
একশত বছরের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন এবং আরও একশত বছরের ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে রিক্ত-নিঃস্ব করে তুলেছিল। কিন্তু ভারতের জনগণ কোনোদিনই বিদেশি শাসন মেনে নেননি। পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, মোহন লালের জীবনবাজী সংগ্রাম, মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহ ও আত্মদান, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, যাকে কার্ল মার্কস প্রথম ‘ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন- তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শতবর্ষের দুঃশাসনের অবসান ঘটায়। ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে।
এরপর শতবর্ষের সংগ্রামে ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, দিনেশ, বাদল, সূর্যসেন ওরফে মাস্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং চট্টগ্রামের স্বাধীনতা ঘোষণা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও আত্মদান, কল্পনা দত্তের ওরফে কল্পনা যোশীর সংগ্রাম-এর বিপ্লবের নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
গান্ধী-জিন্নাহর লড়াই, লবণ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ইংরেজ শাসনের শেকড় ধরে নাড়া দেয়। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম সবচেয়ে জোরদার হয়ে ওঠে বাংলায় ও পাঞ্জাবে। সেই কারণে ধূর্ত ইংরেজ চক্রান্তমূলকভাবে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ১৯০৫ সালে দ্বিধাবিভক্ত করে। ভাগ কর ও শাসন কর ইংরেজের এই কূটকৌশল ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামকে দুর্বল করা।
বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহ ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায়। কিন্তু গান্ধীর অহিংস নীতিতে সে আন্দোলনে পানি ঢেলে দেওয়া হয়। কংগ্রেসের এই আপসকামী মনোভাবের বিরুদ্ধে নেতাজী সুভাষ বসু বিদ্রোহ করেন। কংগ্রেসের নির্বাচনে নেতাজী বিপুল ভোটে দুই-দুইবার জয়যুক্ত হন। কিন্তু গান্ধীর ষড়যন্ত্রে নেতাজীকে কোণঠাসা করা হয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গান্ধীর এই হীন তৎপরতার বিরুদ্ধে নিন্দা জানান এবং টেলিগ্রাম করে গান্ধীকে জানান, “ইবহমধষ যধং নববহ যঁৎঃ.”
গান্ধী তখন নেহরুকে সঙ্গে করে হিন্দু-মুসলমানের আন্দোলনকে নানাভাবে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালান। নেতাজী সুভাষ এবং মওলানা আজাদ এই হীন তৎপরতার বিরোধিতা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত-
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের এই মর্মে একটি চুক্তি হয় যে স্বাধীন ভারতে একবার মুসলমান রাষ্ট্রপতি ও হিন্দু প্রধানমন্ত্রী কয়েক বছর পর পর পালাবদল করবে। এই চুক্তি লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে জানানো হয় এবং তিনি সম্মত হন। কিন্তু নেহরু পরে ঘোষণা করেন যে, স্বাধীনতার পর সেই চুক্তি তিনি মানতে বাধ্য নন। এই চুক্তির ব্যাপারে মওলানা আজাদ তাঁর ওহফরধ ডরহং ঋৎববফড়স বইতে উল্লেখ করেন।
এর ফলে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে জমিদার ও জমির বড় বড় মালিক ছিল হিন্দু, আর পূর্ববঙ্গে ছিল তার উল্টোটা। যার ফলে জমিদার ও কৃষকের শ্রেণিসংগ্রাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জনগণকে নিয়ে এর বিরোধিতা করতে থাকে।
মুসলিম লীগ গান্ধী-নেহরুর চক্রান্তের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ঘোষণা করে। ঐ দিন এই কর্মসূচি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয় এবং বহু হিন্দু-মুসলিম এতে প্রাণ হারান। এটা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং হিসেবে আখ্যায়িত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গায় নীরব থাকার অভিযোগ তদন্ত করা হয়। তখন মুসলিম তরুণ-যুবকরা সবাই পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষ নেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানের জন্ম হয়। জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হাজার মাইল দূরে পূর্ব বাংলার গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হয় খাজা নাজিমুদ্দিনকে। ভারত বিভক্তির ফলে উভয় দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করে রাতারাতি মুহাজের হয়ে যায়। বহু লোক দাঙ্গায় হতাহত হয়। তাদের পরিবার ধ্বংস হয়।
কিন্তু পাকিস্তান নামের এই কৃত্রিম রাষ্ট্র বেশিদিন টিকতে পারেনি। কমিউনিস্টরা এই বিভক্তি মেনে নিতে পারেনি। তারা ঘোষণা করে, “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।”
পূর্ব বাংলার জনগণ ক্রমেই বুঝতে পারে যে ব্রিটিশ শাসনের পরে তাদের বুকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি ঔপনিবেশিক শাসন চেপে বসেছে। কমিউনিস্ট পার্টির অনেকেই মৃত, অনেকেই দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। এই অবস্থায় কমরেড মণি সিংহ সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুললেন।
নাচোলে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ, মণি সিংহের নেতৃত্বে নেত্রকোনায় সশস্ত্র টংক বিদ্রোহ, সিলেটে বারীন দত্ত প্রমুখের নেতৃত্বে সংগ্রাম, উত্তরবঙ্গে মণি কৃষ্ণ সেন, গুরুদাস, হাজী দানেশ, তালুকদার প্রমুখের নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন-পূর্ববাংলায় এক অগ্নিগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি করে।
ইতিমধ্যে বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। মণি সিংহের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রভাবে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণজোয়ারের কারণে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম আওয়ামী লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাতিল করা হয়। এবং পরবর্তীতে ‘৪৮-এর এবং ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত করে।
এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ভারত বিভাগ যে ভুল ছিল, তা প্রমাণ করে দেয়।