প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন বাতিলের দাবি
একতা প্রতিবেদক :
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর নিবর্তনমূলক ও গণবিরোধী ধারাসমূহ অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য।
একই সঙ্গে সারাদেশে ব্যাপক হারে শিশু নিখোঁজের সংবাদ, কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতীমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নানা অনিয়মের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের এই মোর্চা।
এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মত ও দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহ। অথচ প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় এমন কিছু বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক ক্ষমতা দিতে পারে। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য মনে করে, এ ধরনের বিধান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও পরবর্তী সাইবার সুরক্ষা আইনের নিবর্তনমূলক আইনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলেও অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকারের কোনো কর্মকর্তা কোনো তথ্যকে ‘যাচাই করা হয়নি’, ‘ভুল তথ্য’ বা ‘গুজব’ হিসেবে বিবেচনা করলেই যদি তা অপরাধের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর ভয় ও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খসড়ার বিভিন্ন ধারায় আদালতের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট ব্লক কিংবা অপসারণের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতৃবৃন্দ।
জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ, অপরাধে উসকানি কিংবা মানহানির মতো বিস্তৃত ও অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে কনটেন্ট অপসারণের সুযোগ থাকলে তার অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যেকোনো বিধিনিষেধ সুনির্দিষ্ট, আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং সর্বনিম্ন-সীমিত পদ্ধতিতে প্রয়োগের আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গেও এ ধরনের বিধান সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ‘অবমাননাকর’, ‘ভীতিকর’, ‘বুলিং’ কিংবা ‘মানহানিকর’-এ ধরনের অস্পষ্ট ও ব্যক্তির ইচ্ছানির্ভর সংজ্ঞা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বিচার ক্ষমতার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কারও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা হয়রানির শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সম্পাদিত বা সৃষ্ট কনটেন্টের সংজ্ঞা যথেষ্ট সুস্পষ্ট না হলে ব্যঙ্গচিত্র, কার্টুন, শিল্পকর্ম ও সৃজনশীল অভিব্যক্তিও আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সরকারের সমালোচনা, ব্যঙ্গ বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে অপরাধমূলক কনটেন্টকে এক করে দেখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মতপ্রকাশ-সংক্রান্ত অপরাধে গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার বিষয়েও নেতৃবৃন্দ সতর্ক করে বলেন, মতপ্রকাশের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে নির্বিচার গ্রেপ্তারের সুযোগ নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না, তার বিচারিক মূল্যায়নের সুযোগ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিবর্তনমূলক আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হয়রানি ও নিপীড়নের যে অভিজ্ঞতা দেশের মানুষ অর্জন করেছে, তার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং যেসব গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেগুলোর সুরক্ষাকবচ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, নিবর্তনমূলক সাইবার আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের যূথবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। অতএব জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, এমন কোনো আইন প্রণয়ন না করতে সরকারের কাছে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিতর্কিত ও নিবর্তনমূলক ধারাসমূহ বাতিল করে সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অধিকারসম্মত ও জনবান্ধব আইন প্রণয়ন করতে হবে।
দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজের ধারাবাহিক সংবাদ এবং কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতীমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ছয় মাসে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ জনমনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান এবং অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে। হত্যা, গুম, অপহরণ ও সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানের ঘটনাতেও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাধীন দেশে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। দেশের কোথাও যেন আর কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অন্যায়ভাবে বন্ধ, বাধাগ্রস্ত বা নিয়ন্ত্রিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের দাবি করে নেতৃবৃন্দ বলেন, শিল্প-সংস্কৃতির জাতীয় প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র হতে পারে না। একাডেমির অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং অতীতে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।
সম্প্রতি ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এ ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত করা যাবে না। এসব সংগ্রামের স্মারক, দলিল ও ঐতিহাসিক উপাদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য মনে করে, একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজ নির্মাণের পথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ চর্চা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে সেই অধিকারগুলোর রক্ষক হিসেবেই ভূমিকা পালন করতে হবে, নিয়ন্ত্রক বা নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে নয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লালটু, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের কোষাধ্যক্ষ দীনবন্ধু দাশ, গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের সমন্বয়ক জাকির হোসেন, সমাজচিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক কামাল হোসেন বাদল, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের সমন্বয়ক বিমল কান্তি দাশ, সংগঠক রঘু অভিজিৎ রায়, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. হারুনুর রশীদ, বাংলাদেশ থিয়েটারের দলপ্রধান খন্দকার শাহ আলম, বাংলাদেশ মাইম এসোসিয়েশনের সভাপতি ম. আবু হারুন টিটো, সংজোয়ারের সাধারণ সম্পাদক অংকন চাকমা, উদীচীর সহ-সাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান, চারণের সহ-সভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া এবং বিবর্তনের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুন নূজহাত মনীষা, বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের সম্পাদক ইনজামাম প্রমুখ।
প্রথম পাতা
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও বিপুল প্রাণহানির দায় সরকারের
জাতিসংঘে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের নিন্দা সিপিবির
‘আমরা তো আমরণ প্রগতির পক্ষে, গড়বই বিশ্বতো সাম্যের’
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা শ্রেয়
সার সংকটসহ কৃষকের সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে হবে
ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীসহ মিথ্যা মামলায় বন্দি তিন কিশোরের মুক্তি দাবি
বহু পাক্ষিক উদ্যোগ ছাড়া বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন