নয়া উদারবাদ

বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট

ডা. মনোজ দাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
নয়া উদারবাদ বিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান নীতিগত ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হলেও ১৯৮০-এর দশকে ঋণনির্ভরতা, বৈদেশিক সহায়তা এবং কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নয়া উদারবাদী নীতিতে অগ্রসর হয় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সব সরকারই বিভিন্ন মাত্রায় একই নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো অনুসরণ করেছে। এর ফলে প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বৃদ্ধি পেলেও আয়-বৈষম্য, শ্রমের অনিশ্চয়তা, কৃষির সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং করপোরেট পুঁজির প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নয়া উদারবাদী নীতির অনুগত দাস। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারও কর্মসংস্থানের গালভরা শ্লোগানের আড়ালে এই নয়া উদারবাদী নীতি বাস্তবায়ন করছে। নয়া উদারবাদ কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো–বাজারের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা সীমিতকরণ, বেসরকারিকরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উদারীকরণ, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, শ্রমবাজারকে নমনীয় করা (শ্রমিক নিয়োগ, ছাঁটাই, মজুরি ও কাজের শর্তাবলি নির্ধারণে নিয়োগকর্তার অবাধ স্বাধীনতা), সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় সীমিত করা এবং বৈশ্বিক পুঁজির জন্য অর্থনীতিকে উন্মুক্ত রাখা। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভের ভাষায়, নয়া উদারবাদ হলো এমন একটি প্রকল্প যার মাধ্যমে পুঁজির ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্র সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে। হার্ভে দেখিয়েছেন যে, নয়া উদারবাদ মূলত জনসম্পদ, ভূমি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত পুঁজির হাতে স্থানান্তরের একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে এই নয়া উদারবাদ হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল–বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের শর্তযুক্ত ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে লোকসান দেখানো, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তির চাপ। ১৯৮০-এর দশকে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির অধীনে সরকার শিল্প, ব্যাংক, বাণিজ্য এবং কৃষিতে ধারাবাহিক সংস্কার শুরু করে। ১৯৯০-এর দশকের পর এসব সংস্কার আরও প্রসারিত ও গভীর হয়। প্রথমত, রাষ্ট্রায়ত্ত বহু শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ব্যক্তিখাতে হস্তান্তর করা হয়। যুক্তি ছিল দক্ষতা বৃদ্ধি ও লোকসান কমানো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমে যায় এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য উদারীকরণ করা হয়। শুল্ক হ্রাস, আমদানি সহজীকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে উদারীকরণ আনা হয় এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। চতুর্থত, ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তার ধরনে পরিবর্তন আসে। কৃষি ক্রমশ বাজারনির্ভর হয়ে ওঠে এবং উৎপাদন উপকরণে বেসরকারি খাতের প্রভাব বাড়ে। পঞ্চমত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্রুত বিস্তার ঘটে। এতে সেবার পরিমাণ বাড়লেও ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পায়। নয়া উদারবাদী সংস্কারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, নারীর কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে আয়-বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, করপোরেট পুঁজির প্রভাব বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অনিয়ম, বৈদেশিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বিস্তার, শ্রমিক অধিকার সংকোচন, কৃষকের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। প্রবৃদ্ধির সামাজিক বণ্টন সমান নয়। বাংলাদেশে নয়া উদারবাদের শ্রেণিগত প্রভাবও অনেক গভীর। মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে নয়া উদারবাদ কোনো নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি শ্রেণি-সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের নীতি, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়া বিভিন্ন শ্রেণির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলেছে। প্রথমত, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট, বিদ্যুৎ, ওষধ, টেলিযোগাযোগ এবং আমদানি-রপ্তানি খাতের বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো নয়া উদারবাদী নীতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। কর-ছাড়, সহজ ঋণ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানি প্রণোদনা তাদের পুঁজির দ্রুত সঞ্চয়কে ত্বরান্বিত করেছে। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাক শিল্পে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও শ্রমের অনিশ্চয়তা, কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সমস্যা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কম উৎপাদন ব্যয় ধরে রাখার চাপ শ্রমিকদের ওপর পড়ছে। তৃতীয়ত, কৃষি ক্রমেই বাজারনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচব্যবস্থার খরচ বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র কৃষক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের দামের অস্থিরতা তাদের আয়কে অনিশ্চিত করে তুলেছে। চতুর্থত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বহু সেবার বেসরকারিকরণ মধ্যবিত্তের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পঞ্চমত, বাংলাদেশে আইএমএফ সাধারণত ঋণের বিনিময়ে আর্থিক শৃঙ্খলা, ভর্তুকি হ্রাস, কর সংস্কার, বিনিময় হার সমন্বয় এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো শর্ত আরোপ করে। বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সংস্কারে অর্থায়ন করলেও একই সঙ্গে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং নীতিগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পেলেও দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো–(১) অর্থনীতিতে করপোরেট পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। (২) নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়িক স্বার্থের গুরুত্ব বৃদ্ধি। (৩) রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক ভূমিকার পরিবর্তে ‘বাজার-সহায়ক রাষ্ট্র’ হিসেবে তার ভূমিকা বৃদ্ধি। (৪) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (চচচ)-এর সম্প্রসারণ। (৫) আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশকে নীতিনির্ধারণে অধিক গুরুত্ব প্রদান। এই নয়া উদারবাদী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ, ইজারা, যৌথ উদ্যোগ, কৌশলগত অংশীদারত্ব ইত্যাদি গালভরা নামে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারা বিদ্যুৎ বিতরণ ও জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা শুরু করেছে। লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেয়ার প্রক্রিয়াও থেমে নেই। তাই বাংলাদেশের নয়া উদারবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারের সমষ্টি নয়; এটি রাষ্ট্র, পুঁজি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন রূপ। মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায়, এটি রাষ্ট্র ও পুঁজির সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, যেখানে রাষ্ট্র শ্রেণিগতভাবে নিরপেক্ষ নয়; বরং পুঁজি সঞ্চয়ের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। নয়া উদারবাদের নামে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি এনে দিতে পারেনি। এজন্য বিকল্প উন্নয়ন মডেলের কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বিতর্ক মূলত একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়: কীভাবে প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং টেকসই উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর নয়া উদারবাদে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর সমাধান পেতে হলে এমনসব নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি থাকবে, শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হবে, ভূমি সংস্কার করা ও ক্ষুদ্র কৃষকের সুরক্ষা দেয়া হবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সর্বজনীন সেবাখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, প্রগতিশীল করব্যবস্থা এবং সম্পদের পুনর্বণ্টন করা হবে, শোষণ-বৈষম্যবিরোধী ও দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। নয়া উদারবাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বহাল রেখে এই নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। শুধু কম-বেশি সংস্কার দ্বারা এই অবস্থার পরিবর্তনও ঘটানো যাবে না। কেবলমাত্র একটি পরিপূর্ণ সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে সাধিত সামগ্রিক বিপ্লবী রূপান্তরের পথেই এই নীতির বাস্তবায়ন করা সম্ভব। লেখক : মার্কসবাদী তাত্ত্বিক
বিশেষ রচনা
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
যুদ্ধ ও করণীয়
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই
একতার লড়াই চলছে, চলবে
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
একতার জন্য প্রত্যয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..