দখলদারি, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির মচ্ছব বুর্জোয়া লুণ্ঠনতন্ত্রের নগ্ন রূপ

আহমেদ মিঠু

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক রক্তক্ষয়ী, অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ, কৃষক-শ্রমিক এবং লড়াকু ছাত্র-জনতা ফ্যাসিস্ট ও লুণ্ঠনকারী আওয়ামী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দেশের মানুষকে এক নির্মম ও কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে-এক স্বৈরাচারের পতন বা ক্ষমতার হাতবদল হলেও দেশের শাসকশ্রেণির বুর্জোয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা আমলাতান্ত্রিক ও লুণ্ঠনমুখী কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ফলে রাজপথ, ফুটপাত, হাট-বাজার, পরিবহন খাত, আবাসন শিল্প থেকে শুরু করে জনকল্যাণমূলক চিকিৎসাসেবা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতেও এখন চলছে দখলদারি, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির নতুন ও ভয়াবহ মহড়া। বুর্জোয়া রাজনীতি যে কাঠামোগতভাবেই গণবিরোধী, লুণ্ঠননির্ভর এবং মেহনতি মানুষের মূল শত্রু— সাম্প্রতিক একের পর এক নৃশংস ও উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো তা আরো একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। পেশিশক্তি ও বর্বরতায় পিষ্ট জনস্বার্থ সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রান্তিক জেলাগুলোতে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক সহিংস ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শাসক ব্যানারের বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন হলেও ক্যাডার বাহিনীর সন্ত্রাস, অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং জমি-সম্পদ দখলের চরিত্র ও পদ্ধতি হুবহু একই রয়ে গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঢাকার মিরপুরে কয়েক দশক ধরে দুস্থ ও নিম্নবিত্ত মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’-এ রাতের আঁধারে ভারী এক্সকেভেটর ও বুলডোজার নিয়ে একদল সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর হামলা। দুস্থ মানুষের এই চিকিৎসাকেন্দ্রটির ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধপত্র লুটপাট করা হয় এবং সেখানে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের অস্ত্র উঁচিয়ে জিম্মি করা হয়। চিকিৎসার মতো একটি অতিজরুরি ও স্পর্শকাতর মানবসেবা খাতকে বুর্জোয়া জমি দখলবাজদের লুণ্ঠনের শিকার বানানোর এই চরম বর্বরতা প্রমাণ করে-রাজনৈতিক ছায়াতলে থাকা অপরাধীদের কাছে মানবিকতার কোনো স্থান নেই। এই ঘটনার রেশ কাটার আগেই রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও তরুণ উদ্যোক্তা সালমান মুক্তাদিরের নির্মাণাধীন স্টুডিওতে সশস্ত্র তাণ্ডব চালানো হয়। ভারী অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে কার্যালয়টি ভাঙচুর ও তছনছ করা হয়। অন্যদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চানঁ উদ্যানে দিনদুপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে ব্যবসায়িক কার্যালয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। একইভাবে আদাবর ও শেখেরটেক এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণস্থলে চাঁদা দাবি, ডেভেলপার ও বাসাবাড়ির মালিকদের হুমকি প্রদান এবং জোরপূর্বক জমি ও ফ্ল্যাট দখলের একের পর এক ঘটনা উদঘাটিত হচ্ছে। এলাকাভিত্তিক এই অপরাধী সিন্ডিকেটগুলোর তৎপরতা এখন সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে চরম আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে। লুণ্ঠনের এই রাজত্ব কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও লুণ্ঠন হাতবদলের প্রতিযোগিতা তীব্র রূপ নিয়েছে। কিশোরগঞ্জে স্থানীয় প্রাকৃতিক জলাশয়, হাওর ও ইজারা খাতের নিয়ন্ত্রণ এক পক্ষের হাত থেকে অন্য পক্ষে নেওয়ার জন্য সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রকৃত মৎস্যজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ। বুর্জোয়া রাজনীতির চিরন্তন দেউলিয়াত্ব চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী, গণতান্ত্রিক ও সামাজিক সুবিচারসম্পন্ন শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য এই যে, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো সেই গণআকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে এখন ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা ও অর্থ উপার্জনের সাম্রাজ্য দখলের এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের তোষণ নীতি ও ক্যাডার পোষার ধারা বদলায়নি। বিগত দেড় দশকে যারা পুরো দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো থেকে চাঁদা তুলেছে, তারা পালিয়ে যাওয়া বা আত্মগোপনে যাওয়ার পরপরই সেই খালি হওয়া চাঁদাবাজির স্পটগুলো রাতারাতি দখল করে নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্যাডার চক্র। পরিবহন খাতের রসিদ ছাড়া চাঁদা তোলা, বাস টার্মিনাল, টেম্পো স্ট্যান্ড, শাকসবজির আড়ত থেকে শুরু করে গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার লাইসেন্স—সবই এখন নতুন দখলদারদের কব্জায়। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো কোনো প্রকার বৈপ্লবিক আদর্শ, মেহনতি মানুষের নীতি বা স্পষ্ট সামাজিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয় না। তাদের মূল ভিত্তি হলো অবৈধ অর্থের লেনদেন এবং সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর লালন-পালন। নির্বাচনে জয়ী হওয়া বা রাজপথে ভীতি তৈরি করতে এই ক্যাডারদের প্রয়োজন হয়। আর সেই পোষা ক্যাডারদের বাঁচিয়ে রাখতে ও আর্থিকভাবে তুষ্ট রাখতে প্রয়োজন পড়ে হাসপাতাল ভাঙচুর, জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য কায়েমের। বুর্জোয়া শ্রেণির তোষণ নীতিতে পরিচালিত পুলিশ ও প্রশাসন প্রায়শই এসব প্রভাবশালী লুণ্ঠনকারী ও ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যা প্রকারান্তরে সন্ত্রাসী চক্রগুলোকে চরম রাজনৈতিক বৈধতা এনে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের পরিবর্তনের রূপরেখা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেবল একটি সরকারের পতনের পর আরেকটি নতুন সরকার আসার যে বুর্জোয়া খেলা চলে আসছে, সাধারণ মানুষ তা থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। দেশজুড়ে গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সাধারণ মেহনতি মানুষকে একটি বড়ো সত্য অনুধাবন করতে বাধ্য করেছে-আইন ও শাসনব্যবস্থার এমন কোনো উন্নতি হয়নি যা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে। বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙেনি, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, বেকার যুবকের কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি; অথচ বিপরীত দিকে দখল ও চাঁদাবাজির উৎসব পুরোদমে ফিরে এসেছে। দেশের কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, কারখানার শ্রমিক নিয়মিত বকেয়া বেতনের দাবিতে রাজপথে গুলিতে প্রাণ দিচ্ছে, আর ওপরতলার বুর্জোয়া নেতারা ক্ষমতার সমীকরণ ও ভাগাভাগি নিয়ে বিলাসী টেবিলে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে দেশের প্রান্তিক মানুষের কল্যাণ সাধন করা অসম্ভব। মুক্তির একমাত্র পথ : লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়া ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে দেশজুড়ে অব্যাহত দিনদুপুরের চাঁদাবাজির প্রতিটি ঘটনা সাধারণ মানুষের সামনে একটি চিরন্তন বার্তা দিচ্ছে-ব্যক্তির পরিবর্তন, দলগত রদবদল কিংবা সংস্কারের বুলি আওড়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার বা অর্থনৈতিক মুক্তি আনা সম্ভব নয়। যদি ক্ষমতার মসনদে পরিবর্তন আসে কিন্তু উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অবাধ পুঁজিবাদী নীতি এবং রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামো বুর্জোয়া লুটেরা ও করপোরেট শ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত হতে থাকে, তবে লুণ্ঠন, খুন, দখলদারি ও সহিংসতার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। এই অস্ত্রধারী দখলদার, ভূমিদস্যু ও চাঁদাখোর রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে মেহনতি শ্রমিক, কৃষক, মেধা ও কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত জনগণ, অকুতোভয় তরুণ ছাত্র সমাজ এবং সর্বস্তরের প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়-বরং লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়া ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ ঘটিয়ে বৈপ্লবিক বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করাই আজ মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির একমাত্র ঐতিহাসিক পথ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..