মহামতি লেনিন ও নেপের পথে সমাজতন্ত্র-যাত্রা হিসাব-নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারের গুরুত্ব

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

(পূর্ব প্রকাশের পর) চীনের দ্বৈত ধারা ও পরিণতি: ১৯৭৯ সালে চীনে শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সংস্কার সূচিত হয়। তখন বাজার অর্থনীতিতে ফেরা লক্ষ্য ছিলো না। উদ্দেশ্য ছিলো পরিকল্পনা বজায় রেখে অধিক দক্ষ ব্যবস্থাপনায় উপনীত হওয়া। চীনে প্রথম উপর থেকে পণ্যের দামের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই সংস্কার বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ বাজারে বেচার অনুমতি দেয়া হয়। এভাবেই শুরু হয় চীনের দ্বৈত ধারার শিল্প সংস্কার প্রক্রিয়া। ফলে প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুটি জগতে মিশে। একটি পরিকল্পনা ও অন্যটি মুক্ত বাজারের জগৎ। পরিকল্পনার অধীনে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত দামে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে উৎপাদনের নানা উপাদান পেতে থাকে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতে থাকে। পাশাপাশি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান মুক্তবাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন বেচতে থাকে এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বাজার থেকে কিনতে থাকে। এভাবে চীনে রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য মুক্তবাজার খুলে যায় এবং বিকাশ লাভ করে। এর ফলে আরেকটি ঘটনা ঘটে, পরিকল্পনার অধীন দাম সংস্কার বাধার সম্মুখীন হয়। আসলে পণ্যের দাম একে অপরের সাথে সম্পর্কিত, যে কারণে একটি পণ্যের দাম বাড়লে এর উৎপাদকরা লাভবান হয় অন্যদিকে ব্যবহারকারীরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। তারা এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন পণ্যের দামের পারস্পরিক সম্পর্ক বাজারের জন্যও প্রযোজ্য। তবে বাজারে তা ইচ্ছে-নিরপেক্ষ অর্থাৎ কারো ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। ফলে দাম বাড়লে ক্ষতিগ্রস্তরা অসন্তুষ্ট হতে পারলেও তা প্রতিরোধ করার সহজ উপায় থাকে না। অন্যদিকে পরিকল্পনাধিন দাম নির্ধারণ কমিটির সদস্যদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। যে জন্য দাম পরিবর্তন হলে ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবর্তন রোধ করতে পদক্ষেপ নিতে পারেন। ফলে চীনে পরিকল্পনাধীন দাম সংস্কারে অচলাবস্থা দেখা দেয়। আস্তে আস্তে চীনে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের পরিকল্পিত অংশ সংকুচিত করে বাজার অংশ বৃদ্ধি করা হয়। এভাবে শেষ পর্যন্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকাণ্ডকে বাজারের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়। অর্থনীতিতে বাজারসৃষ্ট দাম সর্বজনীনতা অর্জন করে। অর্থনীতিতে মার্কসীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব: স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত অর্থনীতিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি শিল্পভিত্তিক মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য পৃথক অর্থনীতি পরিষদ গঠন করেন। এটা সংকটকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং আবার মন্ত্রণালয় ভিত্তিক পরিকল্পনায় ফিরে যাওয়া হয়। তিনি বাজারকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হন। ফলে সংকটের মূলে পৌছতে ব্যর্থ হন। তারপর ১৯৬৫ সনে কোসিগিন আরেকটি সংস্কার-উদ্যোগ নেন। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রণোদনা বৃদ্ধিকল্পে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি কিছুটা স্বাধীনতা দেন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়। এখানেও বাজারের স্বীকৃতি মেলে না। ফলে এই সংস্কারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তারপর গর্ভাচেবের আমলেও অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৮৭ সালে ‘অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ গৃহীত হয়। এতে পরিকল্পনা ছেড়ে বাজার ভিত্তিতে উৎপাদন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অন্যদিকে দামের ব্যাপারে উপরের নিয়ন্ত্রণ বহুলাংশে বজায় রাখা হয়। চীনের মতো প্রথমাবস্থায় পরিকল্পনা বজায় রেখে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় না। এই গোঁজামিল সোভিয়েত অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। এটি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকেই ত্বরান্বিত করে। আমাদের আলোচনা থেকে একটি জিনিস বেরিয়ে এসেছে যে, সমাজতন্ত্রের জন্য পণ্য, মুদ্রা, ও বাজারের ভূমিকা নিয়ে সঠিক উপলব্ধি প্রয়োজন, এছাড়া সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সংগঠন ও পরিচালনা সম্ভব না। কোটি কোটি উৎপাদক ও ভোক্তা, অজগ্র অনবরত পরিবর্তনশীল পণ্য ও সেবা নিয়ে গঠিত অর্থনীতিকে ‘একটি কারখানা ও অফিস’ ভাবার সুযোগ নেই। এই ভাবনা ইউটোপিয়া হতে বাধ্য এবং হয়েছেও তাই। আসলে সমাজতন্ত্রে উৎপাদন অনেকাংশে পণ্য উৎপাদনই থেকে যাবে। কোনো পণ্য কতোটা ‘সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের’ দাবিদার অর্থাৎ মূল্য কতো হবে সেটা উপর থেকে বিষয়ীগতভাবে নির্ধারণ না করে নীচ থেকে বাজারে সমাজের সদস্যদের দ্বারা বিষয়গতভাবে অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত হতে হবে। মূল্য নির্ধারণের এটাই মার্কসীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। তবে বাজারেও আপাত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দেখা গেছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ওপর থেকে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আরো বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে। তাই অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মতো গণতন্ত্রকে আরো এগিয়ে নেয়া সমাজতন্ত্রের উদ্দেশ্য হবে। গণতন্ত্রকে সংকোচিত করে অর্থনীতিতে আমলাতন্ত্রের প্রসার সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য না। সমাজতন্ত্রে বাজারের ভূমিকা স্বীকার মানে পরিকল্পনা অস্বীকার করা নয়: সমাজতন্ত্রে পণ্য উৎপাদন ও বাজারের গুরুত্বের কথা আমরা আলোচনা করেছি। এর অর্থ এই নয় যে পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। বাজারের ভূমিকা স্বীকারের ফলে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ও সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার নিয়ে মার্কস-এঙ্গেলসের নির্দেশনা বাতিল হয়ে যায় না। ১৯৯৩ সালে চীন ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এতে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন-লক্ষ্য পরিত্যক্ত হয়নি। সেরকম ভিয়েতনামেও। তবে পরিকল্পনার মাত্রা নিয়ে বিবেচনা করতে হবে। অভিজ্ঞতা জানান দিয়েছে যে, পরিকল্পনা-সংক্রান্ত মার্কস-এঙ্গেলসের নির্দেশনাকে ‘নিরঙ্কুশ পরিকল্পনা’ মনে করা একটি বিরাট ভ্রান্তি ছিলো। সে কারণেই মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র পতিত হয়েছে। পরিকল্পনাকে অর্থনীতির মূল গতিধারা নির্ধারণে লাগাতে হবে। আর ব্যাপক পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের জন্য বাজারের উপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি পদ্ধতি হিসেবে বাজারকে গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে বাজার ও পরিকল্পনার ব্যবহারকে যান্ত্রিকভাবে নয় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সে জন্য বিষয়টি সবসময় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাজারের উপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ: পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থির না। বাজারও স্থির না, পুঁজিবাদী বাজারও বিবর্তিত হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে একচেটিয়া প্রতিযোগিতামূলক বাজার হয়েছে। স্বল্পসংখ্যক উৎপাদক সংবলিত একচেটিয়া বাজার হয়েছে। এখন আমরা যদি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কথায় আসি দেখবো পুঁজিবাদী অর্থনীতিতেও বাজারের ওপর নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন স্বীকৃত হয়েছে। একচেটিয়া উৎপাদকদের উৎপাদিত পণ্য এবং সেবার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ অহরহ দেখা যায়। অর্থনৈতিক দক্ষতার প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। সমাজতন্ত্রেও বাজারের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে বাজারকে ব্যবহার করে যাতে পুঁজিবাদ প্রভুত্ব বিস্তার করতে না পারে। যদি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক স্থানসমূহ রাষ্ট্রের হাতে থাকে তাহলে পুঁজিবাদ প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারবে না। রাষ্ট্রের চরিত্র সমাজতান্ত্রিক বলে অর্থনীতির মৌলিক সমাজতান্ত্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন থাকবে কারণ রাষ্ট্র শ্রমজীবীদের স্বার্থের প্রতিনিধি। লেখক : কলামিস্ট
বিশেষ রচনা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
একতার লড়াই চলছে, চলবে
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
একতার জন্য প্রত্যয়
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট
কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
যুদ্ধ ও করণীয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..