
আমরা এক বিভক্ত সমাজে ও রাষ্ট্রে বসবাস করছি। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলও ভীষণভাবে দ্বিধাবিভক্ত। আমরা কেউ কেউ পাশ্চাত্য যেভাবে আমাদের দেখতে শিখিয়েছে, নিজেদের জ্ঞান তৎপরতার ঐতিহ্য থেকে বিযুক্ত হয়ে হুবহু সেভাবেই নিজেদের দেখছি। আবার এর প্রতিক্রিয়ায়, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে পাশ্চাত্য-উদ্ভূত যেসব উপাদান আমাদের সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে, রক্ষণশীলতার আশ্রয় নিয়ে তার পুরোটাই চিন্তার ক্ষেত্র থেকে আমরা সাবজেক্টিভলি খারিজ করে দিচ্ছি। ফলে আমাদের চিন্তার জগতেও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে পাশ্চাত্য-উদ্ভূত আধুনিকতা, উদারবাদ, নয়া-উদারবাদ, উত্তরাধুনিকতা ইত্যাদির বিভিন্ন বয়ান; অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, ঐতিহ্যবাদ এবং নিজস্বতার নামে পাশ্চাত্য-প্রভাবিত প্রায় সবকিছুকে প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা। এই দুই মেরুর সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, বাস্তব সমাজেও তার অভিঘাত পড়ছে।
ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামো উপনিবেশ-উত্তর কালেও কীভাবে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে, আশিস নন্দীর ‘উপনিবেশায়িত মন’, কিংবা এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ ধারণাগুলো থেকে আমরা তা বুঝতে পারি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের এই অঞ্চলে এই ধারণাগুলো কতক ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা আঁকড়ে রাখার অজুহাত হিসেবে, এমনকী কতক ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুর আগ্রাসনের জাস্টিফিকেশন তৈরি করতেও ব্যবহৃত হয়েছে। শেষমেষ পাশ্চাত্যপ্রদত্ত ছাঁচে নিজেদের মেলানোর চেষ্টা, নয়তো তার বিপরীতে এক প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীলতা–উভয়ই মূলত বিশ্বায়ন বা নয়া উদারবাদের কালে প্রান্তস্থিত দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় পাশ্চাত্যচিন্তার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে নিজস্ব ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে স্বতন্ত্র আত্মবীক্ষণ অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে গেছে।
সমস্যা হলো, এই বিপরীতধর্মী বয়ানগুলোর দ্বন্দ্ব থেকে আমরা এক ধাপ অগ্রসর হয়ে সংশ্লেষণ বা ংুহঃযবংরং-এর মাধ্যমে কার্যকর নতুন কোনো থিসিস তৈরি করতে পারছি না। অথচ সমাজে এবং মানুষের জীবনপ্রকাশের মধ্যে ঠিকই সংশ্লেষণ ঘটছে। মানুষের কর্মকাণ্ড ও তৎপরতায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন বাস্তবতা, উৎপাদন সম্পর্কের নানা রূপ, এবং এসবের অভিঘাতে সৃষ্ট মতাদর্শ ও চিন্তার নির্যাস ঠিকই আমাদের সমাজে ও সমাজের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব পরিবর্তনের অভিঘাতে নতুন নতুন ভাবনা, নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রকাশ ঘটছে। বাস্তব সমাজে বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্কের রূপগুলো, মানুষের জীবনসংগ্রামের বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক বিকাশধারা কিংবা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব কীভাবে আমাদের বাস্তবতার সাথে অভিযোজিত হয়ে সামাজিক মানুষের কর্মতৎপরতাকে প্রভাবিত করছে, তা অনেকাংশেই আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আমাদের চিন্তার জগত যেখানে পুরোনো বয়ানের দ্বন্দ্বে আটকে আছে, সমাজ সেখানে নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চিন্তাচর্চার সাথে যারা যুক্ত তাদের অধিকাংশই এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করছেন নিজস্ব পূর্বনির্ধারিত বয়ান বা প্রেমিজ থেকে। আমাদের পূর্বানুমান বা বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উপাদানগুলোকেই কেবল আমরা চিহ্নিত করতে পারছি, সুতরাং বাকি সব ‘অপর’ হয়ে উঠছে। ফলে সমাজে যে বাস্তব পরিবর্তনগুলো ঘটে চলেছে, কিংবা সমাজে মানুষের সংস্কৃতি কীভাবে কত বৈচিত্র্যময় ধারায় প্রকাশিত হচ্ছে, তা অনুধাবন করতে পারছি না। ফলে সমাজ ও সামাজিক মানুষ কীভাবে তার জীবনধারণ ও কর্মতৎপরতায় দ্বন্দ্বগুলোর মোকাবিলা করছে, তা-ও বুঝতে সক্ষম হচ্ছি না।
আমাদের চিন্তার এই অচলাবস্থার শিকড় সম্ভবত লুকিয়ে আছে আমাদের যুক্তিবিচারের পদ্ধতির মধ্যেই। আমরা কি বাস্তবতা থেকে বয়ান তৈরি করছি, নাকি বয়ানের সাহায্যে বাস্তবতাকে দেখতে গিয়ে বাস্তবতার একটি নির্বাচিত সংস্করণ তৈরি করছি? সাধারণভাবে জ্ঞানপ্রক্রিয়া ও যুক্তিবিচারের ক্ষেত্রে অবরোহী পদ্ধতি বা ফবফঁপঃরাব ৎবধংড়হরহম গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। ডিডাক্টিভ যুক্তিতে একটি সাধারণ পূর্বানুমান বা ঢ়ৎবসরংব থেকে নির্দিষ্ট অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়। সেই অনুসিদ্ধান্তের সত্যাসত্য বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই করা যায়। এই পদ্ধতি ছাড়া জটিল জ্ঞানব্যবস্থা নির্মাণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখন, যখন সেই ঢ়ৎবসরংব পরিণত হয় এমন এক চূড়ান্ত সত্যে, যার ভিত্তিতে বাস্তবতাকেই সাজানো হয়। আমরা তখন ঘটনাবলি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোনো পূর্বানুমান অনুযায়ী যুক্তিগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করি যে, বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে ওই বয়ানের উপাদানগুলোই কেবল উন্মোচিত হয়। কখনো কখনো বয়ানের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে বাস্তব ঘটনা বা বিষয়বস্তুর খণ্ডিত অথবা বিকৃত উপস্থাপনও লক্ষ্য করা যায়। ফলে জ্ঞানতৎপরতা বাস্তবতা থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়ে অথবা বাস্তবতার খণ্ডিত রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞান জ্ঞানপ্রক্রিয়ায় আরোহী পদ্ধতির (রহফঁপঃরাব ৎবধংড়হরহম) ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়েছে। পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণজাত নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব সত্যের ওপর ভর করে, তা থেকে যাত্রা শুরু করে আরও বড় সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে সাহায্য করে যে ইন্ডাকটিভ রিজনিং, আমাদের চিন্তার জগতে সেদিকটা সেভাবে বিকশিত হয়নি বলে মনে হয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানও আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে পরম, মনোজগতে তৈরি করেছে প্রশ্নহীন ও সীমাবদ্ধতাহীন কিছু আপ্তবাক্য–অর্থাৎ বিজ্ঞানের পদ্ধতিকে নয়, বরং তার সিদ্ধান্তগুলোকে ধর্মীয় মতবাদের মতো অভ্রান্ত বলে গ্রহণ করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে। বিজ্ঞানকেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করছি আপ্তবাক্য নির্মাণের কাজে, খোদ বিজ্ঞানের মূল পদ্ধতি ও এর গতিশীলতাকে অস্বীকার করেই। এমনকি মার্কসবাদকে বিজ্ঞান বলে দাবি করা অনেক চিন্তকদের মধ্যেও এই প্রবণতা আমরা দেখি।
বাস্তবকে নির্মোহভাবে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের এই দুর্বলতার কারণেই বোধহয় আমরা চিন্তাজগতের দ্বন্দ্বগুলোর মধ্যে ঐক্য নির্মাণ করতে পারছি না। আমরা পূর্বনির্ধারিত ধারণার বয়ান থেকে জগৎকে দেখতে অভ্যস্ত হয়েছি ঠিকই, অথচ ভুলে যাচ্ছি যে বয়ানগুলোও অনেকাংশে আমাদের সামাজিক পরিপার্শ্ব নির্মাণে ভূমিকা রাখছে। এমনকি পূর্বানুমান বা বয়ান গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের যে সাবজেক্টিভ প্রবণতা, তারও একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। সুতরাং প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, আমাদের পূর্বানুমান বা বয়ানগুলো সত্য কি না। প্রশ্ন হলো-কোনো ঐতিহাসিক, সামাজিক ও বস্তুগত পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে এবং কোন পদ্ধতিতে আমরা সেই বয়ানগুলো তৈরি করছি?
বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের এই সাবজেক্টিভ প্রবণতার ঐতিহাসিক শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় আমাদের নিজস্ব দর্শনঐতিহ্যের দিকে। আমাদের এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী ও প্রাচীন দর্শনচিন্তাগুলোতে জ্ঞানের উৎস হিসেবে প্রত্যক্ষণ (ঢ়বৎপবঢ়ঃরড়হ) ও অনুমান (রহভবৎবহপব)-কে স্বীকার করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপমান (পড়সঢ়ধৎরংড়হ) বা স্বাক্ষ্য (ঃবংঃরসড়হ)-কেও জ্ঞানের উৎস হিসেবে বলা হয়েছে। এই জ্ঞানোৎসগুলোকে একত্রে ‘প্রমাণ’ বলা হয়, এবং বিভিন্ন দর্শনসম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক প্রমাণ স্বীকার করে। ন্যায়দর্শন চারটি প্রমাণ (প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান, শব্দ/স্বাক্ষ্য) মেনেছে, আর বৌদ্ধ দার্শনিকরা প্রত্যক্ষ ও অনুমান–এই দুটিকেই প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করেছেন।
আবার, এ অঞ্চলে প্রত্যক্ষণ বলতে পাশ্চাত্যের মতো কেবল ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণ (ংবহংব-ঢ়বৎপবঢ়ঃরড়হ) বোঝানো হয়নি। যোগসাধনা, স্বজ্ঞা (রহঃঁরঃরড়হ), ধ্যানের মাধ্যমে কোনো বিষয় সম্পর্কে সরাসরি লাভ করা ‘সাক্ষাৎ জ্ঞান’, ‘যোগজ জ্ঞান’, ‘ব্রহ্মজ্ঞান’, ‘তত্ত্বজ্ঞান’–এসবও ‘প্রত্যক্ষণ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। একদিকে ‘যাহা আছে ভাণ্ডে, তাহা আছে ব্রহ্মাণ্ডে’ ধরনের তন্ত্রমত থেকে দেহতত্ত্বে পৌঁছাতে ‘উপমান’ বা সাদৃশ্যকল্পনা যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি বেদ বা জ্ঞানী ব্যক্তির স্বাক্ষ্য (ঃবংঃরসড়হু)-কে নির্বিচারে মেনে নিয়ে জ্ঞানের পথে অগ্রসর হওয়াও আমাদের দার্শনিক ঐতিহ্যের অংশ। বৌদ্ধ সহজিয়া, সুফি মত, বৈষ্ণব মত ইত্যাদিতে সাবজেক্টিভ ‘সাক্ষাৎ জ্ঞান’ বা ‘আধ্যাত্মিক অনুভূতি’র মাধ্যমে মোক্ষলাভ, নির্বাণপ্রাপ্তি বা ফানাফিল্লাহ সম্ভব বলে মানা হয়। বাউলমতের ‘তত্ত্বজ্ঞান’, ‘দিব্যজ্ঞান’, ‘সহজজ্ঞান’ প্রাপ্তিও সেই একই ঐতিহ্যের অনুসারী। পাশ্চাত্য দর্শনে যেমন বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাজাত সত্যকে, তেমনি আমাদের এ অঞ্চলের দর্শনচিন্তায় ‘সাক্ষাৎ জ্ঞান’-এর সত্যকে চূড়ান্ত বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সত্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
মোটাদাগে বলা যায়, এ অঞ্চলের প্রভাবশালী দর্শনচিন্তায় জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়া অনেকাংশে সাবজেক্টিভ হয়েই থেকেছে–নৈর্ব্যক্তিক সত্য বা বাস্তবতার প্রামাণ্যতাকে স্বীকার করা হলেও তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় (যদিও এক্ষেত্রে চার্বাক দর্শন ব্যতিক্রম- বস্তুবাদী ও ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষণ-নিভর্র এই ধারা অন্য প্রায় সব দর্শনসম্প্রদায় থেকে ভিন্ন পথে হেঁটেছিল, এবং তাই মূলধারার বিরুদ্ধতার শিকারও হয়েছিল)। এখনো হয়তো সেকারণেই আমাদের চিন্তাজগতে বয়ানগুলো নির্মাণ করতে অবজেক্টিভ বাস্তবতার নির্মোহ বর্ণনার চেয়ে সাবজেক্টিভ প্রবণতার প্রাধান্যকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাস্তবতার নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলা দরকার আজকের দিনের ‘সত্য’, ‘বয়ান’, ‘ডিসকোর্স’, ‘ন্যারেটিভ’, ‘থিসিস-অ্যান্টিথিসিস’ কিংবা ডিডাক্টিভ রিজনিং-এর ঢ়ৎবসরংব। অর্থাৎ বাস্তবতা থেকে বয়ানের জন্ম হওয়া দরকার, বয়ানের ভিত্তিতে বাস্তবতা নয়। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের কোনো পূর্বধারণা থাকবে না। এটাও নয় যে, সবকিছুই আবার নতুন করে প্রমাণ করতে হবে। কোনো মানুষই সম্পূর্ণ পূর্বানুমানহীনভাবে বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। আমরা যে ভাষায় ভাবি, যে ইতিহাসের মধ্যে বড় হই, যে সামাজিক সম্পকের্র মধ্যে বাস করি, যে জ্ঞানব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিই–সবই আমাদের পর্যবেক্ষণকে প্রভাবিত করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের পূর্বানুমানকে প্রশ্ন করতে পারব না। বরং জ্ঞানচর্চার পরিণত রূপ হলো নিজের ঢ়ৎবসরংব-কেও পরীক্ষার আওতায় রাখা। বাস্তবতা যখন আমাদের বয়ানের সঙ্গে মেলে না, তখন বাস্তবতাকে অস্বীকার করার আগে বয়ানটিকেও প্রশ্ন করা। বয়ানগুলো যাতে বিচারবিহীন আপ্তবাক্যে পরিণত না হয়, যাতে বাস্তবতার নতুন নতুন উপাদান সেই বয়ানগুলোরও পরীক্ষা করতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা জরুরি। একটি তত্ত্ব যত শক্তিশালীই হোক, বাস্তবতার নতুন তথ্যের কাছে তাকে পরীক্ষিত হতে হবে।
একারণেই মার্কসের চিন্তার গুরুত্ব আমাদের জন্য এখনো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মার্কস বিমূর্ত দর্শনকে কেবল মনোজগতের ধারণার মধ্যে আটকে রাখেননি; মানুষের বাস্তব জীবন, উৎপাদন, শ্রম, উৎপাদন সম্পর্ক, শ্রেণি সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছে সমাজকে বোঝার জন্য শুধু মানুষ কী ভাবছে তা যথেষ্ট ছিল না; মানুষ কীভাবে উৎপাদন করছে, কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে, কীভাবে তার জীবন পুনরুৎপাদন করছে–এসবও বোঝা জরুরি ছিল। অর্থাৎ দর্শনকে তিনি বাস্তবতার কঠিন জমিনে নামিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু মার্কসকে অনুসরণ করার অর্থও যদি হয় তাঁর প্রতিটি ধারণাকে অপরিবর্তনীয় আপ্তবাক্যে পরিণত করা, তাহলে মার্কসের পদ্ধতিকেই অস্বীকার করা হয়। মার্কসীয় চিন্তার শক্তি কেবল কিছু নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে নয়; বরং সমাজকে তার বস্তুগত ও ঐতিহাসিক গতিশীলতার মধ্যে বোঝার পদ্ধতিতে।
বাস্তবতা হলো সমাজের মানুষ যন্ত্রের মত কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম বা ম্যানুয়াল অনুযায়ী জীবনযাপন করে না। মানুষ তার প্রয়োজন, আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রযুক্তি, বাজার, পরিবার, রাষ্ট্র, শ্রেণি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জটিল আন্তঃসম্পকের্র মধ্যে জীবনযাপন করে। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসী এবং আধুনিক প্রযুক্তিনিভর্র হতে পারেন। কেউ একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির ধারক এবং বৈশ্বিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভোক্তা হতে পারেন। কেউ বাজারব্যবস্থার অংশ হয়েও তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন। কেউ ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করেও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নিভর্র করতে পারেন। বাস্তব মানুষ এই বিরোধগুলোকে কোনো তাত্ত্বিক ম্যানুয়াল অনুসারে সমাধান করে না। তার জীবনেই এগুলোর বাস্তব সংশ্লেষণ ঘটে।
সুতরাং সমাজকে বুঝতে হলে মানুষের এই বাস্তব সংশ্লেষণ অনুধাবন করা দরকার। আমাদের চিন্তকদের কাজ হওয়া উচিত আগে থেকে নির্ধারিত কোনো পূর্বানুমান চাপিয়ে না দিয়ে সেই বাস্তব সংশ্লেষণকে তাত্ত্বিকভাবে বোঝা। এই সময়ে এসে আমাদের মাটিতে ফেরা দরকার। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা দরকার আমাদের বাস্তবতা ও পরিপার্শ্বকে। আমদানিকৃত উদারবাদী, নয়া-উদারবাদী, ধর্মীয় রক্ষণশীল, আধুনিক কিংবা উত্তরাধুনিক বয়ানের আদলে নয়; আবার উচ্চবিত্ত- মধ্যবিত্ত নির্মিত উপরিভাসা কৃত্রিম সংস্কৃতির মধ্যেও নয়—সমাজের মূলধারা ও প্রান্তস্থিত মানুষের জীবনধারণের সংস্কৃতির মধ্যে নিজেদের তালাশ করা দরকার। খুঁজে দেখা দরকার, ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের কোন কোন উপাদান আমাদের সমাজকে স্পর্শ করে গেছে। কোন উপাদান আমাদের অর্থনীতি, পরিবার, ধর্মীয় জীবন, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনৈতিক চেতনা, শ্রমবিভাগ, উৎপাদন সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে ও বদলে দিচ্ছে। কোন উপাদানগুলো আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসূচক চিন্তা ও তৎপরতার পলিমাটিকে ভিন্ন ভিন্ন আকার দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। আমাদের তাকাতে হবে বুদ্ধিজীবীরা কী লিখছেন কেবল তার দিকে নয়; বরং মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করছে তার দিকে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন বয়ান জনপ্রিয় তা নয়; বাজারে, কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, গ্রামে, শহরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ধর্মীয় পরিসরে, শ্রমের জায়গায় মানুষ বাস্তবে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে–দেখতে হবে সেগুলোকেও।
সমাজের মানুষ আমাদের বয়ানের অপেক্ষায় বসে থাকে না। মানুষ তার জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। উৎপাদন সম্পর্ক বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়, আকাঙ্ক্ষা বদলায়, সামাজিক সম্পর্ক বদলায়। বাস্তব জীবন নিজের মধ্যেই নানা দ্বন্দ্বের সংশ্লেষণ ঘটাতে থাকে। আমাদের চিন্তার কাজ সেই জীবন্ত বাস্তবতার পেছনে হাঁটা নয়; তাকে বুঝে তার অন্তর্নিহিত গতি ও দ্বন্দ্বকে ধারণ করা। তা না হলে আমাদের জ্ঞানতৎপরতা সমাজের মানুষের বৈচিত্র্যময় কর্মতৎপরতার অনেক পেছনেই পড়ে থাকবে। আর তখন আমাদের দর্শন যতই পরিশীলিত, আমাদের বয়ান যতই আকর্ষণীয় এবং আমাদের তর্ক যতই তীব্র হোক, তা সমাজ বদলানোর কোনো কার্যকর পথনির্দেশনা দিতে পারবে না। আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়তো নতুন কোনো আপ্তবাক্য নির্মাণ নয়; বরং আপ্তবাক্যের মোহ থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার দিকে তাকানো। চিন্তার আকাশ থেকে মাটিতে নামা। বয়ানের আয়না থেকে বাস্তবতার জমিনে ফিরে আসা।
লেখক: শিক্ষক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়