
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা :
কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ে ঔপনিবেশিক চক্রান্তের খেলা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্যচুক্তির মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হবে। ষাটের দশকের মতো, সত্তরের দশকের মতো বাঙালি জাতিস্বত্ত্বার পুনর্জাগরণ এবং শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনাবিরোধী সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
গত ৯ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বর্ষীয়ান বাম রাজনীতিক, উদীচী চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সংস্কৃতিজন ডা. চন্দন দাশের শোকসভায় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন এ কথা বলেন।
আবুল মোমেন বলেন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সমাজে রাজনীতিবিমুখ আপসকামি মনোভাব তৈরি করা হয়েছে। নানাভাবে নানাকিছু দিয়ে সমাজের ভেতরকার নানা দ্বন্দ্বগুলোকে স্তিমিত করে ফেলা হয়েছে। সমাজটা অস্থির হয়ে গেছে। একটা বিভ্রান্তিকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কে যে আসল আর কে যে নকল সেটা বোঝা দায় হয়ে গেছে। সহজেই কাউকে মহান বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। কাউকে খাটো করে ফেলা হচ্ছে। আদর্শ, মান, চিন্তাচেতনার গভীরতা এসব কোনো বিষয় হিসেবেই গণ্য হচ্ছে না। চন্দন দাশের মধ্যে এসবের বিরুদ্ধে একধরনের আপসহীনতা ছিল। বলা যায় যে, রক্ষণশীল বামপন্থী ছিলেন তিনি। নিজের জায়গা থেকে নড়তেন না। কৌশলের ধার ধারতেন না।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুঁজিবাদ রুদ্ররূপ ধারণ করেছে। যেখানে-সেখানে যুদ্ধ বাঁধানো হচ্ছে। নানা কায়দায়, নানা কৌশলে একধরনের আগ্রাসী আক্রমণ আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে। নতুন উপনিবেশিক ব্যবস্থাপনা দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার উপনিবেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটা বাণিজ্যচুক্তি করে গেছে, আমরা গম কার কাছ থেকে কিনব, চাল কার কাছ থেকে কিনব এটাও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে নিতে হবে।
সিপিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, শেখ হাসিনার অপশাসনকে অজুহাত বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মানে কিন্তু শেখ হাসিনা না। বঙ্গবন্ধু মানে শেখ হাসিনা না। ৩২ নম্বর মানেও শেখ হাসিনা না। শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভর করে এস আলম আর সালমান রহমানের পেটে ঢুকে গিয়েছিল৷ এর ফলে মৌলবাদী, উগ্র ধর্মান্ধরা, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা সমাজ এবং রাষ্ট্রে শক্তিশালী হয়েছে। তারা এখন রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের করতে হবে। চন্দন দাশের শূন্যতা এ মুহুর্তে খুব বেশি অনুভব করছি।
শোকসভায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, নানাভাবে নানা কৌশলে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে বিভক্ত করে দুর্বল করা হচ্ছে। একবুক কষ্ট নিয়ে আমাদের চন্দন দাশ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তাঁর আদর্শ আমাদের চির জাগরূক রাখতে হবে। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। আমরা এগিয়ে যাবই। চন্দনদার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি প্রবাল দে-র সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক শীলা দাশগুপ্তা ও সদস্য শিমুল সেনের সঞ্চালনায় শোকসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ইন্দুনন্দন দত্ত, শ্রমিক নেতা তপন দত্ত, সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক এফ ইমাম আলী, প্রাবন্ধিক সুভাষ দে, কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার, বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও কামরুল হাসান বাদল, চট্টগ্রাম জেলা সিপিবির সভাপতি অধ্যাপক অশোক সাহা, কেন্দ্রীয় উদীচীর সহ-সভাপতি বিমল মজুমদার, বোধন আবৃত্তি পরিষদের সাবেক সভাপতি আব্দুল হালিম দোভাষ এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আয়াজ মাবুদ।
উদীচীর শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শোকসভা শুরু হয়। প্রয়াত চন্দন দাশের জীবনী পাঠ করেন উদীচী চট্টগ্রামের সহ-সম্পাদক জয় সেন। আবৃত্তি করেন অঞ্চল চৌধুরী ও ফারুক তাহের। গানে ছিলেন মার্গারেট বেবী সাহা ও আইরিন সাহা। নৃত্য পরিবেশন করেন প্রমা অবন্তী।