ভূ-রাজনীতি

বাংলাদেশ : তিন পরাশক্তির রণক্ষেত্র

ড. আখতার সোবহান মাসরুর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশ আজ এক সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ বাংলাদেশকে তাদের মল্লযুদ্ধের ময়দান বানাতে চায়। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ ও এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়া দিল্লি- এই তিন বৃহৎ শক্তিই বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূল, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ ও ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের নৈকট্য বাংলাদেশকে এই আঞ্চলিক গ্রেট গেম বা মহারণের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সরকার পতন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও বিএনপির ক্ষমতারোহণ- এই দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে তিন শক্তির নতুন দৌড়ঝাঁপ চলছে। বিশ্বপুঁজির আন্তঃবিরোধ থেকে ওয়াশিংটনের মূল আগ্রহ হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক-সামরিক প্রভাবক্ষমতা তৈরি করা। মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা ছাড়ার প্রাক্কালে ওয়াশিংটনের সাথে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে আগামী পনের বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য ও ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এই বাণিজ্য চুক্তির অধীনে ৭ হাজার ১৭৫টি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুল্কমুক্ত হবে। অবশিষ্ট তালিকাভুক্ত পণ্য আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে শূন্য শুল্কে যাবে। এর কুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করবে। এছাড়াও, চুক্তির ৪.১ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা রক্ষার্থে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তবে বাংলাদেশকেও সেই মার্কিন পদক্ষেপের সমর্থনে সংগতিপূর্ণ বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দ্বন্দ্বে জড়াবে? চুক্তিতে আরো এমন সব ধারা আছে যা সরাসরি জাতীয় স্বার্থ ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী। একে দাসখত বললে অত্যুক্তি হবে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে নতুন করে সামরিক চুক্তি করার চাপও রয়েছে। এছাড়াও, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে গুঞ্জন চলছে। বেইজিংয়ের জন্য বাংলাদেশ তার বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কৌশলের একটি অংশ। চীনের কৌশল হলো অর্থনৈতিক সংযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ধীরগতিতে চললেও বেইজিং তা বহাল আছে। জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে ১৫টির বেশি সমঝোতা স্মারক ও ৩০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান ঘোষিত হয়। বেইজিং বাংলাদেশের সামরিক খাতের মূল সরবরাহকারী। সম্প্রতি ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনাও উল্লেখযোগ্য। বেইজিং চায় মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক করিডোর ও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশের সুযোগ। আর নয়া দিল্লির মূল উদ্বেগ নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, বিশেষত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও ২২ কিলোমিটার চওড়া শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষা। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিরোধিতা তীব্র হয়। এই সাথে কূটনৈতিক প্রতিবাদ ও ভিসা স্থগিতাদেশে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভারতীয় সুতা (৮০%) ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি হয় ভারত থেকে। সীমান্ত হত্যা, পুশ ইন ও উজানে অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন তিন পরাশক্তির ত্রিভুজ সংঘাতের রণক্ষেত্র। ওয়াশিংটন শুল্ক বাণিজ্য-সামরিক চুক্তিতে চীনা প্রভাব ঠেকাতে চায়, আর চীন অর্থনৈতিক সংযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অবস্থান শক্ত করতে চায়। উভয়ই চায় আমাদের বঙ্গোপসাগর অংশে প্রবেশ করতে। চীন-ভারত বৈরি সম্পর্কের কারণে ভারত বাংলাদেশে চীনের যে কোনো উপস্থিতির বিরুদ্ধে। ওয়াশিংটন-দিল্লি ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলে চীনকে ঘেরাও করতে চায়, এ বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ অনেকটা অভিন্ন। পরাশক্তির এই প্রতিযোগিতা একদিকে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির সুযোগ এনে দিয়েছে। অপরদিকে, পরাশক্তিগুলোর ফাঁদে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেকে কোনো দেশের প্রতি না ঝুঁকে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলে স্থির থাকতে হবে। ঋণ-ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে। পরাশক্তির সাথে কোনো সামরিক চুক্তি নয়। বাংলাদেশের কৌশলগত সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী ও সেন্ট মার্টিনের উপর পূর্ণনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। সরকার ও বিরোধীদল নিরব থেকে বাণিজ্যচুক্তির নামে দাসখত মেনে নিয়েছে। কেবল মেনেই নেয়নি, উপরন্তু, ক্ষমতার খেলায় সবাই যেন মার্কিনের পকেটস্থ। ক্ষমতাসীন বিএনপি মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে মুখে তালা মেরে আছে। জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে হইচই করলেও, জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি, ঐক্যবদ্ধভাবে নিরব। এর মধ্যেই মার্কিন প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে আনাগোনা বেড়েছে, তারা সরকার, জামাত ও এনসিপির সাথে বৈঠক করছেন। শ্রেণি হিসেবে এরা সাম্রাজ্যবাদের সাথে একাট্টা। এ ধরনের চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পুনঃউপনিবেশকরণ ঘটছে। মীর জাফর যেমন একদিন দেশকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হতে তুলে দিয়েছিল, ইউনুস সরকারও তাই করেছে। আর পাশে থেকে অন্যরা চুপ থেকে দেশকে সেদিন কোম্পানির কাছে নবাবকে পরাজিত হতে সহায়তা দিয়েছিল। আজও পুনরুদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্রীড়নকরা চুপ থেকে সহায়তা দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের বামপন্থি রাজনৈতিক দল, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি, নাগরিক মঞ্চ ও কিছু গবেষক এই চুক্তির বিরোধিতা করছেন। শক্তির দিক থেকে দুর্বল হলেও বামপন্থিরাই কেবল চুক্তির বিরুদ্ধে মাঠে আছেন। তারা স্পষ্টভাবে সরকারকে চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানিয়ে একে অসম ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশ এই খেলায় পড়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। না খেয়ে অস্ত্র কেনার পথে হাঁটছে দেশ। যুদ্ধবিমান, ড্রোন কেনার পেছনে ছুটছে সরকার। এতে করে দেশের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ অর্জিত সাফল্যের হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমরা দেশের স্বার্থ বজায় রেখে লেনদেন, ব্যবসা করতে চাই, কিন্তু কারো ক্রীড়নক হতে চাই না। আমরা শান্তির পথে থাকতে চাই, কোনো সামরিক চুক্তি চাই না। দেশের টাকা পয়সা দিয়ে অস্ত্র, মিসাইল, যুদ্ধ বিমান না কিনে সেটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুদের উন্নতি ও বয়স্কদের সেবায় ব্যয় করতে চাই। আমাদেরকে হানাহানির পথ পরিহার করে বিশ্বপুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। লেখক: লেখক ও গবেষক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..