
একতা স্বাস্থ্য ডেস্ক :
হৃদরোগ, কিডনির অসুস্থতা, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসকে এতদিন পৃথক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখন এগুলোকে একই রোগচক্রের অংশ হিসেবে দেখছেন। নতুন এক সমীক্ষা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হৃদযন্ত্র-কিডনি-বিপাকীয় জটিলতার কোনো না কোনো পর্যায়ে রয়েছেন। অথচ তাদের অধিকাংশই এই রোগচক্রের নাম বা প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত নন।
২০২৩ সালে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রথম এই জটিল রোগচক্রের আনুষ্ঠানিক নাম দেয়। এতে হৃদযন্ত্রের রোগ, কিডনির দুর্বলতা এবং বিপাকীয় সমস্যাগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনো একক রোগ নয়। বরং শরীরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও ব্যবস্থার মধ্যে তৈরি হওয়া পারস্পরিক ক্ষতিকর সম্পর্ক।
অতিরিক্ত মেদ, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি, ক্ষতিকর চর্বির আধিক্য এবং কিডনির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া-এসব সমস্যা একে অপরকে আরও তীব্র করে তোলে। একটি সমস্যা শুরু হলে সেটি ধীরে ধীরে অন্য সমস্যাগুলোকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে রোগী হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়া, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
চিকিৎসকেরা রোগটির তীব্রতা অনুযায়ী এটিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছেন। প্রাথমিক ধাপে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে। বিশেষ করে কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ জমা হলে ভবিষ্যতে বিপাকীয় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
পরবর্তী ধাপে রক্তে একধরনের ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে। এ পর্যায়ে রোগীর শরীরে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, রক্তচাপ পরিমাপ এবং কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে সমস্যাটি শনাক্ত হতে পারে।
তৃতীয় ধাপে রোগীর হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিতে নীরবে ক্ষতি শুরু হয়। ধমনির ভেতরে চর্বি জমা, হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া অথবা আগামী কয়েক বছরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। উপসর্গ না থাকলেও এ অবস্থাকে গুরুতর সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
চূড়ান্ত ধাপে রোগী হৃদরোগ, হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়া বা হৃৎপিণ্ডের ধমনির রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে কিডনির রোগ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন ও রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এতে কিডনির সূক্ষ¥ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল যথাযথভাবে অপসারণ করতে পারে না। শরীরে তরল জমে গেলে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। এর ফলে রক্তচাপ আরও বেড়ে যায়। এভাবে হৃদযন্ত্র ও কিডনির মধ্যে একটি ক্ষতিকর চক্র সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাপনও এই রোগচক্রের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। অস্বাস্থ্যকর খাবার, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, কম ঘুম, পরিবেশদূষণ, মানসিক চাপ এবং তামাক ব্যবহার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে আক্রান্ত সবাইকে ওষুধ খেতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে জীবনযাপনে পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থা। চিকিৎসকেরা শাকসবজি, ফল, মাছ, ডাল, বাদাম ও পরিমিত স্বাস্থ্যকর তেলসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
রোগের মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও চর্বি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়া হতে পারে। বর্তমানে এমন কিছু আধুনিক ওষুধও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একই সঙ্গে রক্তে শর্করা কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, হৃদযন্ত্র সুরক্ষা এবং কিডনির ক্ষতি ধীর করতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও বিপাকীয় সমস্যাকে আলাদা করে না দেখে একই রোগচক্র হিসেবে চিকিৎসা করলে গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।