রাজধানীর দয়াগঞ্জে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের বিক্ষোভ মিছিল একতা প্রতিবেদক :
ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার বৃহৎ লুটেরা পুঁজির স্বার্থে ভুলনীতি গ্রহণ করছে, যা সংকট নিরসনের নামে দেশে গভীর সংকট সৃষ্টি করবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জলি তালুকদার।
তিনি বলেন, সরকার বিদ্যুতের অবৈধ লাইন বিচ্ছিন্ন করার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে যে সকল লাইনের বিল নিয়মিত পরিশোধ করা হয়, সেসকল বিদ্যুৎ সংযোগসমূহও বিচ্ছিন্ন করছে। মুখে অবৈধ লাইনের বিরুদ্ধে অভিযান করার কথা বলা হলেও, প্রকৃত বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজসমূহ উচ্ছেদের অভিযান পরিচালনা করছে। যা নাগরিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে, একইসাথে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান উচ্ছেদ করছে।
রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা জলি তালুকদার বলেন, সরকার এই সকল কর্মকাণ্ড গ্রহণ করছে বৃহৎ পুঁজির লুটেরাদের স্বার্থরক্ষায়। লুটেরাদের স্বার্থরক্ষায় দেশকে ভুল পথে পরিচালনার নীতি থেকে সরকার বিরত না হলে, শ্রমিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশকে সঠিক নীতিতে পরিচালনার দায়িত্ব শ্রমিকরা নেবে।
গত ১ অক্টোবর বেলা ১১টায় রাজধানীর দয়াগঞ্জ মোড়ে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স, যৌক্তিক নীতিমালা ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের নামে বাণিজ্যিক রেটে পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের মিটার সংযোগসমূহ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের এ বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
সংগঠনের যাত্রাবাড়ী-শ্যামপুর-গেন্ডারিয়া অঞ্চল কমিটির সমন্বয়ক রিপন হোসেনের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, যাত্রাবাড়ী থানা সভাপতি মিন্টু মোল্লা, শ্যামপুর থানা সভাপতি মো. রাকিব, গেন্ডারিয়া থানা সাধারণ সম্পাদক মো. হাসান, অঞ্চল কমিটির নেতা মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকারের ভুলনীতি-দুর্নীতি কারণে সৃষ্ট যানজট ও বিদ্যুৎ সমস্যার দায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে তাদের কর্মসংস্থান থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। রিকশাচালকদের কেউ শখ করে রিকশাচালক হয় না, জীবন-জীবিকার নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাদের রিকশা চালকে পরিণত করে। সরকার এই প্রান্তিক মানুষদের কোনো কর্মসংস্থানের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারায় আজ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেরা নিজেদের জীবিকা নিশ্চিত করতে রিকশাচালক ও হকারে পরিণত হয়েছে। তাদের বিকল্প রুটি-রুজির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ধনিকশ্রেণির স্বার্থে জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করা চলবে না। সঠিক নীতি গ্রহণ করলে সকলের কর্মসংস্থান নিশ্চিত রেখেই দেশের যানজট ও বিদ্যুৎ সমস্যার সংকট নিরসন সম্ভব। কিন্তু সরকার সে পথে না হেটে, গরিব মানুষের জীবিকা কেড়ে নিতেই বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যম ব্যাটারিচালিত যানবাহন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। তার অবদানকে অস্বীকার করে সরকার বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় উচ্ছেদ প্রক্রিয়া পরিচালনা করলে, ভাত দেওয়ার মুরোদ না থাকা গোসাইকে কিল দিতে দেওয়া হবে না। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালিত হবে।
বক্তারা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, সংকট নিরসনে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন প্রস্তাবিত ১২ দফা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করুন, অন্যথায় বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে সংকটকে ঘনীভূত করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না।
সমাবেশ শেষে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের নামে বাণিজ্যিক রেটে পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের মিটার সংযোগসমূহ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স, যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়নসহ প্রস্তাবিত ১২ দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল দয়াগঞ্জ মোড় থেকে জয়কালী মন্দির হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ১২ দফা
(১) দেশের সড়ক-উপযোগী নকশায় আধুনিকায়নসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দিতে হবে; (২) চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে; (৩) ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; (৪) শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বন্ধ কর; (৫) শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে; (৬) সড়কের লেন পদ্ধতি সচল করে সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে; (৭) ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে; (৮) জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে; (৯) ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং বর্তমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে; (১০) অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে; (১১) শ্রমিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে; (১২) দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে।