
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গত ৫৫ বছরের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি দিকের প্রতি নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকালে একটি দ্বৈত চিত্র খুব সহজেই চোখে পড়ে এবং তা হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে পরিমাণগত অগ্রগতি যতোটা সাধিত হয়েছে, সে তুলনায় গুণগত মানের জায়গাটি ততোটাই পিছিয়ে পড়েছে। ফলে একটি রাষ্ট্রের আওতাধীন নাগরিক হিসেবে এবং পাশাপাশি একটি জাতিসত্তার অংশ হিসেবে এ দেশের মানুষের মধ্যে দিনে দিনে সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তির মাত্রাই শুধু হ্রাস পাচ্ছে না, একইসঙ্গে নানামাত্রিক হতাশা ও উদ্যমহীনতাও চরমভাবে জেঁকে বসেছে। আর কে না জানে যে, হতাশাগ্রস্ত মানুষের পক্ষে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনাময় চিন্তাভাবনা লালন করা বা তার বিকাশ সাধন প্রায় কখনোই সম্ভব নয়; এবং কার্যত তা হচ্ছেও না। ফলে বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ আসলে হয়ে দাঁড়িয়েছে আষ্টেপৃষ্টে হতাশায় বাঁধা গড্ডালিকাপ্রবণ এমন এক অনুজ্জ্বল অস্থির রাষ্ট্র, যেখানে তার নাগরিকেরা নতুন কিছু সৃষ্টির কথা একেবারেই ভাবেন না। এমনকি এটি ভাববার সামর্থ্য যে নিজেদের আছে, সেটিও তাদের অধিকাংশের চিন্তা ও বিশ্বাসে নেই। এখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না এবং কেউ কারো ওপর আস্থাও রাখে না- এমনকি নিজের উপরও না।
তো এমনটি কেন ঘটলো, তা এক বিস্তৃততর আলোচনা। ফলে এ নিয়ে আপাতত সে দীর্ঘ আলোচনায় না যেয়ে এখানে বরং সংঘটিত ঘটনাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির চেষ্টা করা যাক, যা নিয়ে পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে ও পরিস্থিতিতে বিশ্লেষণমূলক আলোচনায় উদ্যোগী হওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে জ্ঞান ও শিক্ষাই যেহেতু সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে বিকশিত করে ও এসবের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়, সেহেতু আলোচনাটি শিক্ষা দিয়েই শুরু করা যাক। ১৯৭১ সালে দেশে স্বাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা এখন ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশে এসে উন্নীত হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় অগ্রগতি। কিন্তু এই দুই সময়ের স্বাক্ষর জনগোষ্ঠীর প্রায়োগিক দক্ষতার তুলনা করলে সহজেই চোখে পড়বে যে, শিক্ষা সংখ্যায় এগুলেও মানে এগোয়নি। একইভাবে তা বুঝা যাবে এ তুলনাতে থেকেও যে, ১৯৭০-এর দশকের গোড়াতে একজন মানুষ অতি সাধারণ শিক্ষা নিয়েও সমাজে বা রাষ্ট্রে যে ধরনের চিন্তাভিত্তিক অবদান রাখার সামর্থ্য রাখতেন কিংবা তার মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও দূরদর্শিতাপূর্ণ মূল্যায়ন ও মতামতদানের যে সক্ষমতা ছিল, এখন তারচেয়ে অনেক বেশি উচ্চতর ক্লাশ ডিঙানোর পরও এ মানুষেরা তা পারছেন না। এটি বস্তুত শিক্ষার গুণগত মানহীনতাকেই নির্দেশ করছে।
বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮-৯ লাখ তরুণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার মান এতোটাই নিম্নবর্তী যে, তাতে হতাশ হয়ে বেসরকারি খাতের চাকরিদাতারা ইতোমধ্যে ১০-১৫ লাখ বিদেশিকে বাংলাদেশে চাকরি দিয়ে বসে আছেন; এবং সহসাই শিক্ষার মানগত পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে অদূর ভবিষ্যতে আরো বহুসংখ্যক বিদেশি যে বাংলাদেশের কর্মবাজারে নিজেদের দাপট দেখিয়ে বেড়াবে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। প্রায় একই অবস্থা উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্রেও। গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো জাতীয় সমস্যা বা ইস্যুতে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই রাষ্ট্র ও সমাজকে পরামর্শ ও ধারণা দিয়ে পথ দেখাতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনকার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেরণার প্রায় পুরোটাজুড়েই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবদানে ভরা। আর সে কারণেই তাঁদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে রাজাকার-আলবদরেরা ১৯৭১-এ সর্বাগ্রে এবং পরাজয়ের আগ মুহূর্তে ঐ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার জন্য সবচেয়ে বেশি মাত্রায় জীঘাংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেছিল। আর এখন সেই শিক্ষক-বুদ্ধজীবীরা নিজেরাই বিভিন্ন জাতীয় সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এটাও বস্তুত শিক্ষার অবনতিশীল ধারারই একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
গত সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের কৃষিতে যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তার পেছনে এ দেশের পরিশ্রমী-সৃজনশীল কৃষকের পর কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানই সর্বাধিক, যেটি কৃষিশিক্ষার একসময়ের উচ্চমানেরই প্রমাণ বহন করে। কৃষিবহির্ভূত অন্যান্য ক্ষেত্রেও একসময় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও অবদানের বিষয়টি খুবই উঁচু মানের না হলেও আন্তর্জাতিক ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের গোড়াতে যখন থেকে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক শাসন-ধারার পুনঃপ্রবর্তন ঘটলো (পুনঃপ্রবর্তনের বিপক্ষে বলা হচ্ছে না) ও তথাকথিত বিশ্বায়ন এসে আমাদের ওপর হামলে পড়লো, তখন থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতও অবনতিশীল ধারার দিকে ধাবিত হতে থাকলো। আর সে অধঃগামী প্রবণতারই অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে কৃষি ও অন্যান্য খাতের গবেষণা ও উদ্ভাবনের ধারাটি বহুলাংশে ম্লান হয়ে পড়া, যা দিনে দিনে আরো অধিক অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
১৯৭২ সালে জনগণের গড় মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ দশমিক ৪ ডলার, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২০ ডলারে। ১৯৭২ সনে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন, যা এখন ৫ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। ১৯৭২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশ, যা ২০২০ সালের কোভিড-পূর্ব সময়ে ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল। শিল্পোৎপাদন, রপ্তানির পরিমাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ১৯৭২ সালের তুলনায় দেশ অনেকখানি এগিয়েছে। মোটকথা, এগুলোকে বিবেচনায় নিলে গত সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের বৈষয়িক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অবশ্যই চেখে পড়ার মতো। কিন্তু পাশাপাশি যদি এ হিসাবটিকেও সামনে আনা যায় যে, এ সময়ের মধ্যে মানুষের মধ্যকার আয়বৈষম্য, সম্পদবৈষম্য, ভূমিহীনের সংখ্যা, বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা, সম্পদের মালিকানার ঊর্ধ্বমুখী মেরুকরণ ইত্যাদি সবই ১৯৭২ সালের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাহলে অর্থনীতির বৈষয়িক উন্নয়নের বাস্তব কারকারিতা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় না কি?
একই কথা সমাজ রূপান্তরের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সমাজে যে পর্যায়ের সংহতি ও সহমর্মিতা ছিল, অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের মধ্যেও মানুষের মধ্যে যে মাত্রার পারস্পরিক মমতা ও সহানুভূতির দেখা মিলতো, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ যে ধরনের ধৈর্য ও সংযমপূর্ণ জীবনযাপন করতো, সেসবের অধিকাংশই এখন হারিয়ে গিয়েছে এবং যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকুও এখন যাওয়ার পথে। সমাজ এখন নানামাত্রিক অপরাধ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মিথ্যাচার, প্রতারণা ইত্যাদিতে ছেয়ে গেছে। এবং উদ্বেগজনক হারে প্রবল হয়ে ওঠেছে এসব অন্যায় ও অনাচারের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও সমর্থন। একইভাবে অবনমন ঘটেছে সাংস্কৃতিক চর্চা ও ধর্মীয় জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও। উদার, প্রাগ্রসর ও জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতি-চর্চার সুযোগ ও সমর্থন এখন ক্রমশই সীমিত হয়ে আসছে। বিপরীতে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে ওঠছে ধর্মান্ধ মৌলবাদ। এমনকি কোথাও কোথাও উগ্র জঙ্গিবাদও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠছে বলে গণমাধ্যমে অহরহই খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীও যখন-তখন নানাস্থানে ও নানাভাবে আক্রান্ত ও নিগৃহীত হচ্ছে। অথচ একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও সংবিধান নিয়ে এ রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করেছিল। আর এ দুই অবস্থাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সমাজের অর্জন-অনর্জনের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে গেলে এটি মানতেই হবে যে, সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে গত ৫৫ বছরে এ দেশ যতোটা এগিয়েছে, পিছিয়েছে তারচেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মানগত অবস্থা ও প্রবণতা বিশ্লেষণ করতে যেয়ে এখানে সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হলেও আসলে রাজনীতিই হচ্ছে এই সবকিছুর মূল নিয়ন্তা। ফলে এখানে অন্যান্য বিষয়গুলো সামনে আসলেও রাজনীতির গুণগত মানের আলোচনাই মূখ্য। আর সেই বিবেচনা স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি যে, ১৯৭০-এর দশকে এ দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পরিবর্তন হতো কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে, কাউন্সিলর ও প্রতিনিধিদের ভােটে। ১৯৭৫-এ দেশ সামরিক শাসনের যুগে প্রবেশ করলেও এবং পর পর দু’জন সামরিক শাসক দেশ শাসন করলেও সে সময়ও যখনই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে, তখনই রাজনৈতিক দলগুলো মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে এবং ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমিত পরিসরে হলেও এ ধারার গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকেই সে চর্চা সীমিত হতে হতে সেটি এখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তবে এরমধ্যেও দেশের বাম দলগুলো পরিপূর্ণভাবে না হোক, অন্তত কিছুটা হলেও ভিন্নতা বজায় রেখে চলার চেষ্টা করছে বলে বলা যেতে পারে। অন্যদিকে দল ও সরকার এ দেশে প্রায় সবসময়ই মিলেমিশে একাকার হয়ে থেকেছে; এবং দিন যত এগিয়েছে, এই একীভূত হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ততোই আরো বেগবান হয়েছে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার একবারে গোড়া থেকেই এ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উপর তাদের নেতৃত্বস্থানীয়দের পারিবারিক প্রভাব একেবারে ছায়ার মতো লেগে আছে, যা জোরদার হতে হতে দলগুলো এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে একেকটি পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান। তদুপরি এ প্রবণতাকে আরো অধিক প্রবল করে তুলেছে দল, দলের অঙ্গ সংগঠন ও অনুগামী পেশাজীবী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপচেপড়া তোষামোদ ও চাটুকারিতা।
রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাার জন্য যাদেরকে মনোনয়ন দেয়া হয়, তাদের বাছাই করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা, জনগণের প্রতি তাদের মমত্ববোধ ইত্যাদি প্রায় কিছুই গুরুত্ব পায় না। এর বিপরীতে বরং বিত্ত ও পেশীশক্তির সামর্থই সেখানে হয়ে দাঁড়ায় বাছাইয়ের মূল মানদণ্ড। ফলে এঁরা যখন নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভায় বসেন, তখন তাঁদের অধিকাংশের পক্ষেই আর যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আমলানির্ভরতার এটিই একটি বড় কারণ। কেননা আমলাদেরকে দক্ষতা ও দাপটের সাথে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাজনীতিদের মধ্যে যে ধরনের জ্ঞান, ধারণা, চিন্তা ও অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, সংশ্লিষ্টদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বলি, তাঁদের অধিকাংশের মধ্যেই তা নেই। ফলে তাঁরা যখন মন্ত্রী, এমপি ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে যুক্ত হন, তখন তাঁদেরকে অনেকটা নিরুপায় হয়েই আমলাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। সংসদ ও অন্যান্য পর্যায়ের নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যেমনি, তেমনি দলের ও দলের অঙ্গ সংগঠনসমূহের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও মোটামুটি সেই একই দশা। আর তারচেয়েও বড় কথা, দেশের প্রায় সবদলের ক্ষেত্রেই এ কাজগুলো এখন চাপিয়ে দেয়া হয় দলসমূহের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে।
মোটকথা, বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত মানটি এখন আর একেবারেই গণতান্ত্রিক ধারার রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে মানানসই অবস্থায় নেই। এবং অধিকতর হতাশার বিষয় হচ্ছে, আমলা, বিচারক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের মধ্যে যেমন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা ও সামর্থ উন্নয়নের রেওয়াজ চালু আছে, বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে তা একেবারেই নেই। এমনকি এ ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়টিকে তাঁরা মর্যাদাকরও ভাবেন না। ফলে সংবিধান ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতাকে দায়িত্বে রূপান্তরের সামর্থটি তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠছে না বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। আর তা গড়ে না ওঠাজনিত দুর্বলতগুলোকে তাঁরা প্রায়শ পূরণ করার চেষ্টা করেন জনতুষ্টিবাদী ঘোষণা, মুখরোচক কথার ফুলঝুরি, তাৎক্ষণিকভাবে চমক সৃষ্টিকারী অবাস্তব আশ্বাস ইত্যাদির মাধ্যমে (অবশ্য রাজনৈতিক না হয়েও এ গুণগুলো এ দেশে সবচেয়ে ভালোভাবে রপ্ত করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস)। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে বিষয়গুলোকে খুবই হতাশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় না কি?
পরিশেষে তাই অপ্রিয় হলেও বলবো, বাংলাদেশের নাগরিকদের সবচেয়ে বড় অংশটিই এখন আর জ্ঞানচর্চায় বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে যুক্ত হতে চান না। এর পরিবর্তে তারা অন্যের সৃষ্ট চিন্তা ও জ্ঞান, অন্যের উদ্ভাবিত যন্ত্র ও প্রযুক্তি, অন্যের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা ইত্যাদির ওপর ভরসা করে নিজেদের জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে চান। তারা আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে না তুলে অন্যের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হয়ে থাকাটাকেই অধিকতর সাচ্ছন্দ্যকর মনে করেন। আবার এদের মধ্যকার অধিকতর প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি চায়, জনগণকে ক্ষমতায়িত না করে বহিঃশক্তির সমর্থন ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা আরোহণ করতে। মোটকথা, তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এ রাষ্ট্র জ্ঞানভিত্তিক না হয়ে হবে পেশীভিত্তিক ও মুনাফাভিত্তিক। উল্লিখিত এই নিয়ন্ত্রকেরা এ রাষ্ট্রে উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সংস্কৃতিকর্মী, বিদ্যানুরাগী ইত্যাদি কাউকেই দেখতে চান না। তার চান অধিকাংশকে ভোক্তা বানিয়ে মুনাফা ও সম্পদ কুক্ষিগতকরণের একচ্ছত্র ব্যবস্থা ও অধিকার। এমনি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে তাই ভাবতে হবে, তারা তাদের মেধা, মনন ও সৃষ্টিশীলতার বিকাশভিত্তিক রাষ্ট্র চান, নাকি গোষ্ঠীবিশেষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একচ্ছত্র মুনাফা ও সম্পদ কুক্ষিগতকরণের অধিকারবিশিষ্ট শোষণমূলক রাষ্ট্র চান। আশা করি, নাগরিকগণের মধ্য থেকে কেউ না কেউ এ প্রশ্নের জবাবদানে এগিয়ে আসবেন।
লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়