হাম
বামপন্থিদের করণীয়
ডা. মনোজ দাশ
বাংলাদেশে হাম-সংক্রান্ত মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; একই সাথে এটি রাষ্ট্র, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নও। তাই বামপন্থি রাজনীতির জন্য এটি কেবল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার, বা বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা’ বলে থেমে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নকে গণতান্ত্রিক ও শ্রেণিগত প্রশ্ন হিসেবে তুলতে হবে।
এক্ষেত্রে বামপন্থিদের কয়েকটি করণীয় আছে; প্রথমত, বামপন্থিদের জনস্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করতে হবে। বামপন্থিদের উচিত হামকে ‘ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য’ নয়, বরং অপুষ্টি, দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনা, টিকাদান কাভারেজের অসমতা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, বেসরকারিকরণ ও স্বাস্থ্যখাতে কম ব্যয়– এই বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার সাথে যুক্ত করে দেখা। অর্থাৎ বামপন্থিদের দাবি হবে: সর্বজনীন ও বিনামূল্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকাদান অবকাঠামো শক্তিশালী করা, মা ও শিশু পুষ্টি কর্মসূচি সম্প্রসারণ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহে জবাবদিহি।
দ্বিতীয়ত, বামপন্থিদের হাম বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গণজাগরণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে। হাম প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু ‘টিকা নিন’ বললে হয় না। মানুষের মধ্যে ভয়, গুজব, অবিশ্বাস– এসবও বাস্তব সামাজিক উপাদান। এখানে বামপন্থিদের ভূমিকা হতে পারে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রচার, গ্রামে-মহল্লায় স্বাস্থ্যশিক্ষা, ধর্মীয়/সামাজিক গুজবের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর প্রিচারণা। বামপন্থিদের কাছে এটি ‘জনগণের মধ্যে কাজ’-এর অংশ হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের জবাবদিহি দাবি করা। যদি কোথাও টিকার ঘাটতি, ভুল নীতি ও সিদ্ধান্ত, কোল্ড-চেইন ব্যর্থতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অকার্যকারিতা বা অব্যবস্থাপনা থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে প্রকাশ ও শাস্তির দাবি তোলা প্রয়োজন। যেমন: অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা ও তার অভিঘাতের তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ, কোন জেলায় টিকাদানের হার কম? কেন কম? স্বাস্থ্য বাজেট কোথায় যাচ্ছে? শিশুমৃত্যুর তথ্য কি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে? বাম রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ‘জনগণের জানার অধিকার’-কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
অবশ্যই করোনার সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত হাম সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য -উপাত্ত, এ সম্পর্কে দুর্নীতির অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়, বর্তমান সরকারের ভূমিকা এবং বর্তমান সংকটের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আওতায় আনা এবং দোষীদের প্রয়োজনীয় শাস্তির দাবি উত্থাপন করতে হবে।
চতুর্থত, বামপন্থিদের স্বাস্থ্যকে শ্রেণি-প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সাধারণভাবে হামে মৃত্যু সাধারণত দরিদ্র, অপুষ্ট, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে বেশি হয়। তাই বামপন্থিদের জন্য এটি শ্রেণি-বৈষম্যের প্রশ্নও। এখানে রাজনৈতিক ভাষ্য হতে পারে- ধনী ও দরিদ্র এলাকার স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, নগর বনাম গ্রাম, বস্তি ও চরাঞ্চলের অবস্থা, মা ও শিশু পুষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা।
পঞ্চমত, শুধু সমালোচনা নয়, বিকল্প সামাজিক উদ্যোগও নিতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বহু বামপন্থি সংগঠন ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, গণস্বাস্থ্য প্রচার, টিকাদান সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক কাজ করেছে। এখনো স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তব আস্থা তৈরি করতে পারে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক ভাষায় মানবিকতা বজায় রাখা। স্বাস্থ্য সংকটে মানুষের শোককে কেবল দলীয় প্রচারের উপাদান বানালে উল্টো প্রতিক্রিয়া হয়। তাই প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বক্তব্য, আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, আতঙ্ক নয়, সচেতনতা তৈরি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এড়িয়ে চলা।
মার্কসবাদী দৃষ্টিতে বললে, জনস্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়; এটি উৎপাদন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, শ্রেণিসম্পর্ক ও সামাজিক পুনরুৎপাদনের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
তাই বর্তমান হাম সংকটে বামপন্থিদের কাজ হওয়া উচিত একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক, গণমুখী, অধিকারভিত্তিক এবং কাঠামোগত পরিবর্তনমুখী।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন