
ছড়া, গল্প, গান, কবিতা ও নাটকের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের কল্পনা, মানবিকতা ও সমাজচেতনার বিকাশে দীর্ঘকাল কাজ করে আসা মানুষটির নাম আখতার হুসেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের শব্দসংগ্রামী এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম নিবেদিতপ্রাণ এই কর্মী গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় আখতার হুসেনের মরদেহ। এ সময় ফুল দিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন।
স্মৃতিচারণ করে সেখানে প্রয়াতের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন বলেন, “আমার বাবা একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। আমার বাবা একদিন রাতে খালি গায়ে বাসায় ফিরেছেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা খালি গায়ে কেন?’ তিনি বললেন, ‘পথে এক ছেলেকে দেখেছি, তাকে কয়েকজন মেরে তার শার্ট ছিড়ে দিয়েছে। তাই আমি তাকে শার্টটা দিয়ে এসেছি’। তিনি সবসময় মানুষকে ভালোবাসতেন, সবার ভালো চাইতেন। বাবা শেষবারের মত বলে গিয়েছিলেন, ‘আর কোনো শিল্পী যেন এ কষ্টে না থাকে’। আপনারা শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবেন—আমাদের এই কামনা।”
শহীদ মিনারে শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় আখতার হুসেনকে। এরপর এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেয় পুলিশ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে পাঠানো হয়। সেখানে স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন আখতার হুসেন। তার ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিক সংখ্যক লেখার (ভুক্তি) কৃতিত্বও তার। বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
সাহিত্যে অবদানের জন্য আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
বাংলা একাডেমির ফেলো আখতার হুসেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। সংগঠনটির প্রথম দিকের বহু নাটক রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তিনি। জাতীয় শিশু সংগঠন ‘খেলাঘর আসর’-এর সংগঠক হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আখতার হুসেন।
ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবোই’ এবং খেলাঘরের ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তারই লেখা।
প্রগতিশীল মহলে শোক
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে দেশের বিভিন্ন বাম-প্রগতিশীল সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, খেলাঘর আসর পৃথক বিবৃতিতে শোকবার্তা দিয়েছে।
শোক বিবৃতিতে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, আখতার হুসেন শুধু একজন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক ও নির্মাতা।
বিবৃতিতে বলা হয়, তাঁর প্রয়াণে সিপিবি একজন অকৃত্রিম শুভানুধ্যায়ীকে হারিয়েছে। আখতার হুসেন তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রামে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠক-সংস্কৃতিকর্মীর স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।
কবি আখতার হুসেন রচিত ঐতিহ্যবাহী ছাত্র গণসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীতের অমর পংক্তি— “আমরা তো আমরণ প্রগতির পক্ষে, গড়বই বিশ্বতো সাম্যের” উদ্ধৃত করে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
প্রয়াত আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহযোদ্ধা, সহকর্মী ও অসংখ্য পাঠক-শুভানুধ্যায়ীর প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এক শোক বার্তায় উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম শোক জানান।
অপর এক বিবৃতিতে, আখতার হুসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এক শোকবার্তায় উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
কবি আখতার হুসেনের মৃত্যুতে যুব ইউনিয়ন গভীর শোক করেছে। শোকবার্তায় যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলাম নান্নু বলেন, আখতার হুসেন এদেশের যুবকদের চেতনায় , তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রামে যুগের পর যুগ পাঠক-সংস্কৃতিকর্মীর স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।