ব্যাটারিচালিত রিকশা : সংগ্রাম ও উত্তরণের পথরেখা

আরিফুল ইসলাম নাদিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশের নগরায়ন ও পরিবহন ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অথচ বিতর্কিত অধ্যায় হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা। গত দুই দশকে এটি দেশের শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য যাতায়াতের বাহন হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ঘাটতি, পুঁজিপতিদের লোলুপ দৃষ্টি এবং ধনিক-লুটেরাদের স্বার্থনির্ভর নগর পরিকল্পনার কারণে এই খাত আজ এখন এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ফলে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংকট কেবল যান্ত্রিক বা অবকাঠামোগত নয়, বরং এটি এক জটিল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিবর্তন ও পশু-শ্রমের মুক্তি প্যাডেল থেকে ব্যাটারি প্রযুক্তির বিকাশ মানুষের কায়িক শ্রম লাঘবের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় ধাপ। প্যাডেলচালিত রিকশা চালানো ছিল একধরনের মধ্যযুগীয়, অমানবিক শ্রমব্যবস্থা–যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। এই দাসপ্রথাসদৃশ শ্রম থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্ম দিয়েছে। এই রূপান্তর ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এবং শ্রমিকদের নিজস্ব অর্থায়নে। কোনো সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই তাঁরা ব্যাটারি ও মোটর সংযোজন করে নিজেদের শ্রম লাঘব করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে স্বাগত না জানিয়ে বরং একে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে শ্রমিকদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারিগরি সংকট : একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নকশা ও নিরাপত্তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ব্যাটারিচালিত রিকশার সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এর নিরাপত্তা ও ব্রেকিং সিস্টেম। কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর কাঠামোয় কিছু মৌলিক ত্রুটি রয়েছে- ১) ভারসাম্যহীন চ্যাসিস : প্রাথমিকভাবে প্যাডেল রিকশার কাঠামোর ওপর মোটর বসিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়। কম খরচে নির্মাণ সম্ভব হলেও, উচ্চগতিতে এই হালকা কাঠামো ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না। ২) ব্রেকিং সিস্টেম : সাধারণ রিকশার ব্রেক উচ্চগতির মোটরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে জরুরি মুহূর্তে ব্রেক করলে রিকশা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ৩) চাকার স্থায়িত্ব : চিকন টায়ার অধিক গতি ও ওজন সহ্য করতে না পেরে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত বা ফেটে যায়। এছাড়াও লুকিং গ্লাস ও ইন্ডিকেটরের অভাবে লেন পরিবর্তনের সময় ঝুঁকি বাড়ে। সমাধান : এই রিকশাগুলোকে নিষিদ্ধ না করে, বুয়েট বা রাষ্ট্রীয় প্রকৌশল সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দেশের সড়ক উপযোগিতা বিবেচলায় একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড ডিজাইন’ তৈরি করা জরুরি। কিন্তু ধনিক শ্রেণির রাষ্ট্র তা না করে সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে আমদানিকৃত বিলাসবহুল গাড়ি ও এই খাতে বিনিয়োগকৃত বৃহৎ পুঁজির নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা না করে ইতোমধ্যে নিজেদের দায়িত্বে গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলক নিরাপদ ও উন্নত নকশায় ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি করছেন। ভরকেন্দ্র বিবেচনায় চ্যাসিস নির্মাণ, উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম, মোটা টায়ার, লুকিং গ্লাস ও ইন্ডিকেটরের ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁরা ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়েছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শ্রেণিবৈষম্য বাংলাদেশের নগরায়ণের চিত্র কী? বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর মূলত ধনিক শ্রেণির প্রাইভেট কারকেন্দ্রিক। মাত্র ৫% মানুষ প্রাইভেট কার ব্যবহার করলেও, তাঁরা প্রায় ৮০% সড়ক দখল করে রাখে। অন্যদিকে ৯৫% মানুষের বাহন বাস ও রিকশাকে ‘জ্যামের কারণ’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। রিকশা উচ্ছেদের অজুহাতে শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকারও সংকুচিত করা হচ্ছে। বৃহৎ পুঁজির আধিপত্য সাম্প্রতিক সময়ে আকিজ গ্রুপসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর আগ্রাসন এই খাতে নতুন সংকট তৈরি করেছে। এসব শিল্পগোষ্ঠী সাধারণ শ্রমিকের রিকশাকে ‘অবৈধ’ বা ‘অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাজার দখলের চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও গ্যারেজ মালিকদের সরিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের কোম্পানিনির্ভর মজুরে পরিণত করা। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে এমন আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে, যা কেবল করপোরেটের বাহনকেই বৈধতা দেবে। আইনি সংকট ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি আজও ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো সুসংহত আইনি কাঠামো বা বিআরটিএ-র নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এই ‘অবৈধ’ তকমাই দুর্নীতির জন্য একটি সোনার ডিম পাড়া হাঁস। পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। লাইসেন্স না দেওয়ায় রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ এখন দুর্নীতির চক্রে হারিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকরা বৈধতা ও নিয়মতান্ত্রিক ফি দিতে চায়। তাঁরা চায় চাঁদাবাজির অবসান। বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাস্তবতা বনাম বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রচার করা হয় যে, ব্যাটারিচালিত রিকশা বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। বাস্তবে এটা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। গবেষণা ও সরকারি তথ্যে দেখা যায় : > মোট জাতীয় বিদ্যুতের ১.৫%-২% এই খাতে ব্যয় হয়। (সূত্র : মোহাম্মদ হোসাইন, মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল) > চার্জিং হয় মূলত রাতে–অফ পিক আওয়ারে, যখন চাহিদা কম থাকে। ফলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে না। (অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক, সাবেক পরিচালক, বুয়েট-এর দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র) > একটি এসির জন্য যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা দিয়ে ১০-১৫টা রিকশা চার্জ করা সম্ভব। (সূত্র : বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) উপরোক্ত তথ্যসমূহ থেকে স্পষ্ট যে, এটি বিদ্যুৎ অপচয় নয়, বরং দক্ষ ব্যবহার। সোলার চার্জিং ও নির্ধারিত স্টেশন গড়ে তুললে এটি আরও টেকসই হতে পারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (ঈচউ) জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পর্যালোচনায় দেখিয়েছে যে, বিভিন্ন সময় ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত যানগুলো বিদ্যুতের ‘অপচয়’ করছে–এই ধারণাটি ভ্রান্ত। বরং এগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা (টঃরষরঃু) এবং কর্মসংস্থানের তুলনায় বিদ্যুতের ব্যয় খুবই কম। শ্রমিকদের দাবি শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় ধরে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে সুনির্দিষ্ট দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছে। শ্রমিকদের মূল দাবিগুলো হলো : > রিকশার নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স > আইনি বৈধতা ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা। > সরকারি উদ্যোগে রিকশার উন্নত নকশা প্রণয়ণ করা। > রিকশা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। > ডাম্পিং ও ব্যাটারি ছিনতাই বন্ধ করা। > সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। > শ্রমিকের জন্য দুর্ঘটনা বিমা ও সহায়তা তহবিল গঠন করা। > চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করা। উত্তরণের রূপরেখা এই সংকটের সমাধান কেবল প্রযুক্তিগত নয়, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন করার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব। ১) সমবায় মালিকানা : শ্রমিকদের মালিকানা নিশ্চিত করে বৃহৎ পুঁজির একচেটিয়া দখল ঠেকাতে হবে। সেজন্য সমবায়ভিত্তিক মালিকানা (ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরাব ঙহিবৎংযরঢ়) গড়ে তুলতে হবে। ২) গণপরিবহন উন্নয়ন : ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে, বাসভিত্তিক শক্তিশালী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রিকশাকে ফিডার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ৩) মর্যাদা ও অধিকার : রিকশা শ্রমিকদের ‘পরিবহন শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিতে হবে। তাঁদের নাগরিক মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। উপসংহার বাংলাদেশের ব্যাটারিচালিত রিকশা সংকটটি আসলে পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেলের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিফলন। একদিকে বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসন, অন্যদিকে সরকারের উদাসীনতা–এর মাঝে পিষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের জীবন। কারিগরি উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং আইনি স্বীকৃতির সমন্বয়েই সম্ভব টেকসই সমাধান। যুগপোযোগী ন্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনাই পারে এই খাতকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও মানবিক গণপরিবহনে রূপ দিতে। শ্রমজীবী মানুষের চলমান সংগ্রাম সফল না হলে কেবল রিকশা খাত নয়, বরং পুরো নগরায়ন ব্যবস্থা এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখে পড়বে। তাই ‘অবৈধ’ তকমা সরিয়ে রিকশা শ্রমিকদের মানুষের মর্যাদা দেওয়ার এখনই সময়। লেখক : যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..