কোষের মৃত্যুরও আছে বহু পথ, চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা স্বাস্থ্য ডেস্ক : দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানবদেহে প্রতিদিন কোটি কোটি কোষের মৃত্যু ঘটে। তাদের মতে, কোষ প্রধানত দুইভাবে মারা যায়-দুর্ঘটনাজনিত নেক্রোসিস এবং নিয়ন্ত্রিত বা কর্মসূচিবদ্ধ অ্যাপোপটোসিস। কিন্তু আধুনিক গবেষণা সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০টির মতো নতুন ধরনের কোষমৃত্যুর প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছেন। এসব আবিষ্কার ক্যান্সার থেকে শুরু করে প্রদাহজনিত ও স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোষজীববিজ্ঞানী দাওলিন ট্যাং ও তাঁর সহকর্মীরা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে-এমন রাসায়নিক খুঁজতে গিয়ে একটি নতুন ধরনের কোষমৃত্যুর সন্ধান পান। তাঁরা দেখতে পান, কিছু কোষের ভেতরের পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে ক্ষারীয় হয়ে যাওয়ার কারণে কোষগুলো মারা যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘অ্যালকালিপটোসিস’। গবেষকদের মতে, কোষের অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের নতুন কৌশল তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। জিন সম্পাদনা, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অণুবীক্ষণ এবং কোষের জিন ও প্রোটিন বিশ্লেষণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা আরও বিভিন্ন ধরনের কোষমৃত্যু শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রদাহ সৃষ্টি করা পাইরোপটোসিস, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা নেক্রোপটোসিস এবং লোহার প্রভাবে কোষের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ফেরোপটোসিস। ২০২৫ সালেই অন্তত চারটি নতুন ধরনের কোষমৃত্যু চিহ্নিত হয়। সম্প্রতি চ্যাপ্টা কৃমির বিশেষ কোষকে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে বিস্ফোরিত হতে দেখা গেছে; এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাপটোসিস’। কোন উপায়ে একটি কোষ মারা যাচ্ছে, সেটিও শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মৃত বা মৃত্যুপথযাত্রী কোষ আশপাশের কোষকে বিভিন্ন সংকেত পাঠাতে পারে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে এবং টিস্যুর আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। জীবাণু আক্রান্ত কোনো কোষ কখনো নিজেই ধ্বংস হয়ে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করে। ফলে কোষমৃত্যু শরীরের বৃদ্ধি, বিপাক ও রোগপ্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, কোষের মৃত্যু শুরু হলেই সেটি সব সময় অপরিবর্তনীয় নয়। ২০০৭ সালে গবেষকেরা অ্যাপোপটোসিস শুরু হওয়া কিছু কোষ থেকে মৃত্যুউদ্দীপক পদার্থ সরিয়ে দিলে সেগুলোর অনেকটিই আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই আশ্চর্য প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘অ্যানাস্টাসিস’, যার অর্থ ‘পুনরুজ্জীবিত হওয়া’। পরবর্তীতে ফেরোপটোসিস ও নেক্রোপটোসিসের ক্ষেত্রেও এমন ফিরে আসার ঘটনা দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা এখন এসব মৃত্যুপথকে চিকিৎসায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। লক্ষ্য হচ্ছে ক্যান্সার কোষকে নির্দিষ্টভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া, অতিরিক্ত প্রদাহ কমানো এবং হৃদ্যন্ত্র বা মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা। নতুন গবেষণা তাই দেখাচ্ছে, কোষের মৃত্যু শুধু জীবনের সমাপ্তি নয়; কখন, কেন এবং কীভাবে একটি কোষ মারা যায়, তার ওপর পুরো জীবদেহের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..