অদম্য ‘মিট দ্য কমরেডস’ : লক্ষ্যে অবিচল
রাগিব আহসান মুন্না
‘মিট দ্য কমরেডস’-এর লক্ষ্য ছিলো কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করা। শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে প্রগতি অভিমুখে বিকল্প শক্তির বৃহত্তর বলয় গড়ে তুলে বামপন্থিদের ক্ষমতা দখলের কাজকে এগিয়ে নেওয়া।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক জুন-জুলাই ২০২৬ এই দুই মাস পার্টির কেন্দ্র থেকে তার সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে সর্বস্তরের সদস্যদের সাথে হাত মেলাবে এবং ত্রয়োদশ কংগ্রেস গৃহীত দলিলের সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিনিময় করা হবে। এ পর্যন্ত প্রায় দুইশত উপজেলায় সংগঠনের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্যদের সাথে মতবিনিময় সম্ভব হয়েছে। দলকে শুধু ওপর থেকে না দেখে তৃণমূলে গিয়ে গভীর থেকে দেখা দলীয় কমরেডদের চিন্তা-চেতনার সীমাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধানে সৃজনশীল পথে অগ্রসর হওয়া। প্রাণবন্ত এই উদ্যোগ আমাদের পার্টির অগ্রগতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে এবং পার্টির গতিশীলতাকে বিকাশের ধারায় এগিয়ে নিয়েছে ও নতুন নতুন ভাবনা দ্বারা সমৃদ্ধ করেছে কমরেডদের দৃষ্টিভঙ্গি।
আমি ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর কর্মসূচির কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অনেকগুলি জেলা এবং উপজেলার কমরেডদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ‘মিট দ্য কমরেডস’-এ মিলিত হওয়ার সুযোগে আমার অভিজ্ঞতার মাত্রা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার কথা উঠে এসেছে, মতামতের চর্চা হয়েছে। কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমত দেখা দিলে যুক্তি দিয়ে তা সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে একমতে আসতে না পারলে আলোচনা অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
‘মিট দ্য কমরেডস’ কর্মসূচির সাফল্য আছে, তবে প্রত্যাশার পরিমাণটা ছিলো আরেকটু বেশি। এই কর্মসূচি আমাদের সামনে বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছে। শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক হাতিয়ার আমাদের পার্টি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এই পার্টিকে ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত করতে হলে, পার্টির অভ্যন্তরে বিরাজমান সংকটগুলি দূর করতে হবে। পার্টিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। যেসকল স্থূল চিন্তা দ্বারা পার্টির অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, তার সমাধান করতে হবে। পার্টির যেসকল বিতর্ক অভ্যন্তরীণ ফোরামে হওয়ার গঠনতান্ত্রিক বিধান রয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসকল বিতর্ক করে তা জনগণের সামনে আনা হচ্ছে। যা পার্টির সদস্যের বিপ্লবী দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে না। যার ফলে পার্টি হারাচ্ছে তারুণ্যের শক্তি। বিষয়গুলো ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর সভাগুলিতে বিস্তারিতভাবে আলোচনায় এসেছে।
‘মিট দ্য কমরেডস’ কর্মসূচি পার্টির গতিশীলতার মাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি সাংগঠনিক কাজের দার্শনিক চিন্তাও বটে। এই উদ্যোগ শুধু দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না, আদর্শিক চেতনা শাণিত করতে এবং শৃঙ্খলাবোধ জাগিয়ে তুলতে অনেক বেশি অবদান রাখছে। পার্টিকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে প্রত্যয়ী করে তুলতে একটা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। পার্টি সদস্যদের নিজের শক্তির ওপর আস্থা আর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর স্বার্থকতা ও সাফল্য তখনই আসবে, যখন সাধারণ সভায় কমরেডদের আলোচনার ভেতর দিয়ে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান দেওয়া সম্ভব হবে।
জোরালোভাবে দাবি উঠেছে, দলের শক্তিকে যদি সুসংহত করতে হয় তাহলে দলের ভেতর বিপ্লবী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। নেতাকর্মীদের ধারণা, দলের ভেতরে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার কোনো চর্চা একেবারেই কমে গেছে, যা দলীয় নেতাকর্মীর মধ্যে নৈতিক ও সৃজনীশল ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। কমরেডদের গুণে-মাণে সক্ষম করতে হলে, আমাদের পার্টি ইতিহাসের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবী শক্তির উত্থান ঘটিয়ে ব্যবস্থার পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে। মার্কসবাদের শিক্ষা, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন একটি বিপ্লবী পার্টি। আমাদের সমাজে বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করলেও, শক্তিশালী বিপ্লবী পার্টির অভাব থাকার কারণে বিপ্লবী কাজকে এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
আমাদের পার্টির সদস্যদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত। যে কারণে সুবিধাবাদী ঝোকের বিপদ সবসময় রয়ে গেছে। সুবিধাবাদ থেকে নানামুখী বিপজ্জনক ঝোক দ্বারা কমরেডদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা দলের বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যে বিপ্লবী শক্তি বুর্জোয়া ব্যবস্থাটাকে ভাঙার লক্ষ্য থেকে দল গড়ে তুলছে, সে লক্ষ্যই অধরা থেকে যায় এবং লুটেরা বুর্জোয়া ব্যবস্থাটাও অক্ষত থেকে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় কর্তব্যের মধ্যে আছে কত দ্রুত আমরা গণসংগঠনগুলির বিভক্তি দূর করে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি। সেই লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্য দলের অন্যতম একটি জরুরি কাজ। বিপ্লবী শক্তিকে এগিয়ে নিতে তরুণের শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের নির্ধারিত পথে ছাত্র সংগঠনের ঐক্যকে এগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় পার্টি অত্যন্ত তৎপর। ইতোমধ্যে ছাত্র সংগঠনের উভয় অংশের নেতাদের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং ঐক্যের পথে প্রতিবন্ধকতা কি–চিহ্নিত করে তা দূর করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর সাধারণ সভায় আলোচনা হয়েছে, আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সময়মতো ঐক্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা নেয়া হবে, কমরেডরা তা মনে করেন।
তবে গণসংগঠনের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এটা যেমন দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আবার এই ঐক্য প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত দলের কোনো কাজে অংশ নেওয়া যাবে না, এটাও একটি ভ্রান্ত চিন্তা। গণসংগঠনে ঐক্য সম্পাদন করাই একমাত্র কাজ, এটা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। ঐক্য-অনৈক্য এটা কমিউনিস্ট আন্দোলনের চলমান প্রক্রিয়া। পার্টির অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেই সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে, নিষ্ক্রিয়তা একটা রোগ যা পার্টিকে ভেতর থেকে শক্তিহীন করে তোলে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের লড়াইকে দুর্বল করে লুটেরা ধনবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর সভাগুলিতে এ সকল সমস্যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ হয়েছে। কমরেডদের চিন্তার দুর্বলতা দূর করে পার্টির শক্তিশালী অবস্থান গড়তে এবং সকল সুবিধাবাদী ঝোক থেকে পার্টিকে মুক্ত করে ক্ষমতা দখলের লড়াইকে এগিয়ে নেবে, এই হচ্ছে সাধারণ সভার অঙ্গীকার। ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর সভাগুলিতে পার্টিকে বিপ্লবী শক্তিতে সক্ষম করে তুলতে আরও অনেকগুলি সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সকল বিষয়ে আমরা ত্রয়োদশ কংগ্রেসে আলোচনা করেছি ও সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেগুলি মনোযোগ সহকারে আলোচিত হয়েছে। যেমন শক্তিশালী বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন গড়ে তোলা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শ্রমিকশ্রেণির আদর্শের প্রভাব বিস্তার করা, গণসংগঠনগুলোকে জোরদার করতে সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন জোরদার করা, স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তুলে জনগণকে পার্টির পতাকাতলে সমবেত করা, শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরদের ভেতরে পার্টির প্রসার ঘটানো, একতার সার্কুলেশন বাড়ানো। এছাড়াও ‘মিট দ্য কমরেডস’-এর সভাগুলিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা পার্টির বিকাশের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।
‘মিট দ্য কমরেডস’-এর কর্মসূচি শুধু পার্টির গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করছে না, এই কর্মসূচি দলের ভেতরে যেসকল সমস্যা বিরাজমান তা স্পষ্টভাবে পার্টির সামনে এসে হাজির হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে সমাজ বদলের লক্ষ্যে যদি বিকল্প শক্তির ভিত গড়ে তুলতে হয়, যদি এদেশে বামপন্থি শক্তির একটি সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, যদি অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিনাশ ঘটিয়ে শোষণ বঞ্চনাহীনমুক্ত সমাজ গড়তে হয় তাহলে কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রস্তুত হতে হবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শমুখী লেননীয় নীতিমালার পার্টি গড়ে তুলে। শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে পার্টি গড়ে উঠেছে ইতিহাসের নির্মম সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় নিয়ে, সেই পার্টির বিন্দুমাত্র ক্ষতি দেশের হাজার হাজার নেতাকর্মী মেনে নেবে না। সেই লক্ষ্যে প্রবল উৎসাহ আর উদ্যাম নিয়ে ‘মিট দ্য কমরেডস’ তার যাত্রা শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি এ যাত্রাপথে বিপুল আগ্রহ আর দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তার সূচনা করেছিল। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ কমরেডকে মিট করেছে। চলমান প্রক্রিয়ায় বাকি অংশকে দ্রুত এই আয়োজনে যুক্ত করবে।
‘মিট দ্য কমরেডস’-এর কর্মসূচি সফল করতে কমিটির সকল নেতৃবৃন্দ ছুটছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়া। ফলে প্রায় ২শ’র অধিক জেলা-উপজেলার সাধারণ সভাগুলিতে মিলিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় পার্টির এই সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, আগামী বাংলাদেশ বামপন্থীদের। কমিউনিস্ট পার্টি লড়াইয়ে নেমেছে দল গড়তে। একইসাথে তার দায়িত্ব বাম প্রগতিশীল শক্তির ফ্রন্ট গড়ে তোলার। সাথে সাথে লড়বে ক্ষমতায় থেকে যারা দেশকে গোলাম করতে চায়, যারা দেশের মানুষের সম্পদ বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি গ্রহণ করে লুটেরা ধনীকদের কাছে বিক্রি করে দিতে চায়, যারা সংসদ ভবনে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে আমাদের স্বাধীনতা ও আমাদের বীর শহীদদের অপমানিত করেছে এবং তাদের দোসর যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে। চলমান প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে ব্যবস্থা বদলের লড়াইকে চূড়ান্ত রূপ দেবে, এই প্রত্যাশা হোক পার্টির সকল নেতাকর্মীর।
লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন