পত্রিকা
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
এস এ রশীদ
একতা এদেশের গণমানুষের সংবাদ দর্পণ। একতা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-যুদ্ধ, উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন বিরোধী ও লুটেরা ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের বিপরীতে শোষণ-বৈষম্যবিরোধী গণতন্ত্র -সমাজতন্ত্রের লড়াই সংগ্রামের পক্ষে মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর। ১৯৭০ সালের ৩১ জুলাই সাপ্তাহিক একতার আনুষ্ঠানিক জন্ম। তারও অনেক অনেক দিন আগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশ করেছিলেন “সাপ্তাহিক লাঙ্গল” পত্রিকা। প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল কাজী নজরুলের সাম্যবাদী কবিতা। সেখানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো ম্যাক্সিম গোর্কির বিখ্যাত উপন্যাস “মা’ এর অনুবাদ, মহামতি কার্ল মার্কসের ধারাবাহিক জীবনী, রুশ বিপ্লব ও মহামতি লেনিনকে নিয়ে নানা লেখা এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানা দিক ও গণসংগ্রামের খবরাখবর। ১৯২৫ সালে লাঙ্গলে প্রধান খবর ছাপা হয়েছিল ‘কলিকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা, দায় কার?’ কমরেড মোজাফফর আহমদ লিখলেন ‘ধর্ম ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধ, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন ‘ধর্ম রক্ষায় হিন্দু মুসলমান’। লাঙ্গলে প্রকাশিত হয়েছিল দাঙ্গার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ৫০ জন মুসলমানকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তখন স্থানীয় হিন্দুরা টের পেয়ে ঠাকুরবাড়িতে হাজির হয়ে হুমকি দেয়–মুসলমানদের তাদের হাত তুলে না দিলে ঠাকুরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে। ১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিল সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
কমরেড মোজাফফর আহমদ-এর সম্পাদনায় ১৯২৬ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয় “গণবাণী”। কাজী নজরুলের লাঙ্গল মূলত গণবাণীর সাথে একীভূত করা হয়। অনেকদিন ধরে চলার পর ১৯২৯ সালে বিট্রিশ সরকার এ পত্রিকাটিও বন্ধ করে দেয়।
এরপর ১৯৩১ সালে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয় “চাষি মজুর” নামে একটি পত্রিকা। ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হওয়া “আগে চলো” পত্রিকাটিও বেশিদিন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৪২ সালের ১ মে প্রকাশিত হয় “জনযুদ্ধ” পত্রিকা। ১৯৪৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় “দৈনিক স্বাধীনতা” পত্রিকা। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অসংখ্য প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চেতনার নানা পত্রপত্রিকা। এসকল পত্রিকার ছিল বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, নির্ভীক সাংবাদিকতা।
পরবর্তীকালে পূর্বসূরিদের অনেককিছুই গ্রহণ করেছে সাপ্তাহিক একতা। একতা মহান ভাষাসংগ্রামের ইতিহাস জেনেছে তার একঝাক ভাষা সৈনিকদের কাছ থেকে, যাঁদের বীরত্বে একুশে ফেব্রুয়ারি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। একতা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে অসংখ্য ছাত্র তরুণ ও সাহসী গেরিলা বীর যোদ্ধাদের কাছ থেকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে জন্মের কারণে মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখে, পরবর্তীতে সঠিক ইতিহাস প্রকাশ ও প্রচার করা একতার পক্ষে সহজ হয়েছে। যদিও জন্মলগ্ন থেকেই পথচলা সহজ ছিল না।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহ, চা শ্রমিকদের মুল্লুক চলো আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রচার ও প্রকাশ করে চলেছে একতা। ‘৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পরবর্তীসময়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক লড়াই, ৮০-এর দশকের বিশাল ক্ষেতমজুর আন্দোলন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালের অভ্যুত্থানবিরোধী নানাবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে দৃঢ়তার সাথে নির্মোহভাবে সংবাদ পরিবেশন ও লেখা প্রকাশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির অশুভ তৎপরতা হুঙ্কারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির ইতিহাস-ঐতিহ্যে আঘাত এবং ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও মাজার ভাঙার বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছে। এদেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের এমন কোনো ন্যায়সঙ্গত লড়াই সংগ্রাম নেই যা একতা প্রকাশ করেনি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, কৃষি-বন-বন্দর ও প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ রক্ষা নিয়ে সংবাদ ও লেখা একতা প্রকাশ করেছে। লুটপাট ও দুর্নীতি-দুঃশাসন, সামাজিক-রাজনৈতিক অসঙ্গতি অনিয়ম প্রকাশে সামনের কাতারে ছিল একতা।
এদেশের কৃষক শ্রমিক, ক্ষেতমজুর দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, চা শ্রমিক, মটর-নৌযান শ্রমিক, গৃহনির্মাণ শ্রমিক, রিকশাভ্যান, ইজিবাইক, রেল-বিদ্যুৎ-বন্দর সব শ্রমজীবী মানুষের ভালো-মন্দ লড়াই সংগ্রামের খবর ছাপা হয়েছে একতায়। দেশের তেল-গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনে একতার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পাহাড় সমতলের আদিবাসী, দলিত, রবিদাস, জলদাস, চর্মকার, জেলে, তাঁতী, বেদে সম্প্রদায় যারা সমাজের সবচেয়ে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষ তাদের সুখ-দুঃখের কথা সামনে তুলে আনার কাজ করেছে।
এসকল কাজ করতে যেয়ে একতাকে বহুবার বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কখনো কখনো প্রকাশনা বন্ধ, বাতিলের মত ঘটনা ঘটেছে। একতা সত্যের পথে সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাহসের সাথে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। তার সামনের পথচলাও সহজ নয়।
একতা তার দীর্ঘ যাত্রায় সবকিছু করতে পেরেছে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই ফেলে এসেছে, যা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গাও আছে। ৫৬ বছরে একতা যেমন সম্মান সুখ্যাতি অর্জন করেছে, তেমনই তৈরি করেছে অনেক নির্ভীক প্রথিতযশা সাংবাদিক, খ্যাতিমান লেখক, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী ও সর্বস্ব ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মী।
একতার যা কিছু ভালো তা নিয়ে আরও অনেক কথা বলা সম্ভব। সেদিকে না যেয়ে একতাকে বাঁচিয়ে রাখতে, ভবিষ্যতে সুনাম সুখ্যাতি বৃদ্ধির জন্য কী কী কাজ জরুরি তা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি।
একতা আরও যা কিছু করতে না পারার জন্য আত্মসমালোচনা করে, সে পথেও ছিল অসীম সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা দূর করাও সহজ ছিল না। যার মধ্যে প্রধান সংকট ছিল নিজস্ব তহবিল। অর্থাভাবে সার্বক্ষণিক সংবাদকর্মী, পেশাদার লেখক সবসময় যুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি। যারা যুক্ত ছিলেন তাদেরও যথাযথ সম্মানী, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়নি।
তহবিলে অর্থ না থাকায় প্রতিমাসে বিশাল অংকের টাকা ধার করে চলতে হয়েছে। সারা বছর তেমন কোনো বিজ্ঞাপন পায়নি। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ধরে কিছু বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থ অপ্রতুল। অনেক কষ্টে পত্রিকাটি প্রকাশিত হলেও এজেন্সি ও গ্রাহক পর্যায় থেকে যথাযথ বিল যথাসময়ে পরিশোধ হয় না। ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে একতার ঋণের বোঝা বাড়ছে। একতার অন্যতম সংকট হলো তার প্রচার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে না পারা। সংশ্লিষ্টরা অনেক আগেই বলেছিলেন একতা প্রকাশের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে পারলে এবং তার বিল যথাসময়ে পাওয়া গেলে একতার জন্য কোন ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন হবে না। এতবছরে আমরা তা করতে পারিনি। তবে আমি এখনো মনে করি, একতার গ্রহক, পাঠক ও শুভাকাক্সক্ষী সকলে চেষ্টা করলে একতার প্রচার সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব।
এসবের মাঝে আশু কাজ হচ্ছে সকল গ্রাহক ও এজেন্সি থেকে বকেয়া বিল পরিশোধ, বন্ধ এজেন্সি চালু, গ্রাহক ও পাঠকের সংখ্যা বাড়ানো। দ্রুততার সাথে জেলা উপজেলা থেকে সংবাদ, ফিচার, ছবি, জরুরি খবর সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। একতার নিয়মিত লেখক সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রতিটি সংখ্যায় সমসাময়িক বিষয়ে লেখা ও সংবাদ পরিবেশনায় আরও মনোযোগী হতে হবে। পাঠকদের কেউ কেউ বলেন একতার অধিকাংশ খবর পুনোনো। কিন্তু যেহেতু এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ফলে দৈনিক সংবাদপত্র কিংবা সোশাল মিডিয়ার কারণে পাঠকের কাছে সেটি মনে হতেই পারে। এ বিষয়েও আগামী দিনে আরও সচেতন ও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।
একতার ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই আহ্বান জানাই, সারাদেশে থেকে একতার যত এজেন্সি আছে, যত পাঠক-শুভানুধ্যায়ী আছেন সকলে মিলে একতার জন্য নগদ অর্থ, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করি। একতার একজন বহু পুরানো পাঠক-হকার-সংবাদ দাতা হিসেবে এটুকুই বলতে পারি, শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রাখতে এবং তা জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য একতার বিকল্প হলো একতা। একতা মেহনতি মানুষের সমাজ দর্পণ। কথিত আছে, একতার সব গ্রাহকও ঠিকমত একতা পড়েন না। একতা পড়ে নিজে সমৃদ্ধ হই, অন্যকে পড়িয়ে একতার পাঠক বৃদ্ধি করি। একতা পড়ো; শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো। ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগ্রামী শুভেচ্ছা।
লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি
বিশেষ রচনা
একতার জন্য প্রত্যয়
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
যুদ্ধ ও করণীয়
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
একতার লড়াই চলছে, চলবে
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট
কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন