‘বিকল্পের’ কোনো বিকল্প নেই

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
‘ঘুনে ধরা এ সমাজ ভাঙতে হবে’– পাকিস্তান আমল থেকে এ কথা আমরা বলে চলেছি। অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, দুরাচারের কোনো ‘চমকপ্রদ’ ঘটনা ঘটলে আমরা এক ডিগ্রি উপরে রাজপথ কাঁপানো আওয়াজ তুলে কথাগুলো বলতাম। সরকার লোক দেখানো কিছু একটা বলে এমন ভাব দেখাতো যেন এবার দেশকে সে দুরাচারমুক্ত করেই ছাড়বে। কিছুদিন নানা হম্বিতম্বি ও তার প্রচারণায় মানুষ মনে করতো– যাক এবার তবে দুরাচারের দানব দূর হবে! কিন্তু কোথায় কী? কয়েকদিন গ্যাপ দিয়ে সরকার আগেরটাই থাকুক বা নতুন কোনোটা আসুক– অবস্থা আগে যা ছিল তাই! বেশ মনে আছে, ২০১৯ সালে একের পর এক ঘটতে থাকা দুষ্কর্মের উদ্বেগজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, দেশে প্রায় সবকিছুতেই এখন ‘উই পোকা’ ঢুকে পড়েছে যা দূর করতে সরকার কঠোর ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনা করবে। ‘উইয়ে ধরার’ কথাটি তিনি মিথ্যা বলেননি। প্রায় ৫ দশক ধরে যে সর্বগ্রাসী পচন প্রক্রিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাস করেছিল, তাতে তা ‘উই পোকা ধরার’ মতো বিষয় হয়ে উঠেছিল বৈকি! কিন্তু শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে যে কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই বলেন নি। ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞবানদের মুখে শুনে এসেছি যে ‘উই পোকা’ থেকে বাঁচার কোনো সহজ দাওয়াই নেই। কোনো বাড়িতে ‘উইয়ে ধরলে’– ভিটা স্থানান্তর করে নতুন ভিটার ওপর বাড়ি পুনঃনির্মাণ করা ছাড়া তা থেকে বাঁচার অন্য কোনো উপায় নেই। বর্তমানে সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিতে যে গভীর পচন ধরেছে তা থেকে বাঁচতে শুদ্ধি অভিযানের মেরামতিতে কাজ হবে না। বাঁচতে হলে ভিটা স্থানান্তরের মতো সমাজ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ‘লুটপাটের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’ বদল করে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার আলোকে সমাজতন্ত্র অভিমুখী ধারায় দেশকে ঢেলে সাজাতে হবে। দেশবাসী সেসময় একথা জেনে স্তম্ভিত হয়েছিল যে, ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে বছরের পর বছর ধরে সরকার ও প্রশাসনের নাকের ডগায় কয়েক ডজন অবৈধ ‘ক্যাসিনো’ চলতো। এসব ক্যাসিনোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার জুয়ার কারবার চলতো। ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসন, কোটিপতি ব্যবসায়ী, সমাজের ‘উপরতলার’ ভিআইপি/সিআইপি-দের মধ্যে অনেকেই এই ‘ক্যাসিনো’ কারবারের সাথে জড়িত ছিল। এর আগেআগেই পরপর বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতার কোটি কোটি টাকার ‘পার্সেন্টেজ ব্যবসা’ ও ‘চাঁদাবাজির’ প্রমাণ্য খবর, সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে ‘বালিশ’-কাণ্ড, ‘পর্দা’-কাণ্ড, ‘ঢেউটিন’-কাণ্ড ইত্যাদি অকল্পনীয় সব লুটপাটের একটার পর একটা ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন মহলের পাপকর্ম উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের এহেন পচনের দুর্গন্ধ দেশবাসীকে হতবাক ও উদ্বিগ্ন করে তুলছিল। সকলের মনে প্রশ্ন জেগেছিল– সমাজ ও রাষ্ট্রের এরূপ পচন ঘটলো কবে-কিভাবে? কী তার উৎস? এ পচন থেকে বাঁচার উপায়ই বা কী? বস্তুত, স্বাধীনতার পর থেকেই দেশকে যে পুঁজিবাদী লুটপাটের ব্যবস্থায় পরিচালনা করা হয়েছে তাতে ক্ষমতাসীন মহল ও দেশের ১ শতাংশ বিত্তবান সুবিধাভোগী মানুষ সুখে আত্মহারা হতে পারলেও, অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ দেশবাসী হয়েছে দিশেহারা। দেশের সাধারণ মানুষ ‘বেপরোয়া লুটপাট’ ও ‘অপরাধমূলক কাজকর্মের’ এহেন বিস্তারের চিত্র দেখতে-দেখতে প্রায় সবকিছুর ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত ছিল। এই অবস্থার ‘পরিবর্তনের’ জন্য তারা অধীর ছিল। কিন্তু সে ‘পরিবর্তন’ কিভাবে আসতে পারে তার দিশা তাদের জানা ছিল না। এরূপ ‘পরিবর্তন’ আনতে পারার মতো শক্তির পর্যাপ্ত দৃশ্যমান উপস্থিতিও তারা সেভাবে দেখতে পেত না। তাই ক্ষোভে ফুঁসলেও তাদের প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল চলতি অবস্থার মধ্যেই ‘কোনোরকমে বেঁচে-বর্তে থাকার’। জীবন যন্ত্রণায় কাতর দেশের শ্রমজীবী মানুষসহ জনগণের এই হতাশা ও ক্ষোভকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংগঠিত করে ‘বিকল্প’ রাজনৈতিক শক্তির আকার দিতে দেশের প্রগতি ও গণতন্ত্রের শক্তি সক্ষম হয়নি। তাই, এই হতাশা ও স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে বহুলাংশে কাজে লাগাতে পেরেছিল দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। সাম্রাজ্যবাদী মদদে ও তাদের দ্বারা প্রমোটেড হয়ে ‘মাস্টারমাইন্ডের’ স্বআরোপিত তকমা নিয়ে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখপত্রের স্থান দখল করে নিয়েছিল জামায়াতসহ চরম দক্ষিণপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। পরিবর্তনের কথা বলে তারা মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে নাকচ করে দেশকে একাত্তর-পূর্ব ধারায় নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা এবার সফল হয়নি বটে, কিন্তু তাদের সেই ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কিভাবে তার মোকাবিলা করা যাবে? দেশি-বিদেশি শোষক চক্রের এক্ষেত্রে একটি দ্বিতীয় পরিকল্পনাও তৈরি ছিল। তারা এতোদিন ধরে চলতে থাকা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার একটি ‘নব-সংস্করণ’ দ্বারা নিজেদের শ্রেণিগত শোষণ-লুণ্ঠনের ‘ব্যবস্থা’ অব্যাহত রাখার পথও ঠিক করে রেখেছিল। ‘গদি বদল’ মেনে নিলেও ‘ব্যবস্থা বদলের’ সম্ভাবনাকে ঠেকিয়ে রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। অর্ধ শতবর্ষ ধরে দেশের অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কোনো না কোনোভাবে থেকেছে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক ‘লুটেরা শক্তির’ হাতে। ‘রাজনীতির’ দখল আগাগোড়াই তাদের হাতে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রকেও’ দেশের ওপর নিরঙ্কুশ খবরদারি করার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। এভাবে, দেশ আগাগোড়াই থেকেছে এই ‘ত্রি-অপশক্তির’ ‘ক্রিমিনাল সিন্ডিকেটের’ নিয়ন্ত্রণে। শেখ হাসিনার শাসনকালে অপরাধ চক্রের ‘মূল সর্দারের’ আসনটি একসময় ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ হাতে চলে যাওয়ায় রাষ্ট্র প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিস্ট চরিত্র সম্পন্ন হয়ে উঠেছিল। বাজার অর্থনীতি জন্ম দিয়েছিল বাজার রাজনীতির। বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্বৃত্তায়নের খড়গের নিচে পড়ে রাজনীতি হয়ে পড়েছিল রুগ্ন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের মদতে ‘হালুয়া-রুটির অপরাজনীতির’ দাপট ‘আদর্শের রাজনীতিকে’ কোণঠাসা করে ফেলেছিল। বহুলাংশেই এসব ছিল দেশি-বিদেশি শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফসল। আমাদের দেশের ওপর সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্ববাদ, বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ গভীরে প্রথিত। ভেতর-বাহির সব দিক থেকেই দেশ আজ সংকট ও বিপদের মুখে রয়েছে। শোষণ, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অন্যায়-অনাচারে দেশ ডুবতে বসেছে। একদিকে দারিদ্র্যের সাগর ও অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষের হাতে কল্পনাতীত বিত্ত-ভৈবব। বাংলাদেশে আজ কার্যত পৃথক দুই-অর্থনীতি, দুই-সমাজ, দুই-দেশ তৈরি হয়েছে। চব্বিশের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান’ এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন সত্ত্বেও এই অবস্থার মৌলিক কোনো হেরফের ঘটেনি। তাই দেশকে অনাচার, রুগ্নতা ও সংকট তথা তার ‘উইয়ে খাওয়া’ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আগের মতোই ব্যবস্থা বদল করা শর্তবদ্ধ করণীয় হয়ে আছে। অর্থাৎ বাঁচতে হলে বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই। জনগণের নিত্যদিনের এসব দুর্ভোগ-যন্ত্রণা থেকে এবং সমাজের সার্বিক অবক্ষয় ও পচন থেকে পরিত্রাণের জন্য তাই আজ প্রয়োজন লুটেরা ধনীক স্বার্থাভিমুখী পুঁজিবাদী ধারা পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশার আলোকে, তথা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে গরিব মেহনতি ও নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষের স্বার্থে দেশ পরিচালনা করা। তা করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি আমূল ঢেলে সাজানো। অর্থাৎ ‘ব্যবস্থা’ বদল করা। দেশে এখন ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি দল। তারা কোন নীতিতে দেশ চালায়, কী করে কোন পথে কতটুকু করে এসব নজরে রাখতে হবে, তবে একথা বলা যায় যে, বুর্জোয়া শ্রেণি চরিত্র ধারণকারী একটি দলের পক্ষে ব্যবস্থা বদল করার মতো কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির পর্যায়ক্রমিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে বামপন্থি-গণতান্ত্রিক ‘বিকল্প’ শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা। পুঁজিবাদের চলতি মডেলের অনুসারী একটি দল যদি সেই ব্যবস্থারই একটি নব সংস্করণের পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষমতায় আসে তাহলে তাতে অবস্থার কোনো মৌলিক বদল ঘটবে না। তা হবে ‘ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত চুলায় ঝাঁপ দেয়ার’ মতো ব্যাপার। তাই, বিদ্যমান রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারার ক্ষেত্রে আমূল বিপ্লবী পরিবর্তন সাধন করতে পারার মতো উপযুক্ত শক্তি সংগঠিত করতে হবে। এজন্য গতানুগতিক তাৎক্ষণিকতার বাইরে গড়ে তুলতে হবে শ্রেণি আন্দোলন ও গণআন্দোলনের নতুন জোয়ার। দেশ ও সমাজকে অব্যাহত পচন থেকে বাঁচাতে হলে আজ ‘বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প’ প্রতিষ্ঠার পথ গ্রহণ করা আবশ্যিক শর্তে পরিণত হয়েছে। দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থি শক্তির পক্ষেই কেবল সম্ভব অপরাপর সব প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তিকে সাথে নিয়ে এই কাজে নেতৃত্ব দেয়া। যদি এ কর্তব্য পালনে তারা অবহেলা করে ও সে কারণে ব্যর্থ হয় তাহলে দেশ চলে যাবে চরম ডানপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াতপন্থি মহলের হাতে। কারণ আজ বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই। হয় বাম-প্রগতিশীল বিকল্প, না হয় চরম দক্ষিণপন্থি উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অন্ধকার। বিকল্প গড়ার কাজে সফল হতেই হবে! এর কোনো বিকল্প থাকতে পারে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..