
একতা বিজ্ঞান ডেস্ক :
প্রথমবারের মতো সমুদ্রে স্থাপিত একটি বিশেষ মঞ্চের ওপর জাল ব্যবহার করে কক্ষপথে পৌঁছাতে সক্ষম রকেটের সহায়ক অংশ সফলভাবে ফিরিয়ে এনেছে চীন। এই পরীক্ষা চীনের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশের বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে লং মার্চ-১০বি রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের কিছু সময় পর রকেটটির প্রধান অংশ ও সহায়ক অংশ আলাদা হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রায় ছয় মিনিট পর সহায়ক অংশটি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিচে নেমে আসে এবং সমুদ্রে ভাসমান বিশেষ মঞ্চে স্থাপিত জালে সফলভাবে আটকা পড়ে।
এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে চীন প্রথমবারের মতো কক্ষপথ-শ্রেণির কোনো রকেটের সহায়ক অংশ সফলভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো। একই অভিযানে রকেটটি একটি উপগ্রহ নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করেছে বলেও জানানো হয়।
ঘটনার পর চীনের মহাকাশ প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এই সাফল্য দেশটির বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণ ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।
লং মার্চ-১০বি রকেটটি চীনের রাষ্ট্রীয় রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না একাডেমি অব লঞ্চ ভেহিকল টেকনোলজি তৈরি করেছে। রকেটটি নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে অন্তত ১৬ মেট্রিক টন ওজনের মালামাল বহন করতে সক্ষম। এ কারণে এটি বিশ্বের আধুনিক মাঝারি ক্ষমতার রকেটগুলোর সঙ্গে তুলনাযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এর পুনরুদ্ধার পদ্ধতি প্রচলিত অবতরণ ব্যবস্থার চেয়ে আলাদা। সাধারণভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের সহায়ক অংশ নিজস্ব পা ব্যবহার করে স্থলভাগ বা সমুদ্রে ভাসমান জাহাজের ওপর নেমে আসে। কিন্তু লং মার্চ-১০বি রকেটের সহায়ক অংশে চারটি বিশেষ আঁকড়ে ধরার ব্যবস্থা রয়েছে। নিচে নামার সময় এগুলো সমুদ্রের মঞ্চে স্থাপিত জালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রকেটটিকে নিরাপদে থামায়।
চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জালভিত্তিক এই ব্যবস্থা রকেটের গঠনকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে। এতে রকেটের নিজস্ব ওজন কমানো যায় এবং বেশি ওজনের উপগ্রহ বা অন্য সরঞ্জাম বহন করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি অবতরণের স্থান সামান্য এদিক-ওদিক হলেও বিস্তৃত জাল রকেটটি ধরতে পারে। ফলে পুনরুদ্ধারের সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিশ্বে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট ব্যবহারে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। সেখানে একই রকেটের সহায়ক অংশ বহুবার ব্যবহার করে মহাকাশে উপগ্রহ ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠানো হয়। এতে প্রতিটি উৎক্ষেপণের ব্যয় অনেক কমে আসে। রকেটের সহায়ক অংশে শক্তিশালী ইঞ্জিন ও ব্যয়বহুল যন্ত্রাংশ থাকায় এটিই সাধারণত পুরো রকেটের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।
চীন প্রায় এক দশক ধরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। শুরুতে কম উচ্চতায় ওঠানামার পরীক্ষা চালানো হয়। পরে কক্ষপথে পৌঁছাতে সক্ষম রকেটের সহায়ক অংশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়। এর আগে কয়েকটি পরীক্ষায় শেষ মুহূর্তের অবতরণ ও পুনরুদ্ধার ধাপ সফল হয়নি।
চীনের সরকারি ও বেসরকারি উভয় মহাকাশ প্রতিষ্ঠানই এখন এই প্রযুক্তি অর্জনের জন্য কাজ করছে। দেশটির বৃহৎ উপগ্রহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট চালু হলে অল্প সময়ে বেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ এবং মোট ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
লং মার্চ-১০ রকেট পরিবার চীনের ভবিষ্যৎ মানুষবাহী চন্দ্র অভিযানের সঙ্গেও যুক্ত। দেশটি ২০৩০ সালের আগেই চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তাই লং মার্চ-১০বি রকেটের এই পরীক্ষা ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।