মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে ইরানের কৌশল

মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

কূটনৈতিক একঘরে দশা, অর্থনৈতিক অবরোধ আর সামরিক আক্রমণের ধাক্কা সামলে অবশেষে ইরান তার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা সেই যুদ্ধে টিকে গেছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এখন তেহরানের দিনগুলো বেশ ভালোই যাচ্ছে বলা যায়। ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস এবং সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বোমাবর্ষণ করলেও তা মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়। উল্টো, যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে তেহরান এখন আরও শক্তিশালী। তারা হরমুজ প্রণালি দখল করে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এখন আকাশচুম্বী। প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন কমছে এবং ওয়াশিংটনের ওপর আন্তর্জাতিক ক্ষোভ বাড়ছে। তাই বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান আগামী বছরজুড়ে এই একই কৌশল ধরে রাখবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে টিকে থাকায় ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সাফল্য ও বিজয়ের বড়াই করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা উদ্বিগ্ন। কারণ তাঁরা জানেন, ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর মতো অনেক পথ ও অস্ত্র এখনো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভাবতে পারে যে ইরানের ভয়কে কাজে লাগিয়ে চাপ দিয়ে তাদের নতি স্বীকার করানো যাবে। কিন্তু এতে তেহরানের আসল মনোভাব ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যুদ্ধে স্বজন ও সহকর্মীদের হারিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন আরও কঠোর। শত্রুকে চিরতরে পরাস্ত করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান এখন প্রতিনিয়ত সংঘাত বাড়ানো এবং আক্রমণাত্মক থাকার কৌশল নিয়েছে। তেহরান কোনো সমঝোতায় তো যাবেই না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনীতি ধ্বংস ও জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। সেই সঙ্গে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়ানো, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালানো, এমনকি প্রতিবেশীদের ওপর পদাতিক হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি দখলের চেষ্টাও তাদের কৌশলে রয়েছে। দুটি পক্ষই যদি সাময়িক চুক্তিতে পৌঁছায়, তবু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ তেহরানের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন সময় নিয়ে শক্তি গুছিয়ে আবার আক্রমণ করবে। তাই মার্কিন উসকানির জবাব দিতে বা উসকানি ছাড়াই হামলা চালাতে তারা প্রস্তুত। সহজ কথায়, তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকাকে ওয়াশিংটনের জন্য এতটাই যন্ত্রণাদায়ক করা, যাতে তারা সৈন্য প্রত্যাহার করতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে এবং তেহরানকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। হামলা শুরুর সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সর্বোচ্চ নেতা খামেনির বাসভবনে বৈঠকে ছিলেন। আরাগচি যখন পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের আশঙ্কার কথা জানিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ব্রিফ করছিলেন, ঠিক তখনই ওপর থেকে বোমাবর্ষণ শুরু হয়। প্রথম দফাতেই খামেনির বাসভবনে হামলায় সর্বোচ্চ নেতাসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে আরাগচি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ধূলিমলিন অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে তিনি একটি চলন্ত গাড়িতে উঠে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। সেখানে গিয়েই তিনি সামরিক কমান্ডার ও বিদেশি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং বেঁচে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও দ্রুত তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হতে পারে—এমন পরিস্থিতির প্রস্তুতি তেহরানের আগেই ছিল। সরকার আগের বছর থেকেই প্রশাসনিক ও সামরিক বিকেন্দ্রীকরণ করে রেখেছিল, যাতে কেন্দ্র ছাড়াই গভর্নর ও কমান্ডাররা কাজ চালাতে পারেন। এ ছাড়া প্রতিটি জ্যেষ্ঠ পদের জন্য অন্তত দুজন করে উত্তরসূরি ঠিক করা ছিল, যাতে কোনো নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি না হয়। ইসলামিক রিপাবলিকের নেতৃত্বের বিশ্বাস, ট্রাম্প প্রশাসনের কথাবার্তা ও পদক্ষেপই ইরানের জনগণকে সরকারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাদের দাবি, অনেক বিদেশি সরকার গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখে ইরানের এই প্রতিরোধকে তারা শ্রদ্ধা করে। বিদ্যুৎ ও পরিবহনের মতো বেসামরিক অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা ইরানি অভিজাতদের ক্ষিপ্ত করে তোলে, যা তাদের শত্রুভাবাপন্নতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা নিশ্চিত হয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেবল তাদের সরকার ধ্বংস করতে চায় না, বরং পুরো ইরান রাষ্ট্রটিকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। ফলে তেহরান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। মোজতবা খামেনি নিহত ব্যক্তিদের স্থলে কঠোরপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে আক্রমণাত্মক অভিযানের নির্দেশ দেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মহসেন রেজাই ঘোষণা করেন, মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি তারা এবার মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পদ ও তেল কোম্পানিতেও আঘাত হানবেন। শাসনগোষ্ঠীর এই নতুন কৌশলের উদ্দেশ্য কেবল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা অবকাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া। এ জন্য ইরানের কৌশল হচ্ছে, বড় সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে সীমিত হামলার মাধ্যমে শত্রুর শক্তি কমানো হয়। তেহরানের আশা, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র একসময় নিজেদের ও মিত্রদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে। ইরানের নেতারা নিজেদের কৌশলের ফলাফলে বেশ সন্তুষ্ট। তাঁদের বিশ্বাস, অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ব্যাপক বাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা সীমিত করেছে এবং সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমাতে বাধ্য হয়েছে। তবে ইরানি অভিজাতরা নিজেদের চূড়ান্ত বিজয়ী মনে করেন না। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইসলামিক রিপাবলিকের পতন আসন্ন বলে দাবি করে আসছেন। সামরিক শক্তিমত্তা দেখানোর পরও তাঁরা ইরানকে দুর্বল হিসেবেই তুলে ধরছেন। তেহরানের দৃষ্টিতে বাস্তবতার সঙ্গে শত্রুদের এই ভুল ধারণার ফারাক অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইরানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন যদি মনে করে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা বা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভেই তাদের পতন হবে, তবে তারা চাপ দেওয়া থামাবে না। অতীতে কিছু ইরানি নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আশা করলেও, এখন শাসকগোষ্ঠীর কেউই তা আর বিশ্বাস করে না। তারা নিশ্চিত যে ওয়াশিংটন কখনোই সততার সঙ্গে চুক্তি মানবে না। এর প্রমাণ হিসেবে তারা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বেরিয়ে যাওয়াকে দেখে। এমনকি ২০২৫ সালের জুন ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি—দুইবারই আলোচনার টেবিলে বসা অবস্থাতেই মার্কিন হামলার শিকার হয় ইরান। ইরানি শাসকগোষ্ঠী এটাও আশঙ্কা করছে যে তাদের এই সুবিধাজনক অবস্থান চিরস্থায়ী হবে না। পর্যাপ্ত সময় পেলে বিশ্ব অর্থনীতি পারস্য উপসাগরের বিকল্প রুট খুঁজে নিতে পারে, ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের যে অর্থনৈতিক সুযোগ ইরানের হাতে আছে, তা কার্যকারিতা হারাবে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের অবস্থান দিন দিন আরও শক্তিশালী হতে পারে। ইরানি নেতাদের মতে, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় রিপাবলিকানদের জয়ের স্বার্থে এবং যুদ্ধ মার্কিন জনমতে অপ্রিয় হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সংযত আছেন। তবে নির্বাচন পার হয়ে গেলে তাঁকে আর জনমত নিয়ে ভাবতে হবে না। তেহরান ২০২৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের আশা করলেও তাতে লাভ দেখছে না। একজন নরমপন্থী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হতে পারেন; কারণ তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নত করে বিশ্বজুড়ে ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলতে বেশি সক্ষম হবেন। তাই ইরানি শাসনগোষ্ঠী হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এখনই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করবে। প্রথমত, সরকার পারস্য উপসাগর থেকে গ্যাস ও তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারে। তেহরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ অচল করলেও কিছু উপসাগরীয় দেশ এখনো ভারত মহাসাগর বা লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পাঠাতে পারছে। তেহরান সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপটি নিতে পারে, যা আমেরিকা ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছেন এবং ঠেকানোর চেষ্টা করছেন: পারমাণবিক বোমা তৈরি। নেতারা যদি মনে করেন মার্কিন হামলা ঠেকানোর এটিই একমাত্র পথ, তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তটিকেই তারা সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে বেছে নিতে পারেন। এই রুটগুলো পুরোপুরি অচল করতে ইরান তাদের তেল উৎপাদন কেন্দ্র ও সমুদ্রবন্দরে সরাসরি হামলা চালাতে পারে। পাশাপাশি, তারা ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের সঙ্গে মিলে লোহিত সাগরে জাহাজে আক্রমণের হুমকি দিয়ে সেই পথও বন্ধ করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইরান তার প্রত্যক্ষ শত্রুদের ওপর আক্রমণ আরও তীব্র করতে পারে। এর অর্থ হতে পারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো কিংবা মার্কিন বেসামরিক অবকাঠামোয় সাইবার হামলা করা। পুনরায় আক্রমণ হলে, ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপেয় পানি শোধনকেন্দ্রগুলোর মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। সর্বশেষ, তেহরান মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার পুরোনো কৌশলে ফিরে যেতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ইসলামিক রিপাবলিক ও তাদের লেবানিজ শিয়া মিত্ররা ইউরোপে ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা এবং বোমা হামলায় শত শত মার্কিন ও ফরাসি সেনাকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছিল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..