গণ-অভ্যুত্থানের গণ-প্রত্যাশা পূরণের জন্য নতুন পর্বের সংগ্রাম শুরু হোক

রাজনৈতিক ভাষ্যকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত দেড় বছরের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে ঘটে গেল চমকে দেওয়ার মতো ওলট-পালট করে দেওয়ার অনেক ঘটনা। ‘২৪ এর আগস্টে অবিস্মরণীয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে’ শেখ হাসিনার একটানা ষোলো বছরের কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হয়। আওয়ামী লীগ সরকার মুহূর্তে হাওয়া হয়ে যায়, শেখ হাসিনা পালিয়ে দলবলসহ বিদেশে আশ্রয় নেন। এভাবে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতায়, উচ্চ আদালতের মতামত নিয়ে, মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মুখে, সংবিধানসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে ড. ইউনুসের নেতৃত্বে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে’ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এই ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ প্রধান দায়িত্ব ছিল- সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে, অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনি ব্যবস্থার অপরিহার্য্য কিছু সংস্কার করে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু এই অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে চরম ডানপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িকসহ ভিন্ন-ভিন্ন স্বার্থ ও ভাবধারার অনুসারীরা থাকায় শুরু থেকেই নানা টানাপড়েন চলতে থাকে। একটি অংশ নিজেদেরকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ দাবি করে রাষ্ট্রের চরিত্রকে নিজেদের মনগড়া ছকে বদলে দেয়ার মিশন নিয়ে তৎপর হয়। জামাতসহ স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্র তাদের লালিত স্বপ্ন তথা- মুক্তিযুদ্ধের ধারা মুছে দিয়ে পাকিস্তানি ধারা প্রতিষ্ঠার বহুদিনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের এসব চরম প্রতিক্রিয়াশীল লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঁধে ভর করে তা করা সম্ভব বিধায় তারা যে কোনোভাবে নির্বাচন না হতে দেওয়া অথবা তাকে বিলম্বিত করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে এদের প্রভাব কম ছিল না। এসব কারণে দেশের রাজনীতিতে বিপদজনক অনিশ্চয়তা ও চরম অস্থিরতা-নৈরাজ্যের পরিস্থিতির জন্ম নেয়। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন শক্তি এদেশে তার হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বাড়ানোর জন্য নানা কলকাঠি নাড়তে থাকে এবং সংগোপনে অনেকটা ‘দেশ বিক্রি ধরণের’ চুক্তি করিয়ে নিতে স্বক্ষম হয়। নির্বাচিত সরকারের বদলে অনির্বাচিত সরকার থাকলেই তাদের এসব কাজ করতে সুবিধা হয় বিধায় তারা যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করতে দেওয়ার প্রয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ভিত্তি করে যে দ্বি-দল কেন্দ্রীক রাজনৈতিক কাঠামো চালু রাখা হয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার একটি মেরু, তথা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, বিএনপিকে সেই শূন্যস্থান পূরণের অভিনব সুযোগ এনে দেয়। অতি সহজেই এখন ক্ষমতা আপনা-আপনি তার হাতে চলে আসবে মনে করে সে নির্বাচন-বিরোধী নতুন শক্তি সমাবেশের ষড়যন্ত্রকে হালকাভাবে নেয়। জনগণের সচেতন শক্তির ওপর নির্ভর করে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার কঠিন কাজের বদলে ষড়যন্ত্রের কমপিটিশনে জিতে আসতে পারবে বলে সে অনেকটা গাছাড়া পদক্ষেপের উপর নির্ভর করে চলতে থাকে। ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী তাদের সেই দুর্বলতার সুযোগও নেয়। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ, ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং এমনকি দেশের অস্তিত্ব চূড়ান্ত হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। চরম বিপদের মুখোমুখি অবস্থায় এসে, শেষ-পর্যন্ত, এই বিপদ সামাল দেওয়া গেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান ঠেকিয়ে রাখা যাবে না বুঝতে পেরে তারা নির্বাচনে ডাকসু-মডেলসহ যে কোনো পন্থায় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার টার্গেট নিয়ে মরিয়া অভিযান শুরু করে। নির্বাচনে যেন-তেন উপায়ে ‘বিজয়ী’ হওয়ার জন্য অসৎ নোংরা মিথ্যাচার প্রতারণা ছল-চাতুরী ইত্যাদি পথ ও পন্থার আশ্রয় নিতে তারা পিছপা হয়নি। এটি দেশের গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল অগ্রগতির জন্য একটি মহা বিপজ্জনক পরিস্থিতি হয়ে ওঠে। এই বিপদের হাত থেকেও দেশকে রক্ষা করা গেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে জামায়াতের সরকার গঠনের প্রজেক্টও রুখে দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলোকে সফলতা বলে আখ্যায়িত করা যায়। কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে যে, পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হাল ছাড়বে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক-সাংগঠনিকসহ সব উপায়ে এই অগণতান্ত্রিক নব্য-ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাভূত করতে না পারলে যেটুকু বিজয় হয়েছে তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। এই কর্তব্যের প্রতি প্রাথমিক নজর নিবদ্ধ রেখেই আমাদেরকে নতুন পর্বের কাজের পরিকল্পনা রচনা করতে হবে। যা কিনা নতুন পর্বের পরিস্থিতির উপাদান সে সম্পর্কে উপলব্ধি স্পষ্ট রাখতে হবে। অনির্বাচিত সরকার অপসারিত হওয়ার পর এখন গণ অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রধান বিষয় হলো- প্রথমত গণতান্ত্রিক পথে অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটানো। এগুলো এমন ইস্যু যা দেশের মৌলিক ব্যবস্থাগত বিষয়ের সাথে জড়িত। এসব ইস্যু একদিকে ব্যাপক জনগণের প্রত্যক্ষ স্বার্থ এবং আগ্রহের বিষয়, অন্যদিকে সেগুলোর সাথে কমিউনিস্ট-বামপন্থিরা অগ্রবর্তী হিসাবে জড়িত থাকলে তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অভিনব সুযোগ এনে দিবে। নতুন পর্বের এই নতুন কর্তব্য ও সুযোগ সাহস ও আনন্দের সাথে কাঁধে তুলে নেয়া এখন আমাদের ঐতিহাসিক কাজ। জয় আসবেই!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..