
জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তবে একে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় না। জলবায়ু সংকট একই সঙ্গে ক্ষমতা, সম্পদ ও মুনাফার রাজনীতির সংকট। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং শ্রেণিগত সংকট, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষক, ক্ষেতমজুর, জেলে এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনে।
জলবায়ু সংকটের বৈজ্ঞানিক কারণ বিশ্লেষণ অবশ্যই জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৃতি লুণ্ঠনের রাজনৈতিক অর্থনীতিও বোঝা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো-কেন প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে? কার স্বার্থে ধ্বংস হচ্ছে? এর মূল্য কে দিচ্ছে?
পরিবেশ-মার্কসবাদী বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, প্রকৃতি ধ্বংস কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল, যার ভিত্তি মুনাফা। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা প্রকৃতিকে জীবনের ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং মুনাফা অর্জনের উপকরণ হিসেবে দেখে। নদী, বন, পাহাড়, জমি, খনিজ সম্পদ, জল কিংবা জীববৈচিত্র্য-সবকিছুকেই পুঁজিবাদ পণ্যে পরিণত করে। পুঁজিবাদের কাছে প্রকৃতি জীবনের উৎস নয়, কেবল কাঁচামালের ভাণ্ডার।
মহামতি কার্ল মার্কস প্রকৃতিকে মানুষের শ্রমপ্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। শ্রমের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একটি জৈবিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু পুঁজিবাদ এই সম্পর্ককে বিকৃত করে এবং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা জৈবিক সম্পর্ক ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুনাফার জন্য পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে দখল করতে চায়। এই প্রবণতা থেকেই পরিবেশগত সংকটের জন্ম।
মার্কস উনিশ শতকেই দেখিয়েছিলেন যে, পুঁজিবাদ শুধু শ্রমিককেই শোষণ করে না; একই সঙ্গে মাটি ও প্রকৃতিকেও শোষণ করে। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী কৃষি একদিকে কৃষিশ্রমিকের শক্তিকে নিঃশেষ করে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতাকেও ধ্বংস করে। মানুষের প্রয়োজন পূরণ নয়, উৎপাদনের উদ্দেশ্য যখন মুনাফা অর্জন হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রকৃতি আর মানুষের যৌথ জীবনভিত্তি থাকে না; পরিণত হয় দখল, লুণ্ঠন ও বাণিজ্যের বস্তুতে।
জলবায়ু সংকটের কারণ খুঁজতে গেলে কেবল কার্বন নিঃসরণের পরিসংখ্যান দেখলে হবে না; দেখতে হবে সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে, যা সীমাহীন মুনাফার জন্য প্রকৃতি ও মানুষ উভয়কেই শোষণ করে। সেই ব্যবস্থার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী উৎপাদনের সহজ যুক্তি-উৎপাদন বাড়াও, মুনাফা বাড়াও, বাজার সম্প্রসারণ করো। এই যুক্তির কাছে প্রকৃতি, মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ গৌণ। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব সীমা রয়েছে। প্রকৃতির পুনরুৎপাদনের সময় ও সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করার ফলেই আজকের পরিবেশগত বিপর্যয়।
প্রকৃতি একটি আন্তঃনির্ভরশীল ব্যবস্থা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জটিল ভারসাম্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। মুনাফার তাগিদে পুঁজিবাদী আগ্রাসন এই ভারসাম্যকে ক্রমাগত ধ্বংস করছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে সখ্য, তাতে ভাঙন সৃষ্টি করছে। বন ধ্বংস, নদী দূষণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, শিল্পায়নের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং সীমাহীন ভোগবাদ প্রকৃতি ও সমাজের ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
মার্কস দেখিয়েছেন, মুনাফার তাগিদে পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে সীমাহীন সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করে। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকৃতির পুনরুৎপাদনের সীমাকে উপেক্ষা করে। প্রকৃতির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পুঁজিবাদ আগ্রাসী তৎপরতা চালায়। ফলে সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যে যে ফাটল তৈরি হয়, মার্কসের ভাষায় সেটিই হলো ‘মেটাবলিক রিফট’ বা জৈবিক বিচ্ছেদ। আজকের জলবায়ু সংকট সেই বিচ্ছেদেরই বৈশ্বিক রূপ। মাটির উর্বরতা হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, চরম আবহাওয়ার বিস্তার, প্রাকৃতিক সম্পদের নিঃশেষণ এবং বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন জমা হওয়া-সবই এই মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার বহুমাত্রিক পরিণতি। মার্কস ও এঙ্গেলস ঊনবিংশ শতাব্দীতেই পুঁজিবাদের পরিবেশবিধ্বংসী চরিত্র, অরণ্য ধ্বংস, কয়লার মজুত হ্রাস এবং কৃষিক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা হ্রাসের মতো সমস্যা সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন।
বাংলাদেশে জলবায়ু সংকটের অভিঘাত বৈশ্বিক বাস্তবতারই স্থানীয় প্রকাশ। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার বিস্তার বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কার্বন নিঃসরণ করে এই সংকটের সৃষ্টি করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হচ্ছে যেসব দেশকে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম।
দেশের ভেতরেও উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করছে লুটেরা শাসকশ্রেণি; কিন্তু এর পরিণতি বহন করছে শ্রমজীবী মানুষ। জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সেই মানুষগুলো, যারা এর জন্য সবচেয়ে কম দায়ী। কৃষক, ক্ষেতমজুর, জেলে এবং শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। ফলে জলবায়ু সংকট কেবল পরিবেশগত নয়; এর একটি স্পষ্ট শ্রেণিগত দিকও রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার সত্ত্বেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কোটি মানুষের জীবিকা এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু সংকট আজ শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, কৃষির অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। নদী, বৃষ্টি, মাটি এবং ঋতুচক্রের স্বাভাবিক গতিধারার ওপর উৎপাদন নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই স্বাভাবিক ছন্দ ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ-সব মিলিয়ে কৃষক-ক্ষেতমজুরকে এখন এক অনিশ্চয়তার যুগে বসবাস করতে হচ্ছে।
প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, বন উজাড় হচ্ছে, নদী দূষিত হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। খরা, লবণাক্ততা, আগাম বন্যা কৃষিকে সংকুচিত করছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। জলবায়ু সংকটের অভিঘাতে কৃষি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁঁকির মুখে পড়ছে।
সংকট শুধু জলবায়ুর নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করপোরেট কৃষির বিস্তার, কৃষিজমির বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং কৃষককে ক্রমাগত বাজারনির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা। বাংলাদেশের কৃষি ক্রমশ করপোরেটনির্ভর হয়ে উঠছে। উৎপাদনের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ কমছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচব্যবস্থা এবং বিপণন ব্যবস্থার বড় অংশ করপোরেট ও মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
উৎপাদনের ঝুঁঁকি নিতে হয় কৃষককে, কিন্তু মুনাফার বড় অংশ চলে যায় ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে। পুঁজিপতি তার পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন, কিন্তু কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। ফসল নষ্ট হলে ক্ষতি বহন করেন কৃষক; কিন্তু কৃষি-বাণিজ্যের মুনাফায় তার অংশ সবচেয়ে কম। ফলে জলবায়ু বিপর্যয় ও বাজারের শোষণ-উভয় আঘাতই তাকে বহন করতে হয়। এখানেই পরিবেশ-প্রশ্ন এবং শ্রেণি-প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।
পরিবেশ আন্দোলন কখনই শ্রেণিসংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নদী-বন-কৃষিজমি রক্ষা কিংবা জলবায়ু ন্যায়বিচারের (ঈষরসধঃব ঔঁংঃরপব) প্রশ্নকে যদি শ্রেণি-প্রশ্ন হিসেবে দেখা না হয়, তাহলে আন্দোলনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, প্রকৃতি ধ্বংসের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে উৎপাদনকারী মানুষ-কৃষক, ক্ষেতমজুর, জেলে ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। কৃষক, ক্ষেতমজুর ও শ্রমিকের লড়াই এবং পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম মূলত একই রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ। এসব সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উৎপাদন ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
জলবায়ু সংকট আমাদের সামনে কেবল একটি পরিবেশগত প্রশ্ন নয়, একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করেছে-পৃথিবী কি পরিচালিত হবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী, নাকি মুনাফার যুক্তি অনুযায়ী? কৃষি কি খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হবে, নাকি করপোরেট মুনাফার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ, পরিবেশের ভবিষ্যৎ এবং মানুষের ভবিষ্যৎ।
কৃষির ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নটি প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্ন থেকে আলাদা নয়। নদী, বন, কৃষিজমি, জলাভূমি রক্ষা মানে কৃষি, জীবন-জীবিকা, জলবায়ু রক্ষা। অতএব, পরিবেশ আন্দোলনকে মানুষের জীবন-জীবিকা, অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
আজকের বিশ্বে ‘সবুজ পুঁজিবাদ’ (এৎববহ ঈধঢ়রঃধষরংস) তত্ত্ব প্রচার করা হচ্ছে। কার্বন বাণিজ্য (ঈধৎনড়হ ঞৎধফরহম), কার্বন ক্রেডিটের (ঈধৎনড়হ ঈৎবফরঃ) মতো বাজারনির্ভর পরিবেশ সমাধানের কথা বলা হচ্ছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলার নামে এসব উদ্যোগকে পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তবে এগুলো প্রায়ই দূষণ ও প্রকৃতি ধ্বংসের মূল কারণকে অক্ষত রেখে সংকটকে বাজারের নতুন ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত করে। ফলে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটিও করপোরেট মুনাফার যুক্তির অধীন হয়ে পড়ে। পরিবেশ-মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে, মুনাফার যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবস্থা জলবায়ু সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। প্রকৃত সমাধান নিহিত রয়েছে উৎপাদন ও ভোগের বর্তমান কাঠামো, সম্পদের মালিকানা এবং উন্নয়নের চরিত্র পরিবর্তনের মধ্যে; এমন একটি সমাজ গঠনের মধ্যে, যেখানে প্রকৃতি মুনাফার উৎস নয়, বরং মানুষের যৌথ জীবনভিত্তি।
অতএব, জলবায়ু সংকটের সমাধান কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি উৎপাদনব্যবস্থা, সম্পদের মালিকানা এবং উন্নয়নের চরিত্র পরিবর্তনের প্রশ্নও। প্রকৃতি ও কৃষিকে রক্ষা করতে হলে মুনাফাকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে মানুষকেন্দ্রিক, পরিবেশসম্মত এবং ন্যায়ভিত্তিক বিকল্প উন্নয়নের পথ নির্মাণ করতে হবে।
একদিকে মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথ; অন্যদিকে কৃষিবান্ধব, পরিবেশসম্মত ও মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নের পথ। প্রথম পথ কৃষিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে; দ্বিতীয় পথ খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের। এই দ্বন্দ্বই আজকের কৃষি ও পরিবেশ সংকটের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
মার্কসবাদীরা মনে করেন, পরিবেশ সংকটের স্থায়ী সমাধান পুঁজিবাদের কাঠামোর মধ্যে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যকার জৈবিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদনের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এর সমাধান সম্ভব।
মার্কসবাদী চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পরিবেশনীতি ও সংরক্ষণ কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়েছে। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক সংরক্ষিত এলাকা (তধঢ়ড়াবফহরশ) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৯ সালে আস্ত্রখান সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
প্রকৃতি ধ্বংস হলে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হয়। আর কৃষক-ক্ষেতমজুর না বাঁচলে দেশের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই প্রকৃতি লুণ্ঠনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং কৃষির ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম আজ একই লড়াইয়ের দুই নাম।
প্রকৃতি রক্ষার সংগ্রাম কোনো মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমভিত্তিক বিলাসী পরিবেশবাদ কিংবা এনজিও প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি জীবন-জীবিকা রক্ষার সংগ্রাম। এটি কৃষকের জমি, নদী, জল, বন এবং উৎপাদনের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমিক, পরিবেশকর্মী, বিজ্ঞানী, ছাত্র-যুব এবং গণতান্ত্রিক শক্তির বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানোর সংগ্রাম নয়; এটি মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা ও তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা-কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার সংগ্রাম। এটি এমন এক সমাজের জন্য সংগ্রাম, যেখানে প্রকৃতি বাজারের পণ্য নয়, মানুষের যৌথ সম্পদ; যেখানে কৃষি করপোরেট মুনাফার ক্ষেত্র নয়, খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি; এবং যেখানে উন্নয়নের মানদণ্ড হবে মানুষের কল্যাণ, পুঁজির মুনাফা নয়।
প্রকৃতি ও মানুষের মুক্তির লড়াই একই সূত্রে গাঁথা। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন কৃষি রক্ষাসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জমি, জল, বন রক্ষা তথা পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম এবং শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সেই সংগ্রামের ভিত্তি হতে হবে শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-কৃষক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের ঐক্য। প্রকৃতি, কৃষি, মানুষ বাঁচাতে আগ্রাসী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই আরও তীব্র করতে হবে।
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), কেন্দ্রীয় কমিটি