
ঋতুবৈচিত্র্যময় বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, ফসল, রাস্তা ও জীবিকা হারানোর পাশাপাশি বন্যা নিয়ে আসে আরও ভয়াবহ এক সংকট–রোগবালাই ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার সময় এবং পানি নেমে যাওয়ার পর সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মশার বিস্তার ও চিকিৎসাসেবার ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
চিকিৎসকদের মতে, বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ। কারণ তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় ৪০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়াজনিত রোগে। কারণ বন্যার পানিতে মলমূত্র, আবর্জনা, রাসায়নিক বর্জ্য ও জীবাণু মিশে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস ও পেটের বিভিন্ন সংক্রমণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়রিয়া বন্যাকালীন সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ ডায়রিয়ায় শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বের হয়ে যায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এ সময় বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিশুদ্ধ পানি না পাওয়া গেলে পানি ফুটিয়ে খেতে হবে। পানি ফুটিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিলে জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া ফিটকিরি, ব্লিচিং পাউডার বা পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি ব্যবহার করেও পানি নিরাপদ করা যায়।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে দ্রুত স্যালাইন খাওয়ানো জরুরি। পাশাপাশি ভাতের মাড়, ডাবের পানি, চিড়ার পানি বা গুড়ের শরবতও উপকারী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে শরীরে তরল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।
বন্যার সময় মানুষের গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগও দ্রুত বাড়ে। নিউমোনিয়া, ফ্লু, হাঁপানি, কনজাংটিভাইটিস, মেনিনজাইটিস ও শ্বাসনালির প্রদাহ ব্যাপকভাবে দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে এসব রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ও জমে থাকা পানির কারণে মশার বংশবিস্তারও দ্রুত বাড়ে। ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পর মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এ সময় চর্মরোগও বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় দূষিত পানিতে থাকার কারণে ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ, ফুসকুড়ি, চুলকানি, ফোড়া ও বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, যতটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং শুকনো কাপড় ব্যবহার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন সাপের উপদ্রব নিয়ে। বন্যার সময় সাপ নিজেদের আবাস হারিয়ে শুকনো স্থানের খোঁজে মানুষের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে। ফলে সাপের কামড়ের ঘটনাও বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বন্যাকালীন মৃত্যুর মধ্যে দ্বিতীয় বড় কারণ হলো- সাপের কামড়।
চিকিৎসকদের মতে, বিষধর সাপে কামড়ালে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। তবে অনেক মানুষ এখনও ওঝা বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। সাপে কাটার পর আক্রান্ত অঙ্গ নাড়াচাড়া কমানো, পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
বন্যা শুধু সংক্রামক রোগই বাড়ায় না; অসংক্রামক রোগেও বড় প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যাহত হয়। ফলে অনেকের শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সঙ্গে মানসিক সমস্যাও বাড়ে। দুঃস্বপ্ন, আতঙ্ক, অনিদ্রা ও মানসিক চাপ অনেকের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা। নিরাপদ পানি, পর্যাপ্ত স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক, টিকা, পুষ্টিকর খাদ্য ও দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বন্যার তীব্রতা ও ঘনত্ব আরও বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যায়, কিন্তু এর রেখে যাওয়া রোগ, অপুষ্টি ও মানসিক ক্ষত দীর্ঘদিন মানুষের জীবনে থেকে যায়।