিচারে ফিদেলের ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। তবে ১৯ মাস পর বাতিস্তা সরকার রাজবন্দীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে ফিদেল ও তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রো কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁরা আবারো বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন এবং এক পর্যায়ে গ্রেফতার এড়িয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মেক্সিকো চলে যান। সেখানে গড়ে তোলেন “২৬ জুলাই আন্দোলন” নামে একটি বিপ্লবী দল। ১৯৫৫ সালে নিকো লোপেজের মাধ্যমে প্রথমে ভাই রাউল এবং পরে ফিদেলের সাথে পরিচয় হয় তরুণ বিপ্লবী আর্নেস্তো চে গুয়েভারার সাথে। দীর্ঘ আলোচনার পর চে ফিদেলের সংগঠনের সদস্য হন। কিউবা বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাউল ও চে’সহ ৮২ জন বিপ্লবী যোদ্ধা নিয়ে ফিদেল ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে গ্রানমা নামের একটি ইয়টে (যন্ত্র চালিত নৌযান) করে কিউবায় ফিরে আসেন। ইয়টটি সমুদ্র উপকূলে ভিড়তেই বাতিস্তার সেনাবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। সম্মুখ যুদ্ধে অধিকাংশ সহযোদ্ধা নিহত হলেও ফিদেল, রাউল, চে’সহ বাকি ২২ জন বিপ্লবী সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে এই ছোট বিপ্লবী দলটি বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। কিউবা বিপ্লবের পুরো সময় চে গুয়েভারা ফিদেলের কাছাকাছি ছিলেন। ঐ সময়ে চে-কে বলা হত ফিদেলের মস্তিষ্ক। এদিকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ৮ জানুয়ারি বিপ্লবী ক্যারাভান নিয়ে হাভানা প্রবেশ করেন ফিদেল কাস্ত্রো। মাত্র ৩২ বছর বয়সে হয়ে ওঠেন লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী তরুণ রাষ্ট্রনায়ক। ক্ষমতা গ্রহণ করেই ফিদেল শুরু করেন ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার। বৃহদাকার ভূমি ও বড় সম্পত্তি নিম্নবিত্ত জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন, বিদেশি মালিকানাধীন সম্পদ জাতীয়করণ এবং অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা হয়। বাতিস্তা সরকারের অত্যাচারী সদস্য আর জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী বড় বুর্জোয়াদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফিদেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আনেন। সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা, নারীর ক্ষমতায়ন ও জাতিগত সমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। কিউবার প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়া শুরু করেন। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় কিউবার শিশু মৃত্যু হার অনেক কমে আসে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার জন্য কিউবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ছোট দেশ হলেও খেলাধুলাতেও অসাধারণ সাফল্য দেখায় কিউবা। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মিশন হয়ে ওঠে কিউবার বৈশ্বিক পরিচয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে দেয় কিউবা। পরবর্তীতে দেশের সাক্ষরতা প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়। কিউবার বিপ্লব

শুধুমাত্র নিজের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি। লাতিন আমেরিকার বহু বিপ্লবী তরুণের কাছে ফিদেল এবং কিউবা হয়ে ওঠে প্রেরণার উৎস। ফিদেল সরকার আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামেও ভূমিকা নেওয়া শুরু করে। এঙ্গোলা, মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াইয়ে কিউবা সামরিক সহায়তা পাঠায়। পাশাপাশি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চিকিৎসক ও শিক্ষক পাঠানো শুরু করে। ফিদেলের এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র স্বভাবতই ভালোভাবে নেয়নি। মহাপরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের পেটের ভেতরে থেকে যে বিপ্লব তিনি রচনা করেছিলেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে দশকের পর দশক যে অসম লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য। হাভানা থেকে ওয়াশিংটনের দূরত্ব মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার। অথচ এই সামান্য দূরত্বে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করা, এবং সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক দর্শন অর্থাৎ মার্কসবাদ লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠিত করা ফিদেলের জন্য ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। ফিদেল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে যত বেশি ঝুঁকতে থাকেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্ক তত দ্রুত খারাপ হওয়া শুরু করে। ১৯৬১ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। একই বছর ১৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কিউবা বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর নানা ঘটনায় কিউবাকে কেন্দ্র করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থান নেয় এবং গোটা বিশ্ব আরেকটি পারমানবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়ে। কিউবাকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, এবং ফিদেলকে হত্যার জন্য পাঁচ দশকে বহুবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফিদেল কিউবা নামের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন। আবার একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে শীতল যুদ্ধের ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেও পরিণত হন। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘে তাঁর ২৬৯ মিনিটের অনর্গল বক্তৃতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দীর্ঘতম ভাষণ হিসেবে আজও পরিগণিত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। কিউবার জন্য শত শত কোটি ডলারের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যায়। এই কঠিন সময়ে ফিদেল ব্যক্তিগত ব্যবসা ও বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য কিছুটা পথ খুলে দেন। পরে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কিউবার অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। এই কঠিন সময়েও ফিদেলের স্লোগান ছিল “সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ”। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ফিদেল ছিলেন কিউবার প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে অসুস্থতার পরে ফিদেলের ক্ষমতা কমতে শুরু করে। ২০০৮ সালে তিনি কিউবা বিপ্লবের দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও তাঁর ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব তুলে দেন। তবে রাজনীতি থেকে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ননি। ১৯৬১ সালে কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের পর থেকে ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফিদেলই ছিলেন পার্টি প্রধান। ফিদেল কাস্ত্রো শুধুমাত্র একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, ছিলেন অর্ধশতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে থাকা এক হিমালয়সম মানুষ। ফিদেলের জন্মশতবর্ষ ঘিরে কিউবায় নানা আয়োজন চলছে। আন্তর্জাতিক বইমেলা, শিল্প প্রদর্শনী, সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমাবেশ, সবকিছুতেই ফিরে এসেছে তাঁর নাম। হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে টানানো হয়েছে তাঁর ছবি। রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে তার বিখ্যাত স্লোগান সম্বলিত বিলবোর্ড “স্বদেশ অথবা মৃত্যু”। কমরেডস, আসুন আমরা ফিদেল কাস্ত্রোর এই জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য স্মরণ করি “আমি ৮২ জনকে নিয়ে বিপ্লব শুরু করি। তা যদি আমাকে আবারও কোরতে হয়, তবে আমি ১০ বা ১৫ জনকে নিয়ে কোরবো এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়েই কোরবো। যদি আপনার বিশ্বাস ও কর্মপরিকল্পনা থাকে, সংখ্যায় আপনি কত কম, সেটা কোন বিষয় নয়”। কিউবা বিপ্লবের আগের বছর হাভানার দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতো “এই বছরই সেই বছর”। ফিদেল কাস্ত্রোর এই জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আসুন আমরা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করি। কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো চিরজীবী হোন! বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..