বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোক উৎসব

কাজী মোহাম্মদ শীশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

কোনো জনগোষ্ঠীর জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে লোক সংস্কৃতি এবং পালন করা হয় লোক উৎসব। বাংলার লোক সমাজের ইতিহাস অতি প্রাচীন, বৈচিত্র্যময় এবং ব্যাপক। এই ব্যাপকতার মধ্যে রয়েছে বাংলার লোককাহিনী, লোকগীতি, লোকনৃত্য, লোকক্রীড়া, লোকচিকিৎসা, লোকজ গণমাধ্যম, লোকগান, লোক ভঙ্গিমা, লোকসংস্কার- এসবই লোকসংস্কৃতির নানা অঙ্গ। দীর্ঘকাল থেকে গড়ে ওঠা লোক সম্প্রদায়ের সামাজিক আচার-আচরণ ও বিশ্বাস, যাপিত জীবন, আনন্দ-উৎসব বাংলার মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। স্থুলভাবে কেউ কেউ হয়তো বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নগর সংস্কৃতি, গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি ও আদিবাসীদের সংস্কৃতি এমনই তিন ভাগে ভাগ করে থাকেন। প্রকৃত অর্থে বৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্যে পৃথক হলেও এবং এই তিন সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা না হলেও একে অন্যের পরিপূরক। তবে গ্রাম প্রধান বাংলাদেশে গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠী শত শত বৎসর ধরে তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা ও জীবনযাপন প্রণালীকে ভিত্তি করে নানামুখী যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে তাই আমাদের লোক সংস্কৃতি। প্রাকৃতিক পরিবেশে লালিত-পালিত বিশ্বের নানা স্থানের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, সমাজ-ব্যবস্থা, আচার-আচরণ বিশ্বাস-সংস্কার মিলিয়ে তাদের যে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তার মধ্যে এক বিস্ময়কর সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। তাইতো বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার, ভারতের অরুণাচলের এবং সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার আদিবাসীদের ভাষা ভিন্ন হলেও গানের সুরে ও নৃত্যে ছন্দের মধ্যে দেখা যায় এক অপূর্ব মিল। স্কটল্যান্ডের গির্জার প্রার্থনা সঙ্গীতের সাথে অনেক ভাষারই নিবেদনমূলক গানের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই দেশ ভেদে বৈশিষ্ট্যময় লোকসংস্কৃতির একটি সর্বকালীন ও বিশ্বজনীন আবেদন রয়েছে। পেশা লোক সমাজের চিন্তা-চেতনা এবং বস্তুগত নানা দিকের বিকাশ ঘটায়। আর গ্রামাঞ্চলের পেশা যেন এক একটি শিল্পকর্ম। চাষিদের মাঠে বোনা সারিবদ্ধ ধানক্ষেতে বাতাসে দোল খাওয়া রোদ-ছায়ার খেলা, কুমারের হাতের স্পর্শে তৈরি মাটির ভান্ড এবং তাতে বিচিত্র রংয়ের ছোঁয়া, তাঁতির বোনা নিত্যদিনের ব্যবহারের বস্ত্রে রঙিন সূতার কাজ, গৃহবধূদের হাতের ছোঁয়ায় অপূর্ব সৃষ্টি নকশি কাঁথা, মাঠের কারুকার্যময় ছুতারের কাজ সবই যেন এক একটি অনবদ্য শিল্পকর্ম। এক সময় বাংলার গ্রামগুলি ছিলো অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য উপাদান তারা নিজেরা তৈরি করতো। তদুপরি তাদের চাহিদা ছিলো কম এবং তারা অল্পেই সন্তুষ্ট থাকতো। আবার রাঙ্গামাটির পথ, পুকুর, আম, কাঠালের বাগান, তরুর সারি, একচালা, দোচালা, চারচালা বাড়ি সব মিলিয়ে শিল্পীর আঁকা ছবি বাংলার এক একটি গ্রাম। এমনই পরিবেশে সকল সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে বাংলার লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ লোকসঙ্গীত বাংলার লোক উৎসবের প্রাণ। প্রাচীনকাল থেকে শ্রুতি ও স্মৃতি থেকে অনেক সঙ্গীত হাটে-মাঠে-গ্রামে-গঞ্জে গাওয়া হচ্ছে। অঞ্চল ভেদে এসব লোকসঙ্গীতের রয়েছে নানা প্রকারভেদ। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, গম্ভীরা, মুর্শিদি, মারফতি, কীর্তন, ঘাটু, ঝুমুর ইত্যাদি নানা অঞ্চলের নানা ধারার সঙ্গীতের সংমিশ্রণে বাংলার লোকসঙ্গীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ। লোকসঙ্গীত এক অনবদ্য রূপ গ্রহণ করে, যখন গীত, বাদ্য ও নৃত্যের সমন্বয় ঘটে এই সঙ্গীতের সাথে। তবে লোকসঙ্গীত, লোকবাদ্য ও লোকনৃত্যের পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য আছে। এই তিনে মিলে বাউল গান এক অপূর্ব লোকসঙ্গীত সৃষ্টি করে। বাংলার লোক সংস্কৃতির আর একটি অঙ্গ লোকসাহিত্য। শত বৎসর ধরে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা এসব লোকসাহিত্য সংগ্রহ, সংকলন, সম্পাদনা এবং প্রচারের কাজ খুবই জরুরি। কাজগুলি যে হচ্ছে না তা নয় তবে তা আরও ব্যাপকভাবে হওয়া দরকার। বাংলার রূপকথা লোকসংস্কৃতির এক বিরাট সম্পদ। স্বপ্ন, কল্পনা, আবেগ দিয়ে সৃষ্ট এসব রূপকথায় আছে রাজা-রাণী-রাজপুত্র কখনো বা রাক্ষস-খোক্কস অথবা ভূত-প্রেতের গল্প। কল্পনার রাক্ষস-খোক্কস ও ভূত-প্রেত অশুভ শক্তি-অত্যাচারের প্রতীক। তবে বীর রাজপুত্রের কাছে এদের পরাজয় অবধারিত। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করতে রাজপুত্র ছুটে চলে পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে। আবার সব খুইয়ে পথিক যখন গাছের নিচে বিশ্রামরত তখন গাছের ডালে বসা ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী পাখির অজানা খবর অসহায় পথিকের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাকে সঠিক পথ খুঁজে নিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। লোক উৎসবের আর একটা বড় বিষয় হল প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন। এছাড়াও আছে খেলাধুলা, গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রা-পালা, কবি গানের লড়াই, লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ। এসব খেলায়-অভিনয়ে যেমন বিপুল সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করেন তেমনি সকল শ্রেণির মানুষ চিত্তবিনোদনের উপাদান খুঁজে পায় এসব লোক উৎসব থেকে। লোক সংস্কৃতির ও লোক উৎসবের অতি অল্প কিছু পরিচয় তুলে ধরাও খুব কঠিন কাজ। এ বিষয়ে সামান্য কিছু জানতে হলেও যথেষ্ট অধ্যবসায় ও অধ্যয়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন লোক সমাজে মিশে গিয়ে নিজেদের ঐতিহ্যকে উপভোগ করা। বৃহত্তর জীবনের অংশীদার হওয়া। সেই প্রয়াস আজ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী নিয়েছে। তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩৩০-৩৭৭, প্রকাশক বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ দ্বিতীয় সংস্করণ। আষাঢ় ১৪১৮/জুন ২০১১

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..