নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি

এনাম আহমদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সোনালী ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন অথবা দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে ভিটেমাটি বিক্রি করে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের একদল টগবগে তরুণ। তাদের গন্তব্য ছিল ইউরোপের সমৃদ্ধ দেশ গ্রিস। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে মিশে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি লিবিয়া থেকে জরাজীর্ণ ছোট নৌকায় করে মানবেতর ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে গ্রিসে পাঠানোর পথে সুনামগঞ্জের অন্তত ১২ জনসহ মোট ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি এক সুসংগঠিত মানবপাচারকারী দালালচক্রের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে দালালদের চরম প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা এবং জীবনের বিনিময়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পৈশাচিক লালসা। এই শোকাবহ ঘটনার ভয়াবহতা ফুটে ওঠে জগন্নাথপুর উপজেলার শায়েক আহমদের দুই ফুফুর করুণ বিলাপে। বিলাপরত সেই স্বজনের আহাজারি থেকে বেরিয়ে আসে দালালদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের লোমহর্ষক সব তথ্য। তারা আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘মঙ্গলবার বলেছিস বৃহস্পতিবার গেইম। এর আগে টাকা লাগবে। গরু, জমি বিক্রি করে টাকা দিলাম। বড় জাহাজের কথা বলে ফুটো নৌকায় তুলে দিয়েছিস। সাগরে ফেলে বলেছিস, গ্রিস পৌঁছে গেছে। আমরা খুশি মনে বসে আছি। এখন শুনি না খাইয়ে মেরে ফেলেছিস।’ এই একটি বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, দালালরা সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে কীভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। তারা বড় জাহাজে করে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নিলেও শেষ পর্যন্ত জরাজীর্ণ ও ছোট নৌকায় কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। এই মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে যার নাম প্রকাশ্যে এসেছে, সে হলো আজিজুল ইসলাম। সে জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের মন্তাজ মিয়ার ছেলে। জানা গেছে, আজিজুল ইসলাম গত ১০ বছর ধরে লিবিয়ায় বসবাস করছে এবং সেখান থেকেই সে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণদের লিবিয়া হয়ে গ্রিস বা ইতালি পাঠানোর নাম করে এই অবৈধ ও মরণঘাতী ব্যবসা পরিচালনা করছে। তার গ্রামের বাড়িতে কেউ থাকেন না বলে জানা গেছে। জীবিত ফিরে আসা ও বোটের অন্যান্য যাত্রীদের মাধ্যমে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা আরও শিউরে ওঠার মতো। জানা গেছে, কোনো অভিজ্ঞ চালক ছাড়াই এই বিশাল ও উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য বোটগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। এমনকি বোটের যাত্রীদের মধ্য থেকেই কাউকে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সমুদ্রপথে বোট চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অজানা ও বিশাল ভূমধ্যসাগরে কোনো দিকনির্দেশনা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই বোটটি এক পর্যায়ে দিক হারিয়ে ফেলে। সাগরের মাঝখানে দিনের পর দিন কোনো খাবার ও পানীয় ছাড়া ভেসে থাকতে থাকতে অনাহারে এবং তীব্র ভয়ে একে একে ২২ জন মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তৃষ্ণায় কেউ কেউ জ্বালানি তেল পান করেছে সে সময়ে। এই মৃত্যুগুলো সরাসরি পাচারকারীদের লোভের পরিণতি। তারা টাকার জন্য মানুষকে নৌকায় ঠাসাঠাসি করে তোলে, কিন্তু তাদের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার বা নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা করে না। দালালরা যে পদ্ধতিতে মানুষকে প্ররোচিত করে তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অমানবিক। লিবিয়া যাওয়ার প্রথম যাত্রাটি হয় মধ্যপ্রাচের যেকোনো একটি দেশ দিয়ে। এরপর কয়েকটি দেশ মাড়িয়ে লিবিয়া পৌচ্ছে তারা। সেখান থেকে ‘গেইমের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁচ্ছানো চেষ্টা করে। দালালরা এই প্রক্রিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিবারের কাছ থেকে কয়েক ধাপে টাকা আদায় করে। তবে লিবিয়া পৌঁছানোর পর শুরু হয় আসল নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সেখানে বিভিন্ন বন্দিশালায় বা গোপন ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়। তখন তাদের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম শারীরিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও বা কান্নার শব্দ মোবাইলের মাধ্যমে দেশে থাকা বাবা-মাকে শোনানো হয় এবং আরও কয়েকগুণ বেশি টাকা দাবি করা হয়। নিরুপায় পরিবারগুলো সন্তানের জীবন বাঁচাতে সর্বস্ব বিক্রি করে দালালদের চাহিদা পূরণ করে। অথচ এত কিছুর পরও অধিকাংশের ভাগ্যে জোটে ভূমধ্যসাগরের অতল গহ্বর। অনেক সময় দালালরা লিবিয়ার মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়া তাদের। মাফিয়ারা টাকার জন্য চালায় পিশাসিক নির্যাতন। মাফিয়ার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনতে তখন পরিবারকে ঘুনতে হয় আবারও মোটা অঙ্কের টাকা। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে গত এক বছরে লিবিয়ার এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে এসেছেন সুনামগঞ্জের অন্তত ২১৫ তরুণ। এই পাচারকারী চক্র কেবল সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে না, তারা দেশের তরুণ সম্পদকে ধ্বংস করছে। একটি দেশ যখন তার রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই যোদ্ধাদের এমন অকাল মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। অভিবাসীরা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় স্তম্ভ। তাদের নিরাপদ বিদেশযাত্রা নিশ্চিত করা সরকারের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। সুনামগঞ্জের এই ঘটনার পর স্পষ্ট হয়েছে যে, এই দালালদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিস্তৃত। তাদের এই অপতৎপরতা রুখতে হলে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে দালালদের চিহ্নিত করতে হবে। পাচারকারীদের এই নরহত্যার ব্যবসা এখনই থামাতে না পারলে সামনের দিনে এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। কারণ এখন পর্যন্ত ১২ জনের তথ্য পেলেও এই সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আরও অনেক তরুণ লিবিয়ায় অমানবিক নির্যাতন সহ্য করে সাগরপাড়ি দিয়ে গেইমের অপেক্ষায় আছেন। অনেক তরুণ উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ার অপেক্ষা করছেন। এটি বন্ধ করতে হলে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। যারা লিবিয়ায় আছে তাদের পরিণতি কথা সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। সাধারণ মানুষ ভাবেন, ঝুঁকি মোকাবিলা ও কষ্ট সহ্য করে একবার স্বপ্নের দেশে পৌঁচ্ছাতে পারলেই বাকি জীবন আরাম আয়াশে থাকা যায়। যারা পৌঁচ্ছে যেতে পেরেছেন তারা খুব আরামে আছেন ভাবেন। আসলে তারাও যে ওই দেশে সুবিধা করতে পারছেন না, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে খেয়ে না খেয়ে দিনপাড় করছেন সেই তথ্য দেশে আসে না। একারণে তরুণরা ঝুঁকি জেনেও দালালের ফাঁদে পড়ছেন। এখন সময় এসেছে এই দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের যে ১২ জন তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্বজনদের মাধ্যমে যেসব নাম প্রকাশ্যে এসেছে, তাদেরসহ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অপরাপর দালালদের পরিচয় দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে কারোর অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকার প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ঘাতক চক্রের মূলোৎপাটন করতে হবে। যদি এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা যায়, তবেই কেবল ভবিষ্যতে কোনো মা-বোনকে তাদের প্রিয়জনকে হারিয়ে বিলাপ করতে হবে না। পরিশেষে, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কোনো দালালের প্রলোভনে পড়ে বা অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার নেশায় জীবনের ঝুঁকি নেওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিরাপদ ও বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার তথ্যগুলো সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, জীবনের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। আর যারা মানুষের এই জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, সেই দালালদের সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সমূলে ধ্বংস করতে হবে। তবেই হয়তো ভূমধ্যসাগরের এই করুণ মৃত্যুর মিছিল চিরতরে বন্ধ হবে এবং আমাদের তরুণরা নিরাপদে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পাবে। প্রশাসনের প্রতি বিনীত আহ্বান, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই পাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করুন এবং সুনামগঞ্জের নিহতদের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। লেখক : সাবেক সভাপতি, সিপিবি, সুনামগঞ্জ ও আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..