রাজ্যলোভে হইয়ো না ভ্রষ্ট ন্যায়ধর্ম হতে
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে রাজনীতিতে ‘জয়-পরাজয়ের’ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনটা ‘জয়’ আর কোনটা ‘পরাজয়’ তা নির্ধারণ করাটি মোটেও কোনো সহজ-সরল কাজ নয়। চূড়ান্ত হিসাব শেষে দেখা যায় যে সব জয় যেমন ‘জয়’ নয়, তেমনি সব পরাজয়ও ‘পরাজয়’ নয়। তাছাড়া, যেটাকে মনে হয় ‘জয়’, পরে এক সময়ে বোঝা যায় যে আসলে তা ছিল একটি ‘পরাজয়’। কিম্বা যাকে কিনা একসময় ‘পরাজয়’ বলে মনে হয়েছে, পরে মনে হয় যে সেটা আসলে ছিল ‘জয়’। সেই সাথে একথাও সত্য যে, তাৎক্ষণিক জয়-পরাজয় প্রাপ্তির প্রশ্নটি মোটেও রাজনীতির একমাত্র, কিম্বা তার প্রধান বিষয়ও নয়। অনেক সময়ই অসম্মানজনক ‘জয়ের’ চেয়ে একটি সম্মানজনক ‘পরাজয়’ অনেক উঁচু মর্যাদার ও বেশি সম্মানজনক বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘ধানের শীষের’ ভূমিধস ‘বিজয়’ এসেছে। কিন্তু এর পেছনে পেছনে ‘পরাজয়’ তার কালিমার কালো পথ রচনা করে যাচ্ছে। একথা ঠিক যে, এবারের নির্বাচনে আরও খারাপ, আরও বিপদজনক কোনো ফলাফলের আশঙ্কা থেকে মানুষ মুক্ত হয়েছে। তাতে তারা স্বস্তি পেয়েছে, উল্লসিত হয়েছে। ‘মন্দের ভালোতেই’ তারা খুশি। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত আশাভঙ্গ ঘটছে। ‘পরাজয়ের’ উদ্ধত পদধ্বনি স্পষ্ট হচ্ছে। এ জীবনে কতোবার এই একই রকম ঘটনা ঘটতে দেখলাম!
এদেশে এখনও এটিই সত্য যে ‘বিজয়ের ফানুস - দম ফুরাতেই ঠুস’। মানুষ আশঙ্কা করতে শুরু করেছে যে প্রতিবারের মতো এবারও তাদের বিজয় ক্ষণস্থায়ীই হবে। আগের মতো এবারও মানুষের মনে ‘—জয় করে তবু ভয় কেন মোর যায় না’ - এই গানটির গুনগুনানী অনুরণিত হতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায়, ইতিহাসের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার আলোকে রাজনীতিতে ‘জয়-পরাজয়’ সম্পর্কে আমার বিক্ষিপ্ত কিছু চিন্তা তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক কিম্বা অপ্রয়োজনীয় হবে না।
মনে পড়ছে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের কথা। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র ‘বিজয়’ হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস কি একথার প্রমাণ দেয়নি যে, সেবারের সেই আপাতঃ বিজয় আসলে মোটেও কোনো প্রকৃত ‘বিজয়’ ছিল না? বরঞ্চ তা ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বে চরম গ্লানিকর এক ‘পরাজয়ের’ বীজ বপনের ঘটনা। সেবারের সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবের সম্মতিতেই কুমিল্লার দাউদকান্দি আসন থেকে ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের মুজিব হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক কমান্ডার এবং ইতিহাসে খুনী বলে আক্ষায়িত খন্দকার মোশতাককে।
নির্বাচন শেষে ভোট গণনা শুরুর পর বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, জাসদের প্রার্থী রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে মোশতাক পরাজিত হতে চলেছেন। এমতাবস্থায় এই আসনের ফলাফল ঘোষণা মাঝপথে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। অনেক পরে, ঢাকার নির্বাচন কমিশন দপ্তর থেকে মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। সকলেই বুঝতে পেরেছিল যে, ভোট গণনায় কারচুপি করে মোশতাককে জিতিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই কলঙ্কিত ‘বিজয়ের’ দু’বছর যেতে না যেতেই, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিল সেই ভুয়া ‘বিজয়ী’ খুনি মোশতাক। একথা তাই মনে রাখা প্রয়োজন যে, সব ‘বিজয়’-ই বিজয় নয়। কিছু কিছু ‘বিজয়’ পরাজয়ের চেয়েও কালিমালিপ্ত, গ্লানিকর ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।
তেমনিভাবে একথাও আবার ঠিক যে, অনেক ‘পরাজয়’ বিজয়ের চেয়েও মূল্যবান ও গর্বের। কিউবার বিপ্লবের অন্যতম স্বপ্নপুরুষ চে গুয়েভারাকে সিআইএ এজেন্ট ও বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী হত্যা করেছিল। এর ফলে তার সে সময়ের অভিযানের ‘পরাজয়’ ঘটেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক-রাষ্ট্র ‘প্যারি কমিউনকে’ ৭০ দিনের মাথায় ‘পরাজয়’ বরণ করতে হয়েছিল। ক্রীতদাস বিদ্রোহের নেতা স্পার্টাকাস ও তার সহযোদ্ধাদের ক্রশে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের সে বিদ্রোহ ‘পরাজিত’ হয়েছিল। কিন্তু একথা কি সত্য নয় যে, এসব ‘পরাজয়’ ছিল অনেক বড়-বড় বিজয়ের চেয়ে মহৎ অর্জন? রাজনীতিতে তাই, সব ‘বিজয়’ই বিজয় নয়। আবার সব ‘পরাজয়’ পরাজয় নয়।
জয়-পরাজয়ের প্রসঙ্গ আসলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থের ‘কর্ণ কুন্তী সংবাদ’ কাব্য-রচনাটি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। কর্ণ ছিলেন সূর্য দেবতার ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্ম নেয়া প্রথম সন্তান। লোকলজ্জার ভয়ে কুমারী কুন্তী তার সেই প্রথম সন্তানটিকে পরিত্যাগ করে পথে ফেলে এসেছিলেন। কর্ণের কাছে তার পিতৃ-মাতৃপরিচয় অজ্ঞাত থেকে গিয়েছিল। পরে কুন্তীর গর্ভে পঞ্চ পাণ্ডবের জন্ম হয়েছিল। ঘটনাচক্রে পাণ্ডবদের শত্রু কৌরবদের থেকে কর্ণ সহানুভূতি ও অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয়ে তাদের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হন। সে ছিল কুরুপক্ষের একজন শ্রেষ্ঠতম যোদ্ধা।
রাজ্য নিয়ে কৌরবদের সাথে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবরা একপর্যায়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সন্তান-সংসার রক্ষার্থে মাতৃত্ববোধে উতলা হয়ে ওঠা কুন্তী তার প্রথম পুত্র কর্ণের সামনে উপস্থিত হয়ে এতোদিন ধরে গোপন রাখা কর্ণের জন্ম পরিচয় তাঁর সামনে উন্মোচন করেন। তিনি কর্ণকে কুরুপক্ষ ত্যাগ করে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হিসাবে তার পাণ্ডব ভাইদেরসহ রাজ্য অধিকার করে সিংহাসনে অধিষ্ঠান নেয়ার জন্য গভীর আবেগ সহযোগে অনুরোধ করেন। নিঃসন্দেহে অতি লোভনীয় প্রস্তাব!
বীরের ধর্ম ত্যাগ করে এরূপ কাজ করার প্রস্তাবটি কর্ণ দৃঢ়তার সাথে তখনই প্রত্যাখ্যান করেন। কুন্তীর এই প্রস্তাব সম্পর্কে কর্ণের বলিষ্ঠ জবাবটি দিয়ে কবিগুরু তার এই কবিতাটির সমাপ্তি টেনেছেন। এর কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি।
‘মা’ হিসেবে সদ্য পরিচয় পাওয়া কুন্তির সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কর্ণ বলছেন-
“সিংহাসন!
যে ফিরালো মাতৃস্নেহ পাশ
তাহারে দিতেছ মাতঃ, রাজ্যের আশ্বাস!
আজ যদি রাজ জননীরে মাতা বলি,
কুরুপতি কাছে বদ্ধ আজি যে বন্ধনে
ছিন্ন করে ধাই যদি রাজসিংহাসনে
তবে ধিক মোরে। ....
যে পক্ষের পরাজয়
সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান ....
শুধু এই আর্শীবাদ দিয়ে যাও মোরে,
জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,
বীরের সদগতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।”
রবীন্দ্রনাথের কলমে রচিত মহাভারতের এই উপাখ্যান অংশটি থেকে ‘সিংহাসন বিজয়ের’ চেয়ে ‘বীরের ধর্ম’ রক্ষার প্রশ্নটি যে অধিকতর মূল্যবান, সে শিক্ষাই পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের চলতি রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ-নৈতিকতার বোধ ও বিবেচনা প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। দেশের তথাকথিত ‘মূলধারার’ দু’টি বড় দলের নেতা-কর্মী-ক্যাডাররা তাদের ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নেয়াকে চলতি ‘রাজনীতির’ প্রধান বিবেচ্য বিষয় ও উপাদান করে তুলেছে। এ করতে পারাটিই তাদের কাছে ‘বিজয়’ বলে বিবেচিত। দেশবাসীর সামাজিক মনস্তত্ত্বেও এটিই ‘কিছু করতে পারা’ বলে গণ্য হচ্ছে। আমাকে তাই হরহামেশাই শুনতে হয় - “আপনারা, মণি সিংহরা বোকা, কোনো কাজের লোক না- জীবনে কিছুই করতে পারলেন না।”
প্রায় সব দেশেই ক্ষমতার নানান স্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে, বিভিন্ন কায়দায় রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করে, অবাধ লুটপাট চালিয়ে বিত্তবান হওয়ার সুযোগ গ্রহণ হয়ে উঠেছে বুর্জোয়া দলগুলোর অধিকাংশ নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের রাজনীতি করার আগ্রহের প্রধান উৎস ও প্রণোদনা। বর্তমানে রাজনীতিতে এটিই হয়ে উঠেছে ‘কিছু করতে পারা’ তথা ‘বিজয়ী’ হওয়ার প্রকৃত চরিত্র। কিন্তু যেটাকে ‘বিজয়’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে তা যে হিমালয় সম পরিমাপের ‘পরাজয়’- তা কী কেউ অন্তর থেকে অস্বীকার করতে পারবে?
সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে ১% লুটেরা ধনীক কর্তৃক ৯৯ শতাংশ জনগণের সৃষ্ট সম্পদের অবাধ ও বেপরোয়া লুটপাটের সুযোগের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকাটা একান্ত প্রয়োজন। তাই, সরকার গঠনের লড়াইয়ে ‘বিজয়’ নিশ্চিত করাটি রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার চাবিকাঠিতে পরিণত হয়েছে। এটিই হলো লুটেরা বুর্জোয়া দলগুলোর মধ্যে, ‘জয়’-‘পরাজয়’ নিয়ে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ, নৈরাজ্য জন্ম নেয়ার মূল কারণ।
জাতীয় সংসদের জনৈক সদস্যের সব নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হওয়া সম্পর্কে তার বহুল আলোচিত বক্তব্যটির কথা এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। সেই সংসদ সদস্য মহোদয়ের কাছে অপর একজন সংসদ সদস্য জানতে চেয়েছিলেন - ‘তিনি মুজিবের সময় মুজিবের দলে, মোশতাকের সময় মোশতাকের দলে, জিয়ার সময় জিয়ার দলে, এরশাদের সময় এরশাদের দলে। ব্যাপার কী! বারবার তিনি শুধু দল বদল করেন কেন?’ সেই সংসদ সদস্য একটি ঐতিহাসিক বক্তব্যের মাধ্যমে এই অভিযোগের জবাব দিয়ে বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার! আল্লার কসম, আমি জীবনে কখনো দল বদল করিনি। আমি সবসময় সরকারি দল করি। বারবার সরকার বদল হয়, তাহলে আমি কি করব?’ (তার কাছে ‘বিজয়ের’ অর্থ হলো এটিই।)
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মতলববাজি, দলবাজি ইত্যাদি সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘বিভিন্ন রকম বাজিকরদের পাল্লায় পড়ে দেশের মানুষ এখন দিশেহারা’। দেশে এখন চলছে ‘বাজিকরদের দৌরাত্ম’। ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে গদি দখলের যুদ্ধে এরাই হলো তাদের শক্তির প্রধান অবলম্বন ও কারিগর। এসব সুবিধাভোগীদের নিয়েই গড়ে উঠেছে এসব ‘বাজিকরদের’ বাহিনী। তাই, সরকার বদল হয়, সরকারের সর্দারের পরিবর্তন হয়, কিন্তু তাদের এসব ‘বাজিকরদের’ দাপট থেকে দেশবাসী রেহাই পায় না। সম্ভবত এরাই সেই ক্ষুদ্র গোষ্ঠি যাদের ‘বিজয়’ তুলনামূলক স্থায়ী হওয়ার কারণে ৯৯% মানুষের ‘বিজয়’ ক্ষণস্থায়ী হয়।
মন্ত্রী-উপদেষ্টা-এমপিদের বড় একটি অংশ দলের নীতি ও আদর্শ-দর্শন ইত্যাদি নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় না। গদিতে যতোদিন থাকা যায় ততোদিন ‘ক্ষমতার গাভী’ দোহন করে যতোটা দুধ দ্রুত ও বেপরোয়াভাবে বের করে আনা যায়- সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে তাদের সবটুকু মনযোগ। এটিই তাদের কাছে ‘বিজয়’।
এসব দলে ও সহযোগী সংগঠনসমূহে থাকে বহু ‘হাইব্রিড’ নেতা-কর্মী-সদস্য। নীতি-আদর্শের কোনো বালাই তাদের নেই। এরা শুধু নমিনেশন বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য ইত্যাদি এবং তেলবাজি ও দলবাজি করে তাদের ব্রিডিং চেষ্টা সম্পূর্ণ করতে এবং রাতারাতি দলের নেতা-ক্যাডার হয়ে উঠতে চায়। গদি দখলের প্রতিযোগিতায় ‘বিজয়ী’ হওয়ার লালসায় এসব রুগ্ন ‘হাইব্রিড’ নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের সাদরে গলায় মালা দিয়ে দলে নিতে এসব বুর্জোয়া দলের বিন্দুমাত্র অনীহা নেই। পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় এসব আবর্জনা কে কার চেয়ে বেশি হাত করতে পারলো সেটিকেই তারা তাদের ‘বিজয়ের’ অন্যতম মাপকাঠি বলে বিবেচনা করে।
মনে পড়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের পর-পরের একটি চিত্র। আমি গেরিলা বাহিনীর বড় দল নিয়ে ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রবেশ করে দেখলাম, ঢাকাসহ গোটা দেশ ভরে গেছে এক শ্রেণির ‘হাইব্রিড’ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে। দেখলাম, ঢালাওভাবে সবাই মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসেছে। অথচ কে কোথায় ফাইট করেছেন, তার কোনো খবর নেই। কিন্তু এসব ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের’ ভাব-ভঙ্গী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও হার মানানোর মতো। নানাভাবে বিভিন্ন অস্ত্রপাতিও তারা যোগাড় করে ফেলেছে। দেশ যখন শত্রুমুক্ত হয়েছে তার পরে, অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের পরে, তারা মুক্তিযোদ্ধার বেশ ধারণ করেছে। এদেরকে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘সিক্সটিন্থ ডিভিশনের’ মুক্তিযোদ্ধা। ‘বিজয়ের’ লালসায় লুটেরা বুর্জোয়া দলগুলো এধরনের আবর্জনা নিজ নিজ পক্ষভুক্ত করতে জয়-পরাজয়ের মরিয়া দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।
নব্বইয়ে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসানের পর সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া শাসকরা তাদের শোষণ-লুটপাট নিরঙ্কুশ রাখতে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল- উভয়ই যেন তার স্বার্থের পাহারাদার হয় সেজন্য ‘নৌকা’ এবং ‘ধানের শীষ’- এই দুই বুর্জোয়া দলকে বিশেষ মদত দিয়ে দেশের ক্ষমতা-কেন্দ্রীক শক্তির দ্বিদল-ভিত্তিক মেরুকরণ ঘটিয়েছিল। পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়ায় তারা ভাগ বাটেয়ারা করে লুটপাটের সুবিধা নিত। সরকার আসতো-যেতো, কিন্তু স্থায়ীভাবে বহাল থাকতো সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের শোষণের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ‘নৌকার’ অপসারণ ঘটেছিল (অন্ততঃ সাময়িকভাবে)। এ থেকে ‘ধানের শীষের’ মাঝে এমন ধারণা জন্ম নিয়েছিল- যেহেতু মাঠে এখন ‘নৌকা’ নেই তাই নৌকা-বিহীন মাঠে ধানের শীষই হলো একক প্লেয়ার। তাই সে এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকলেও মসনদের চাবি তার হাতে ‘আপনাসে’ চলে আসবে। তার এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমালেও চলবে। ‘বিজয়ের’ আনন্দে সে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে বসেছিল। নৌকার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট শুন্যতার সুযোগে চরম দক্ষিণপন্থী ও জামায়াতের নেতৃত্বে একটি শক্তি যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সেটিকে সে হিসাবেই নেয়নি। নিলেও, মনে করেছিল যে ওরা যা খুশি হয় করুক, এ ধরনের ষড়যন্ত্রকে সে অতি সহজেই ‘ম্যানেজ’ করতে পারবে। ‘বিজয়ের’ পেছনে-পেছনে যে ‘পরাজয়’ সন্তর্পণে ও ভয়ঙ্কর চেহারায় ছোবল মারতে উদ্যত- তা বুঝতে তাদের অনেক দেরি হয়েছে।
এদিকে, ষড়যন্ত্রকারী শক্তি ও জামায়াত প্রমুখ অন্য প্ল্যান নিয়ে আগাচ্ছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধকে দূরে নিক্ষেপ করে ’৪৭-এর পাকিস্তানি ধারায় ‘নয়া প্রজাতন্ত্র’ কায়েমের ওয়াদার ঘোষণা দিয়ে রাজপথে ‘মব সন্ত্রাস’ সংগঠিত করতে শুরু করেছিল। এভাবে পেরে না ওঠায় তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সংস্কার বিষয়ক ঐক্যমত্য সনদ রচনার এক দীর্ঘ কার্যক্রম শুরু করেছিল। নতুন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হয়ে মাঠে নেমেছিল তুরস্ক।
বিজয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে পরাজয়ের দানবীয় শক্তি যে ছুরিতে সান দিচ্ছে তা বুঝে উঠতে বিএনপির বিলম্ব হয়েছিল। ফলে, দেশ-বিদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে নানা প্রতিশ্রুতি ও ছাড় দিয়ে তাকে তার ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। শোনা যায়, শীর্ষ নেতার দেশে আসা নিশ্চিত করতে এভাবেই লন্ডনে তাকে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়েছিল। মনে না করার কোনো কারণ নেই যে এটিই হলো আমেরিকার সাথে দেশ বিক্রির বাণিজ্য চুক্তি, বিদেশি প্রাইভেট কোম্পানিকে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া- ইত্যাদি ক্ষতিকর চুক্তিগুলো করার পটভূমি। আত্মসমর্পণের এই ‘কৌশলী’ পথ যে ‘বিজয়কে’ শেষ পর্যন্ত ‘পরাজয়ে’ পরিণত করে তার ভুরি-ভুরি অভিজ্ঞতা থাকলেও শ্রেণিগত বৈশিষ্টের কারণেই বুর্জোয়া শ্রেণির যে কোনো দল যে এরকম ক্ষতিকর অথবা এমনকি আত্মঘাতী পথ গ্রহণ করবে সেটাই স্বাভাবিক।
আমাদের দেশের দুঃখজনক ইতিহাস হলো- আমরা বিজয় অর্জন করতে পারলেও, সে বিজয় আমরা ধরে রাখতে পারি না। ফলে অভিজ্ঞতা ও যুক্তির বিচারে একথা বলতে হয় যে ‘বিজয়কে’ এভাবে আর ‘পরাজয়ে’ পরিণত হতে না দিতে হলে দেশে বুর্জোয়া শ্রেণির উপর নির্ভর করার বদলে মেহনতি শ্রেণির নেতৃত্বে বামপন্থি, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক দল-শক্তির সমন্বয়ে বৃহত্তর একটি, আমার ভাষায়, ‘রংধনু যুক্তফ্রন্টকে’ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। নীতি ভ্রষ্টতার বর্তমান অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে হবে। দৃষ্টি দিতে হবে দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট শাসক দলের শ্রেণি চরিত্রের প্রতি। পরিবর্তন আনতে হবে সেখানে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে ৯৯ শতাংশের স্বার্থ রক্ষাকারী শক্তির শাসন। রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে নীতিবোধের প্রাধান্য।
একজন প্রকৃত বীরের কখনই উচিত নয়- ‘রাজ্যলোভকে’ অর্থাৎ বৈষয়িক স্বার্থের বিবেচনাকে কোনোভাবেই ‘ন্যায়ধর্মের’ তথা নীতি, আদর্শ, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, প্রগতিশীলতা ইত্যাদির ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া। বীরের কাজ হলো নীতি আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে, বরং তা পরিপূর্ণভাবে অক্ষুণ্ন রেখে ও বিকশিত করে প্রকৃত বিজয় ছিনিয়ে আনা। মনে রাখতে হবে যে, ‘অসৎ পথে কোনো সৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা যায় না’। এটিই হলো ইতিহাসের শিক্ষা। এই পথেই কেবল দেশকে সঙ্কটমুক্ত করা সম্ভব। এ কাজে কোনো সহজ শর্টকাট রাস্তা নেই।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন