
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।” কবিগুরু যে প্রবল প্রাণে বৈশাখকে আহ্বান করেছিলেন, সে তো আমাদের বাংলার মানুষের যাপিত জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। বহু বছর আগে মোঘল সম্রাট আকবর ফসলি বছর হিসেবে প্রবর্তন করলেও, প্রকৃতি এর রূপকে ভয়ংকর করতে ছাড়েনি। তাইতো প্রতিবছর বৈশাখের রূদ্ররোষ- প্রবল কালবৈশাখির দূরন্ত ঝাঁপটায় গৃহস্থের যেমন আবাস লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তেমনই ক্ষেতের ফসল লোপাট করে। তবুও এই বৈশাখ কখনও কখনও বিপন্নতায় মানুষকে সাহস এবং শক্তির যোগান দেয়। মলিন অতীতকে নির্বাসন দিয়ে সুন্দর নতুনের প্রত্যাশায় মানুষ উৎসবমুখর হয় এই বৈশাখে।
আমাদের সবার মনে থাকবার কথা ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বৈশাখ এসেছিল। মুক্তিযোদ্ধা শব্দসৈনিক- কবি মুস্তফা আনোয়ার শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য তার কবিতার পঙতিতে রুদ্র বৈশাখের শক্তি প্রার্থনা করেছিলেন। “বৈশাখের রুদ্র জামা আমায় পরিয়ে দে মা”–হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবলিত পূর্ব বাংলার বুক থেকে হায়েনা-পিশাচদের পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে লিখেছিলেন যে কবিতা, তার এই পঙতি প্রমাণ করে কবি যেন বাংলার মানুষের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। আমরাতো আদতেই বিপুল প্রাণের প্রবল শক্তি নিয়ে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানীদের পরাভূত করে নিজ মাতৃভূমিকে দখলদার চক্রের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছিলাম।
বৈশাখতো আমাদের নতুন বছরের সূচনা করে। তাই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে সারা বাংলা। ঘরে ঘরে পিঠে-পুলি, পায়েস রান্নার ঘ্রাণে কী যে মৌতাত সৃষ্টি করে, সেকথা আজ আর বোধহয় বলা যাবে না। তবুও ফেলে আসা দিনগুলোর গ্লানি মুছে ফেলার আনন্দে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই যেন মেতে ওঠেন। বাবা তার দুই হাতে ছেলে আর মেয়েকে নতুন পোশাকে সাজিয়ে মেলায় যেতেন ওদের আশা পূরণের উদ্দেশ্য নিয়ে। অতীতে নদীর ঘাটে বড় বটগাছকে লক্ষ্য করে সামনের বিস্তৃত অকর্ষিত জমিতে বসা বিরাট মেলায় ঘুরে বেড়াতেন বাবা আর বাচ্চাদের জন্য কিনতেন নানা ধরনের খেলনা, পাতার বাঁশি কিংবা ছোট্ট একটা ঢোল। শুধু কি তাই! আহ্লাদের শেষ থাকতো না যখন ছেলেমেয়েরা চিনি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের সাজ দেখে বাবার কাছে কিনে দেয়ার জন্যে বারবার তাগিদ দিতে থাকতো। কী সুন্দর সব পশু-পাখি নানা ধরনের আকৃতির ঐসব মিষ্টির মধ্যে ইলিশ মাছ, হাতি, মিনার, পাখি ইত্যকার সব মিষ্টি জন্তু-জানোয়ারগুলো ছেলেমেয়েদের হাতে ধরা দিত।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে নাচতে নাচতে কখনও ছেলেটা বাবার কাঁধে চড়ে বসতো, হাঁটতে না পারার উছিলায়... গ্রামের এই মেলা আকর্ষণ করতো গৃহস্থকে তার ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিপত্র কেনার জন্যেও। মেলায় উঠতো খাট, চৌকি, আলনা, চেয়ার, টেবিল। কুমোর বসতেন হাড়ি-পাতিল নিয়ে। আবার কামার সাজিয়ে বসতেন তার পশরা, যেখানে থাকতো দা, বটি, ছুরি নানা ধরনের অন্যান্য উপকরণ। মেলার এককোণে থাকতো নাগরদোলা, শিশু-কিশোরদের আনন্দের সাথে বুড়োরাও এক হয়ে যেতেন। আর পাশের নদীতে আয়োজন হতো বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য আজকের বাংলার গ্রামগঞ্জে এধরনের উৎসব বসতে খুব একটা দেখা যায় না।
নববর্ষের আনন্দ উৎসব গ্রামকে ছেড়ে যেন শহরকে আকৃষ্ট করেছে। তাই বর্ষবরণের কতনা অভূতপূর্ব আয়োজনই আমরা শহরে দেখতে পাই। এ বর্ষবরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিবছর বেরুচ্ছে চলমান পরিস্থিতি ও শাসন ব্যবস্থার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতীকী শিল্পকর্ম নিয়ে। কখনও বিশাল ময়ুর, কখনওবা আজদাহা প্রতিনিধিত্ব করছে সময়ের। এছাড়া কত যে পাখি নানা ধরনের শিল্পকর্মের সৃষ্ট বঙ্গ সংস্কৃতির রূপ উঠে আসছে চঞ্চল তরুণ-তরুণীদের হাতে। মুখোশ এ আনন্দ উৎসবের একটি বিশেষ আয়োজন। রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের শেষে আর্ট ইন্সটিটিউট থেকে বেরোয় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। সারা বাংলার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এই নববর্ষের দিনটির। কারণ এদিনেই যে তিনি সাজবেন নতুন পোশাকে আর দূর-দুরান্ত থেকে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাবেন রমনার বটমূলে আর শাহবাগ চত্বরে। আহা কি আনন্দ, কি প্রাণোচ্ছল উৎসব বাংলার মানুষের। কিন্তু সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যখন হামলা করে সংস্কৃতির ওপর তখন রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও বোমা হামলায় ১০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। এই ইতিহাস লেখা আছে আমাদের সংগ্রামে মুক্ত স্বদেশের এক পর্যায়ে। এত বড় আঘাত এবং মারণযজ্ঞ সত্ত্বেও বাঙালি কি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উৎসব আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছিল, না দেয়নি। বরঞ্চ সগর্বে নবশক্তির উত্থান ঘটিয়ে তারা জঙ্গিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলেছিল সংস্কৃতির সংগ্রামে।
হায় মুক্তিযুদ্ধ, হায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের এই তিনটি শ্লোগান দিয়ে আমরা অর্জন করেছিলাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। অবিশ্বাস্য হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বলে দাবিদার চলমান সরকার বাংলার ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার পূর্ব-পুরুষের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করে, নববর্ষের আনন্দ উৎসবের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন বিকেল ছয়টা পর্যন্ত। মুখোশ পরা যাবে না, হাতেই নাকি রাখতে হবে, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ। তবে কি নির্ভয়ে জিজ্ঞেস করতে পারি–মুখোশ মানেটা কি এবং কোথায়ইবা তার ব্যবহার? এ ধরনের নির্দেশ জারি করে প্রকারান্তরে প্রশাসন কি সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন না?... জানি সরকার উদ্বিগ্ন মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে, এ উদ্বেগের জন্যে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আনন্দ উৎসবকে দিনের আলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হাজার বছরের প্রচলিত বাঙালি জীবনের ব্যত্যয় কি ঘটাচ্ছেন না? অথচ আমরা বাঙালি বলে নিজেদের দাবি করছি আর সাম্প্রদায়িকতার কাছে আত্মসমর্পণ করছি। এদেশের মানুষ যখন বা যেদিন আনন্দ করেন, তার জন্যে কোনো সীমারেখা নির্ধারিত নেই। নিরাপত্তা দেয়া এটা প্রশাসন বা সরকারের দায়িত্ব। তাই বলে বঙ্গ সংস্কৃতির এই মহান দিনটিকে কেন কালিমালিপ্ত করার জন্য এমন নির্দেশ জারি? একে প্রত্যাহার করুন এবং বাঙালিকে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতে দিন। মনে রাখবেন, সরকার যেমন নিরাপত্তা সচেতন, তেমনি কিন্তু সাধারণ মানুষও। সুতরাং ভুতের ভয় দেখিয়ে বাচ্চাগুলোকে এখন থেকেই নির্জীব এবং নির্বীর্য করে ফেলবেন না। তাদেরকে জানতে দিন বাংলার পূর্ব পুরুষের ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি। তবেই না যে সোনার বাংলাকে আমরা ভালোবাসি বলে দাবি করি, তারাও ভালবাসতে শিখবে।
বাঙালির জীবনে বর্ষবরণ, নবান্ন, বর্ষামঙ্গল, বসন্ত উৎসব, শারদ উৎসব এমনই বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে দুঃখ-যাতনা, দমন-পীড়ন এসবের মধ্যেও প্রাণোচ্ছল বাঙলার মানুষ তাদের জীবন নির্ভর আয়োজনগুলোকে অব্যাহত রেখেছেন। শুভ হোক নববর্ষ।
আর্কাইভস থেকে