কানিজ ফাতেমা ছিলেন আশ্রয় ও আস্থার প্রতীক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক: বিপ্লবী কানিজ ফাতেমা মোহসিনা ছিলেন যেকোনো স্তরের মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় ও আস্থার প্রতীক। যিনি বিপ্লবীদের জন্ম দিয়েছেন, নিজের পুত্রতুল্য জ্ঞান করে স্বস্নেহে বিপ্লবীদের ভরন-পোষণ আপ্যায়ন করেছেন, বছরের পর বছর যিনি মানবমুক্তির আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি মুক্তির আন্দোলনে পর্দার আড়ালে থেকে বিপ্লবকে তরান্বিত করেছেন। বাঙালি বিপ্লবী নারী হিসেবে ভবিষ্যতে যেকোনো আন্দোলনে মুক্তিকামীদের প্রেরণা যোগাতে অন্যন্য হয়ে থাকবেন এই মহিয়সী। শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে কানিজ ফাতেমা মোহসিনার রাজনৈতিক কর্মময় জীবন ও তার আপন ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় বক্তরা এসব কথা বলেন। কানিজ ফাতেমা মোহসিনা স্মরণ কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন, সিপিপি সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি কামাল লোহানী, সাংস্কৃতিক সংগঠক মহসিন শস্ত্রপানি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বহ্নিশিখা জামালী ও কানিজ ফাতেমার জেষ্ঠ্য পুত্র সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, কমরেড আজিজুর রহমান, শ্রমিকনেতা মমিনুল ইসলাম মানিক ও শ্রমিকনেতা হাবিবুর রহমানের পুত্র জাহিদ ইকবাল প্রমুখ। স্মরণসভার প্রথম পর্বে ‘আগুনের পরশমণি ছড়াও প্রাণে’ গানটি পরিবেশ করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করে বিবর্তন শিল্পীগোষ্ঠী। এরপর কানিজ ফাতেমা মোহসিনার সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন কমিটির স্মরণসভা কমিটির সদস্য সচিব মফিজুর রহমান লালটু। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শুধুমাত্র কানিজ ফাতেমাকে স্মরণ করলেই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে না। তিনি যে ধারাটি তৈরি করে রেখে গেছেন বর্তমান প্রজন্মকে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে শ্রেণিহীন বেষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে হবে। তবেই কানিজ ফাতেমার মতো নারীদের কর্মময় জীবন সার্থক হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইতিহাসকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কমিউনিস্টদের। সমাজ বদলের মধ্য দিয়ে নারীকে পুরুষের পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশের বর্তমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে বোরকা ও হিজাব হয়ে উঠেছে আত্মসমর্পণের পতাকা। কানিজ ফাতেমার মতো মানবমুক্তির লক্ষ্যে কর্মযোগী নারীরা যে অবদান রেখে গেছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যাতাকলে পড়ে ইতিহাস তার যথার্থ মূল্য দিচ্ছে না।’ এসময় তিনি সকল বিপ্লবী নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। কমরেড সেলিম কানিজ ফাতেমার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘কানিজ ফাতেমাকে উপলব্দি করা যায় ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসে সৃষ্ট মায়ের চরিত্রের মধ্য দিয়ে। যিনি অসংখ্য বিপ্লবীর জন্ম দিয়েছেন, আন্দোলনে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছেন। কমরেডদের তিনি সবসময়ই নিজের সন্তানদের মতো করে আপন করে নিতেন।’ সেলিম আরো বলেন, ‘রাজনীতি করতে এসে অতীতে অনেক কার্ড হোল্ডাররাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু নন কার্ড হোল্ডারদের মধ্যেও এমন অনেকেই আছেন যারা সরাসরি পার্টির সঙ্গে যুক্ত না হয়েও মানবমুক্তির আন্দোলনে গুরুত্বপূণ অবদান রেখেছেন। আমরা তাদের সেই অবদান ও ত্যাগকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে পারি না। নেতা যেমন পার্টিকে রিপ্লেস করতে পারে না, ঠিক তেমনি পার্টিও কখনো শ্রেণিকে রিপ্লেস করতে পারে না। কানিজ ফাতেমার মতো নারীরা যুগে যুগে বিপ্লবের নেপথ্যে থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক আন্দোলনে শক্তি যুগিয়েছেন। রাজনীতিতে যে কোনো পন্থির লোককেই তিনি সমানভাবে গ্রহণ করতেন।’ শোষিতের মুক্তির আন্দোলনে নিশানা যেহেতু এক তাই নিশানকেও এক করার আহ্বান জানান সিপিবি সভাপতি। উদীচীর সভাপতি কামাল লোহানী বলেন, ‘আজকের যে বিপন্ন অবস্থা, সঠিক ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেয়ার যে অপপ্রয়াস তার বিরুদ্ধে কানিজ ফাতেমার মতো বাঙলার ঘরে ঘরে মায়েদের বোনেদের জেগে উঠতে হবে। প্রতিরোধ গড়তে হবে অপশক্তির বিরুদ্ধে। আজ রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানী কিংবা শের-ই বাংলার নাম খুব একটা উচ্চারিত হচ্ছে না। প্রতিবাদ হচ্ছে ক্ষীণ কণ্ঠে।’ তিনি বলেন, ‘৬০-এর দশকে সারা দেশ যখন শ্রকিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে উত্তাল কানিজ ফাতেমা তখন টঙ্গীর আন্দোলনরত শ্রমিকদের জন্য নিজ হাতে ভাত রান্না করে নিয়ে যেতেন। ১৯৬৭ সালে ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রস্তুতির সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল কানিজ ফাতেমার সার্কিট হাউজের বাসার দোতলায়। নৃত্যনাট্য, গণসঙ্গীতের নিয়মিত রিহার্সালে প্রায় ৪০-৫০ জন মানুষকে বিরামহীনভাবে সেবা আশ্রয় দিয়েছেন কানিজ ফাতেমা। সুরকার আলতাব মাহমুদসহ সে সময় অনেকেই কানিজ ফাতেমার সাহচর্য পেয়েছিলেন।’ হায়দার আকবর খান রনো মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার মা সম্পর্কে আমি আর কি বলবো। তবে একটি কথা বলতে পারি, তিনি ছিলেন একজন বাঙালি নারী। শাশ্বত বাঙালি নারীর সব গুণ ছিল তাঁর ভেতর।’ ৬০-এর দশকের টঙ্গী শ্রমিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করে সব রাজনৈতক বিভাজন দূর করার মধ্য দিয়ে আবারো বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এসময় কানিজ ফাতেমাসহ দেশের অগণিত বিপ্লবী নারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাদের দেখানো পথ ধরে বর্তমান প্রজন্মকে বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা বলেন মহসিন শস্ত্রপানি। কানিজ ফাতিমার পরিবারের পক্ষ থেকে তার নাতনি (হায়দার আকবর খান রনো’র কন্যা) অনন্যা লাবনী পুতুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাদের বাড়িটি যেমন ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যাওয়া-আসার প্রধান কেন্দ্রস্থল, তেমনি ছিল যুথবদ্ধতায় ঘেরা। আমার নানি কানিজ ফাতেমা ছিলেন একজন বিজ্ঞানমনস্ক, সংস্কারমুক্ত, সংস্কৃতিবান আধুনিক নারী।’ এসময় সংগ্রামী নারী কমরেড মণিকা মতিন বলেন, ‘কানিজ ফাতেমা তার সন্তানদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক জ্ঞানের দীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। বৈষয়িক উন্নতির কথা না ভেবে অত্যন্ত সচেতনভাবে তিনি নিজ সন্তানদের রাজনীতিতে যুক্ত করেছিলেন।’ এ সময় নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরে নিজের মাকেও মহিয়সী বলে আখ্যা দেন তিনি। মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় স্মরণসভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, নারীনেতৃ দীপা দত্ত, কমরেড আব্দুস সাত্তার, কমরেড সাইফুল হক, কমরেড রজতি হুদা, কমরেড সামসুজ্জামান মিলনসহ রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..