চাঁদের অপর পাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরল আর্টেমিস ২

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : মানুষকে পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়া নাসার আর্টেমিস-২ মিশেনের মহাকাশযান নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। সুস্থ আছেন মহাকাশযানে থাকা চার নভোচারীও। চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণে ১০ দিনের অভিযান শেষে ১১ এপ্রিল ভোরে নভোচারীদের বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযানটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। এর মাধ্যমে ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদকে প্রদক্ষিণ করল। এই মিশনের নভোচারীরা হলেন, রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার জেরেমি হ্যানসেন ও ক্রিস্টিনা কোচ। ২ এপ্রিল ফ্লোরিডায় মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্থানীয় সফর শুরু করা ওরিয়ন নভোযানটি পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া ও আসার যাত্রায় মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে। এর আগে ১৯৭০ সালের এপ্রিলে নাসার অ্যাপোলো-১৩ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন। ওই সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে ভ্রমণ করেছিলেন। আর্টেমিস-২ এর মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানিয়েছেন, তিনিসহ ক্রু সদস্য ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন সবাই ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক’ আছেন। নাসার লাইভস্ট্রিমে তাদের ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করার সময় পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা রব নাভিয়াস বলেন, ‘তারা চমৎকার শারীরিক অবস্থায় আছেন। বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় চরম উত্তেজনার মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্য ওরিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এরপর ওয়াইজম্যানের কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই কন্ট্রোল রুমে স্বস্তি ফিরে আসে। এছাড়া এই সফরকে একটি ‘নিখুঁত মিশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান। তিনি বলেন, ‘আমরা আবারও চাঁদে নভোচারী পাঠানোর ধারায় ফিরে এসেছি। আর এটি কেবল শুরু।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৮ সালে চাঁদে পা রাখা এবং সেখানে আমাদের ঘাঁটি তৈরির আগ পর্যন্ত আমরা এখন নিয়মিত বিরতিতে এই মিশনগুলো চালিয়ে যাব।’ উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত এই অভিযানে সময় লেগেছে ৯ দিন ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। তবে নাসা এটিকে ১০ দিনের মিশন হিসেবেই গণ্য করছে। পুরো অভিযানটি ছিল অসংখ্য রেকর্ড ও অনন্য সব মুহূর্তে ঘেরা। এই চার নভোচারী পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে ভ্রমণ করেছেন, যা মানব ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড। গভীর মহাকাশে ছুটে চলা এবং চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার সময় নভোচারীরা হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। তাদের সেই অসাধারণ ছবিগুলো পৃথিবীবাসীকে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া তারা মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ এবং চাঁদের বুকে উল্কাপাতের বিরল দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেছেন, যা নাসার বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে। এই সফরের বেশ কিছু অনন্য অর্জন রয়েছে। ভিক্টর গ্লোভার ছিলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি যিনি চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন। ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী হিসেবে এই অর্জন গড়েছেন। এবং কানাডীয় জেরেমি হ্যানসেন ছিলেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক যিনি এই গৌরবের অংশীদার হলেন। অভিযানকালে নভোচারীরা হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। তাঁরা সূর্যগ্রহণ ও চাঁদের পৃষ্ঠে উল্কাপাতের বিরল দৃশ্য দেখেছেন। চাঁদে মানুষের টেকসই উপস্থিতি বজায় রাখতে নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির মধ্যে, এটিই হলো প্রথম মানববাহী মিশন। কর্মসূচির এই দ্বিতীয় ধাপের মূল লক্ষ্য ছিল ওরিয়ন ক্যাপসুলের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা, যা এর আগে কখনও মানুষ বহন করেনি। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি সেই অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা পাশ করেছে। ২০২২ সালে আর্টেমিস ১-এর মনুষ্যবিহীন পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে হিট শিল্ডটি অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই এবার ঝুঁকি কমাতে নাসা অবতরণের পথ কিছুটা পরিবর্তন করেছিল। নভোচারীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবার অপেক্ষাকৃত খাড়া ও সংক্ষিপ্ত পথে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়, যাতে ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। পৃথিবীতে ফেরার পথে মহাকাশযানটি শব্দের চেয়ে ৩০ গুণেরও বেশি গতিতে ছুটছিল। এ সময় যানটির চারপাশের তাপমাত্রা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি ছিল মূলত যানটির হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা কবচের একটি বড় পরীক্ষা। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি এখন নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা হবে। অভিযানের সাফল্যের পরে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযানের নভোচারীরা। নাসা আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মহাকাশে পৃথিবীকে একটি ‘লাইফবোট’-এর মতো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখার কথা জানিয়ে গ্রহটিতে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও জেরেমি হ্যানসেনের পাশে দাঁড়িয়ে নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ পৃথিবীর মানুষের প্রতি অভিন্ন মানবতাকে গ্রহণ করার আহ্বান জানান। ক্রিস্টিনা বলেন, ‘আমাকে শুধু পৃথিবী নয়, এর চারপাশের অন্ধকারটাই বেশি বিস্মিত করেছে। সেই অন্ধকারে পৃথিবী ছিল নিঃশব্দে ঝুলে থাকা একটি লাইফবোট।’ কানাডার নভোচারী হ্যানসেন আর্টেমিস-২ অভিযানের ভক্তদের প্রতি আহ্বান জানান, তাঁরা যেন চার সদস্যের ক্রুর মধ্যে নিজেদের প্রতিফলন দেখেন। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘আর্টেমিস-২ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা আবার চাঁদকে নতুনভাবে দেখেছি। শৈশবের স্বপ্ন বাস্তব অভিযানে রূপ নিল। আপনারা বিশ্বকে আবার বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন, যা কেউ কখনো ভুলবে না।’ আর্টেমিস-২ নাসার সেই কর্মসূচির প্রথম মানববাহী মিশন, যার লক্ষ্য চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলা। ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের জন্য চাঁদে একটি ঘাঁটি তৈরি করা। নাসা আশা করছে, ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে আবার মানুষের পা রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..