
‘সাপ্তাহিক একতা’ এদেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামের একতাবদ্ধতার প্রতীক। একতার ৫৭ বছরের পথচলা এদেশের বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের লড়াই সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশী। কৃষকদের সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের উপায়, আন্দোলন-সংগ্রামের খবরা-খবর প্রকাশ করে প্রেরণা সৃষ্টি করে কৃষক-ক্ষেতমজুর শ্রমজীবী মানুষকে একতাবদ্ধ করার মধ্যদিয়ে ‘একতা’ ইতিহাসে চিরঞ্জীব থাকবে।
‘একতা’ ৫৭ বছর ধরে এদেশের কৃষকদের ভালো থাকার জন্য নিরলস ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা ভালো নেই। ভালো থাকার নিকট সম্ভাবনার লক্ষনও স্পষ্ট নয়। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এ গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে লুটেরা, ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর এদেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর-গ্রামীণ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী তাদের অবস্থার উত্তোরণ হবে বলে স্বপ্ন দেখা শুরু করে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয় নাই। বরং আরো সংকটাপন্ন হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ৭৭টি আসন নিয়ে বিরোধী দল গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি উগ্র-সাম্প্রদায়িক জামাত নেতৃত্বাধীন জোট।
বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকদের জন্য আপাত ইতিবাচক কতক ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কতটুকু পূর্ণাঙ্গ রূপ নেবে তা এখনই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষকসহ গ্রামীণ জনপদের মানুষের সুবিধার কথা বলে জনতুষ্টিমূলক খাল খননের উদ্বোধন করলেও সারাদেশে খাল খননের আগে নদী-খালের সীমানা চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা ও দখলমুক্ত খাল রক্ষা করা, খাল খননের নামে কৃষকের জমি কেটে নেয়া ইত্যাদি বিষয়ে কোনো জরিপ না করেই এই খাল খনন কৃষকের জন্য আরো সমস্যার সৃষ্টি হবে। মূলত খাল খননের নামে দলীয় লোকজনের আর্থিক সুবিধাটাই প্রাধান্য পাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কৃষকদের দাবি ছিল প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফসহ ব্যাংক ও এনজিও ঋণ বিতরণে দুর্নীতি, হয়রানি বন্ধ করাসহ কৃষকদের সার্টিফিকেট মামলা বাতিল করা। সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করলেও কৃষকদের ঋণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নানান হয়রানীর শিকার হতে হচ্ছে। প্রকৃত উৎপাদক কৃষকদের কৃষি কার্ড বিতরণ ও কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ভর্তুকি, প্রণোদনাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের দাবি কৃষকদের দীর্ঘদিনের। পহেলা বৈশাখের দিন সরকার কৃষকের জন্য কৃষি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এই কৃষি কার্ড বিতরণে চরমভাবে দলীয়করণ করা হবে। প্রকৃত উৎপাদক প্রান্তিক কৃষকসহ ভূমিহীন কৃষকদের কৃষি কার্ড আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হবে। কৃষি কার্ড বিতরণের জন্য কৃষকদের যাচাই-বাছাইয়ের কমিটি করা হচ্ছে। সেই কমিটি গঠন নিয়েও নানান বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে সহজেই অনুমেয় সরকার দলীয় কৃষকরাই এই কৃষি কার্ডের সুবিধায় অগ্রাধিকারী। বঞ্চিত হবে অসংখ্য প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক। কৃষকদের নিজস্ব সংগঠন কৃষক সমিতির নেতৃত্বে প্রকৃত কৃষকের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট অফিসে আগেই জমা দিতে হবে। এইভাবে তালিকাভুক্ত কৃষকদের নিয়ে গ্রাম কমিটি গঠন করে সংগঠনকে প্রকৃত কৃষকের সংগঠনে রূপ দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণ দেখিয়ে কৃষকদের সেচ, ধান কাটা ও ধান ভাঙ্গানোর মেশিন এর জন্য হন্যে হয়ে খুঁজেও সময়মতো এবং প্রয়োজনমতো ডিজেল পাচ্ছেন না।
কৃষিতে এখন ভরা মৌসুম চলছে। সেই সাথে সারের ডিলাররাও সারের কৃত্তি সংকট দেখিয়ে পয়সা কামানোর ভরা মৌসুম চলছে। বেশি টাকা দিয়েও কৃষকরা পরিমাণ মতো সার পাচ্ছে না। সার না পেয়ে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে ছুটছে। চড়া দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। কৃষি বাজার সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই সিন্ডিকেটের একটি বড় অংশ সরকারদলীয় লোকজন। সরকার এখনো কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণের বা সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সরকারদলীয় লোকজন কৃষকসহ সাধারণ মানুষের ওপর নানান ধরনের নিপীড়ন চালাচ্ছে।
গত ১৩ এপ্রিল কৃষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যশোর ফুল উৎপাদক ও সমবায় সমিতির সভাপতি কৃষক নেতা আব্দুর রহিমের উপর সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা করে ব্যাপক মারধর করে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে কমিটি গঠনে প্রশ্ন তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার অপরাধে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিককে বিএনপি’র স্থানীয় নেতারা মারপিট করে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে। এরকম অসংখ্য ঘটনা চলছে সারাদেশে।
বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকদের জন্য চমকপ্রদ নানান ঘোষণা থাকলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে কৃষকদের আন্দোলন-সংগ্রামের

কোন বিকল্প নেই।
এই মুহূর্তে কৃষকদের করণীয়
কৃষকদের দাবি আদায়ের, লড়াই-সংগ্রামের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক সমিতি। প্রয়োজন সারাদেশের তৃণমূল সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো দৃঢ় করার উদ্যোগ নেয়া। একইসাথে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচির দিকে সংগঠনকে অগ্রসর করা।
আন্দোলন কর্মসূচির ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দাবিসমূহকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
১। সার-বীজ-কীটনাশকসহ সেচের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। বিএডিসি-কে কার্যকর করে সকল কৃষি উপকরণ সরাসরি কৃষকদের কাছে সরবরাহ করতে হবে। সেচের খরচ কমাতে হবে। প্রান্তিক চাষিদের বিনামূল্যে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
২। পল্লী রেশন চালু। কৃষকদের সন্তানদের বিনা পয়সায় শিক্ষা-চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা।
৩। উৎপাদন খরচের সাথে ৩৩% বাড়তি মূল্য যুক্ত করে কৃষি ফসলের দাম নির্ধারণ করা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্রয় পদ্ধতি ও নীতিমালা সহজ করে হাটে হাটে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র চালু করে খোদ কৃষকের কাছ থেকে ধানসহ কৃষি ফসল ক্রয় করা। সরকারি উদ্যোগে প্রতি মৌসুমে কমপক্ষে ২০ লাখ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করা।
৪। ধান, গম ও ভুট্টা চাষের এলাকায় ইউনিয়নে ইউনিয়নে প্রয়োজনীয় খাদ্য গুদাম এবং উৎপাদিত অঞ্চলে আলুসহ অন্যান্য সবজি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত বিশেষায়িত কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোল্ডস্টোরেজে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরাসরি ছোট কৃষকদের কোটার ভিত্তিতে আলু সংরক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কৃষকের সংরক্ষিত আলুর বিপরীতে বিনা সুদে ব্যাংক ঋণ দেয়া। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোল্ডস্টোরেজ পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন করে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।
৫। কৃষকদের সহজ শর্তে, সুদমুক্ত/স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ চালু করা। দুর্নীতি-হয়রানি বন্ধ ও সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করা। এনজিও এবং মহাজনি ঋণ আইন করে নিষিদ্ধ করা।
৬। সরকারি
পাটকল-চিনিকলসহ বন্ধ ঘোষিত সকল শিল্প-কারখানা সরকারি উদ্যোগে আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করা। ৪৪টি শিল্প-কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় বিক্রি করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করা। আখ চাষিদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা। কৃষিভিত্তিক নতুন শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
৭। তহসিল অফিস, ভূমি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস, সাব রেজিস্ট্রার অফিস, ব্যাংক, পুলিশ-থানাসহ সরকারি অফিসসমূহে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, হয়রানি বন্ধ করা। ধান-চাল-গম-ভুট্টা ক্রয়ে এবং সামাজিক সুরক্ষা/নিরাপত্তা খাতে/ প্রকল্পে সরকারি সহায়তা বিতরণে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, হয়রানি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বন্ধ করা।
৮। প্রান্তিক মৎস্য, পোল্ট্রি, ডেইরি ও গবাদিপশু খামারিদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যাংক ঋণ দেয়া। ভেজালমুক্ত খাদ্য ও ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিত করা। সিন্ডিকেট ভেঙে খামারিদের সহায়ক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৯। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া। মাতৃভাষায় শিক্ষা ও ভূমির অধিকার এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রতারণা ও জবরদস্তিমূলক দখলকৃত আদিবাসীদের সকল জমি ফেরত দেয়া।
১০। নদী পয়স্তি জমির দিয়ারা জরিপ করে প্রকৃত জমির মালিকদের সিলিং অনুযায়ী বন্দোবস্ত দেয়া। খাস জমি এবং জেগে ওঠা চর প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করে সমবায়ভিত্তিক চাষের জন্য ভূমিহীন কৃষকদের বরাদ্দ দেয়া।
১১। তিস্তাসহ সকল অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা। নদীগুলোকে দখল-দূষণমুক্ত করা। পাহাড় ধ্বস, নদী ভাঙন ও বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ক্ষতিপূরণ ও খাস জমিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা। পরিবারের ন্যূনতম একজনকে সরকারি চাকুরির ব্যবস্থা করা। তিস্তা, সিআইপি, জিকে, মাতামুহুরীসহ সকল সেচ প্রকল্প সচল করা।
১২। জলমহালসমূহের ইজারা প্রথা বাতিল করে জেলেদের ন্যায়সঙ্গত মালিকানার স্বীকৃতি দেয়া। মৎস্যজীবীদের অনুকূলে ও জাতীয় স্বার্থে জলমহাল ব্যবস্থাপনা আইন সংশোধন করা।
১৩। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী মুনাফার স্বার্থে রামপাল, রূপপুরসহ সকল পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও কৃষি জমি বিধ্বংসী প্রকল্প বাতিল করা। উন্মুক্ত কয়লা খনির অপতৎপরতা বন্ধ করা।
১৪। কৃষি বিধ্বংসী আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা।
ইত্যাদি দাবিসমূহ নিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কৃষক সমিতিকে আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পঞ্চদশ জাতীয় সম্মেলনের পথে এগিয়ে নিতে হবে। লড়াই সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। যুগে যুগে এদেশের কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির লড়াই সংগ্রামই মানবমুক্তির একমাত্র পথ।
লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সিপিবি