চলে গেলেন চৌরঙ্গী, জন-অরণ্যের স্রষ্টা শংকর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা সাহিত্য ডেস্ক : নিজের ছদ্মনামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। ‘শংকর’ নামে রচনা করেছেন চৌরঙ্গী, জন-অরণ্য, সীমাবদ্ধ ও কত অজানারেসহ একাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস। সেই মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ৯২ বছর বয়সে ২০ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি ব্রেন টিউমারসহ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। কয়েকদিন ভর্তি ছিলেন কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তাঁর প্রয়াণে বাংলার সংস্কৃতি জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। লেখনির মাধ্যমে গত কয়েক দশক ধরে বাঙালি পাঠককে আবিষ্ট করে রেখেছিলেন মণিশংকর। তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘চৌরঙ্গী’ আজও বাংলা সাহিত্যের জগতে অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। শুধু শহর নয়, সমাজ থেকে সময়, বারবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার লেখনিতে। তার প্রথম রচনা ‘কত অজানারে’ একটি জীবন ঘনিষ্ঠ চিরায়ত উপন্যাস। কলকাতার ওল্ড পোস্ট অফিস রোডের আদালত পাড়ায় ঘটে যাওয়া অনেকগুলো ঘটনা আর সেসব ঘটনার সাথে জড়িত মানুষগুলোর আখ্যান হচ্ছে এই বই। বইটির রচনার শুরু আগস্ট ১৯৫৩। লেখকের বয়স তখন মাত্র উনিশ। এরপরের বছর ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশ। এবং এরপরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাসে সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে সামান্য কয়েকটি বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে ও পরবর্তী কালের বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক মহিমা অর্জন করেছে ‘কত অজানারে’ তাদের একটি। বইটি উত্তম পুরুষে লেখা। গল্প কথক লেখক নিজেই। যাকে নিয়ে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে, বলা যায় প্রধান চরিত্র হচ্ছেন যিনি তার নাম- নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার। বিখ্যাত বারওয়েল বংশের আলোকবর্তিকা। এই বংশ ক্লাইভের আমল থেকেই ভারতবর্ষে ছিল, নানা ভাবে নানা পেশায় নানা সময়ে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর মিলিটারি ডিউটিতে তিনি কলকাতায় আসেন এবং পরবর্তীতে অনেকের পরামর্শে আইন পেশায় প্রবেশ করেন। লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের নাম সংক্ষেপ হয়ে শুধু ‘শংকর’ হয়েছিল এই ইংরেজ ব্যারিস্টার সাহেবের কারণেই। শংকর প্রথম জীবনে নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবের সহকারী ছিলেন। চেম্বার ক্লার্ক বা অফিস এসিস্ট্যান্ট হিসেবে তার কাজ ছিল কেস লিপিবদ্ধ করা, লাইব্রেরি থেকে বই আনা, রেফারেন্স বের করা, শিডিউল তৈরি করা, মক্কেলের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য নোট করা, মাঝে মাঝে দোভাষীর কাজ করা প্রভৃতি। লেখকের সাথে নোয়েল ফ্রেডরিকের যেদিন প্রথম পরিচয় হয়েছিল সেদিন এই ব্যারিস্টার সাহেব বলেছিলেন এত বড় নামে তিনি ডাকতে পারবেন না, বরং সংক্ষেপে শংকর বলে ডাকবেন। সেই থেকে লেখক এই সংক্ষিপ্ত নামটাই নিজের মাঝে ধারণ করে নেন। পরবর্তীতে সাহিত্য রচনায় তিনি এই নামেই লিখতেন। সহকারী হলেও মণিশংকরের সঙ্গে বারওয়েল সাহেব বন্ধুর মতই মিশতেন। ওল্ড পোস্ট অফিস রোডের পুরনো টেম্পল চেম্বারের কক্ষে বসে বারওয়েল সাহেব কাজের ফাঁকে ফাঁকে খুলে বসতেন তার বিশাল অভিজ্ঞতার ঝুলি, কখনো বা মক্কেলের নিজের মুখেই শংকর শুনে নিতেন মানবজীবনের জটিলতম সমস্যার সব দুঃখগাথা। সেসব ছোট ছোট গল্প নিয়েই এই অমর রচনা- ‘কত অজানারে’। বইয়ের ভূমিকাতে লেখক নিজেই অবশ্য বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সুন্দর একটা বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে লেখক বলছেন- সংসার পরিক্রমার পথ কত বিচিত্র সঞ্চয়ই যে দিনে দিনে পর্যাপ্ত হয়ে ওঠে তার আর বুঝি ইয়ত্তা নেই। যা একদিন অচেনা থাকে, অজানা থাকে তাকেই আবার একদিন চিনে ফেলি, জেনে ফেলি। অপরিচয়ের অবগুন্ঠন খুলে কখন সে-ই আবার ধরা দেয় মনের কাছে। এই এমনি করেই সঞ্চয়ের পুঁজি একদিন ভারী হয়ে ওঠে, আর স্মৃতির আকাশে রঙ ধরে তখনই। ঘটনাচক্রে ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রিটের আদালতি কর্মক্ষেত্রে আমাকেও একদিন এমনি অসংখ্য অপরিচিত চরিত্রের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সেদিন অচেনাকে চেনা আর অজানাকে জানাই ছিল আমার জীবিকার অপরিহার্য অঙ্গ। তারপর এতদিন পরে হঠাৎ একদিন টের পেলাম কখন যেন আমার আকাশও বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে তাদের রঙে। কখন যেন নিজেরই অজ্ঞাতসারে তাদের আমি ভালোও বেসে ফেলেছি মনে মনে। জানি, আইনের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কটা বিশেষ মধুর নয়। অন্ততঃ সাহিত্যের কমলবনে আইনের কলরব ঠিক ভ্রমর গুঞ্জনের মত শোনায় না। কিন্ত এই গ্রন্থে আমি আইনকে দেখিনি। ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রীটের যে মানুষদের একদিন ভালোবেসেছিলাম তাদেরই আজ অক্ষরে আবদ্ধ করবার চেষ্টা করেছি মাত্র, আর কিছু নয়! অর্থাৎ বইটির মূল উপাদান যদিও আদালত পাড়া হতে সংগৃহীত, তবুও এখানে তিনি আইন নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি, বরং কতগুলো মানুষের জীবনের গল্পকে তুলে ধরেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। তবে কোর্ট ও এর সিস্টেম সম্পর্কেও বাস্তবধর্মী তথ্য রয়েছে এখানে। এখানে আইনপাড়ার নানান পেশার মানুষদের জীবনযাত্রা ও জীবনবোধের পরিচয় পাই আমরা। দেখতে পাই নানা সফলতা- ব্যর্থতার গল্প।

এছাড়া তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির একটা খন্ড চিত্রও এখানে দেখতে পাই আমরা। বেশ অনেকগুলো চরিত্র আলোচিত হয়েছে এখানে। প্রতিটি চরিত্রই নিজ নিজ জায়গা থেকে স্বতন্ত্র, আলোকিত। ছোকাদা, মেরিয়ন স্টুয়ার্ট, ব্যারিস্টার বীরেন বোস, ব্যারিস্টার সুব্রত রায়, ব্যারিস্টার স্যার হেনরি, ইংরেজ কন্যা হেলেন গ্রুবার্ট, সুরজিত রায়, সুনন্দা দেবী, আরতি রায়, গ্রীক নাবিক নিকোলাস ড্রলাস, বিপ্লবী রবীন্দ্র কলিতা সহ অসংখ্য চরিত্র রয়েছে যেগুলো বিশ্লেষণের খুব বেশি প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি না। প্রতিটি চরিত্রই নানা দিক দিয়ে আকর্ষণীয়, শংকরের কলমের জাদুতে প্রত্যেকটি চরিত্র ও তাদের ঘটনা জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠেছে। এতে দুইশ ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠার জীবনঘনিষ্ঠ আখ্যান ‘কত অজানারে’ পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আইনসিদ্ধ অসাধারণ জীবনদর্শন। প্রথম বই ‘কত অজানারে’ তাঁকে অল্প বয়সেই বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। এরপরই শংকর সৃষ্টি করেন তার লেখকের সিগনেচার বুক ‘চৌরঙ্গী’। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা শংকর সে ভাবে কোনও দিন বড় হোটেলে যাননি। কিন্তু তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, দু-মলাটে সাজাবেন হোটেলের গল্প। তবে শহুরে হোটেলের অন্দরে ঢুঁ না দিয়ে, সেই পৃথিবীর গল্প বোনা তো সহজ নয়। তাই নতুন কিছু লেখার তাগিদেই সমস্ত ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। চষে ফেলেছিলেন কলকাতার সিংহভাগ হোটেল, বার। ১৯৬২-এর জুন মাসে বই আকারে প্রথম প্রকাশ ‘চৌরঙ্গী’র। এই উপন্যাস অনূদিত হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রাশিয়ান, জাপানিজ, চাইনিজ ভাষাতেও। শংকর তাঁর ‘চৌরঙ্গী’-তে কলকাতাকে দেখিয়েছেন বহুমাত্রিক এক চরিত্র হিসেবে। এখানে শহর নিছক পটভূমি নয়, শহর নিজেই নায়ক। শাহজাহান হোটেলের লবি যেন সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ-যেখানে ধনী ব্যবসায়ী, বিদেশি অতিথি, উচ্চাকাক্সক্ষী যুবক, ক্লান্ত কর্মচারী-সবাই মিলেমিশে তৈরি করেছে এক নাট্যমঞ্চ। শংকরের লেখায় চৌরঙ্গী মানে আলোর ঝলকানি, আবার অন্ধকার গলি। সাফল্যের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে ভাঙনের কান্না। তিনি দেখিয়েছেন-জীবন থেমে থাকে না। শাজাহান হোটেলের লাল আলোগুলো তখনও জ্বলছে, নিভছে-এই বাক্য যেন সময়ের প্রতীক। আলো নিভে যায়, আবার জ্বলে ওঠে-ঠিক শহরের মতোই। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র স্যাটা বোস। এই চরিত্রটি শুধু একজন চিফ রিসেপশনিস্ট নন-তিনি পথপ্রদর্শক, অভিভাবক, আধুনিকতার প্রতীক। স্যাটা বোসের স্মার্ট উপস্থিতি, সাবলীল ইংরেজি উচ্চারণ, অতিথি সামলানোর দক্ষতা-সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পাঠকের প্রিয়। তাঁর মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস, তেমনই মানবিকতা। এই দ্বৈততা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলে। পাঠক যেন নিজের জীবনের কোনো পরিচিত মানুষকে খুঁজে পান তাঁর মধ্যে। বাংলা সাহিত্যে এমন স্মরণীয় সাপোর্টিং চরিত্র খুব বেশি নেই, যারা নায়ক না হয়েও গল্পের প্রাণ হয়ে ওঠেন। স্যাটা বোস সেই বিরল উদাহরণ। সেই উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয় ১৯৬৮-তে পরিচালক পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। শাহজাহান হোটেলের প্রেক্ষাপটে উত্তমকুমার, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জনা ভৌমিক, সুপ্রিয়া দেবী অভিনীত ছবিটি তৎকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের কোলাজ। ‘স্যাটা বোস’ আসলে কে? ‘চৌরঙ্গী’র সাহিত্যিক শংকরের সৃষ্টি? না কি ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয়ে অমর চরিত্র? ছবি মুক্তির পরে এই নিয়ে দেদার চর্চা হয়েছে। ২০২২-এ ৬০ বছর পূর্ণ করে ‘চৌরঙ্গী’। তবে ‘স্যাটা বোস’-এর আকর্ষণ কিন্তু কমেনি। কে তিনি? সেই প্রশ্নও হারায়নি। তবে পরে অবশ্য এই কৌতূহল খানিকটা নিরসন করেছিলেন শংকর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৫২, ওই সময়ে দুই ‘স্যাটা বোস’কে তিনি চিনতেন। প্রথম জন ইস্টার্ন রেলওয়ের পদস্থ কর্মী। অবসরের পরে দাস কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কথায়-কথায় আলাপ। আর দ্বিতীয় জন ‘স্যাটা বোস’ স্পেনসেস হোটেলের এক কর্মী। সাহিত্যিক প্রথম জীবনে যাঁর অধীনে চাকরি করতেন, সেই ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল ‘স্পেনসেস’ হোটেলে থাকতেন। কর্মসূত্রে সেখানেও সাহিত্যিকের অবাধ যাতায়াত ছিল। হোটেলেই আলাপ। এই দুই ব্যক্তিকে এক ছাঁচে ঢেলেছিলেন সাহিত্যিক। যদিও শংকর দাবি করেছিলেন, তাঁর প্রকৃত ‘স্যাটা বোস’ ওই প্রথম ব্যক্তি, সত্যচরণ বোস। চৌরঙ্গী সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে স্যাটা বোসের ভূমিকায় অভিনয় করেন উত্তম কুমার। এ প্রসঙ্গে মণিশংকর নিজেই বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।’ উত্তমকুমার কি শংকরের সৃষ্ট ‘স্যাটা বোস’ হতে পেরেছিলেন? শংকরের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিনি আর উত্তমকুমার পাশাপাশি বসে ছবিটা দেখেছিলেন। উজ্জ্বলা সিনেমায় ছিল ছবির প্রিমিয়ার। ছবি শেষ হতেই নাকি উত্তম তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেমন দেখলেন? ঠিক মতো ফোটাতে পেরেছি?’ সাহিত্যিক সে দিন তৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আপনার অভিনয় আমার লেখাকেও ছাপিয়ে

গিয়েছে। আপনার হাতে পড়ে আমার ‘স্যাটা বোস’ জীবন্ত!’ শংকরের তিনটি উপন্যাস ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন-অরণ্য’ এবং ‘আশা-আকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে প্রকাশিত হয় ট্রিলজি ‘স্বর্গ মর্ত পাতাল’। সত্তর-আশির দশকে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন এই বইয়ের একের পর এক সংস্করণ কী ভাবে নিঃশেষিত হয়েছে। তাঁর বহু উপন্যাস বড় পর্দায় নিয়ে এসেছেন কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় ও তরুণ মজুমদার। এর মধ্যে ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৭১-এ শংকরের উপন্যাস ‘সীমাবদ্ধ’র চিত্ররূপ দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। কর্পোরেট জগতে মানুষের অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া উৎকণ্ঠা এবং মানবিক সম্পর্কের শিথিলতার দিকগুলো প্রকট হয়েছে ছবির নায়ক শ্যামলেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে। তবে উপন্যাস এবং ছবি, দুই মাধ্যমেই বেকার সমস্যা এবং আন্দোলনে জর্জরিত বিক্ষুদ্ধ কলকাতার গল্প সরাসরি বলা হয়নি, সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে বোঝানো হয়েছে। গত বছর পঞ্চাশে পা দিয়েছে সত্যজিৎ-এর ‘জন অরণ্য’। ১৯৭৫-এ সত্যজিৎ দ্বিতীয়বার শংকরের সৃষ্টিকে বেছে নিয়েছিলেন ছবির জন্য। উপন্যাসে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালির সঙ্কট ছুঁয়েছিলেন শংকর। আর সত্যজিৎ সাহিত্যিকের সেই ভাবনাকে এড়িয়ে যাননি ছবিতে। তবে সত্যজিৎ-এর নিজের ভাবনা তো ছিলই। তা না হলে সেই ভাঙনকালের সন্ধ্যায় এক পরিবারের অন্দরে রেডিয়োতে সত্যজিৎ ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ কেন বাজাবেন? ঠিক এই কারণেই শংকর বহুবার বলেছেন, সত্যজিৎ-এর স্পর্শে তাঁর সৃষ্টি আরও বেশি করে কালজয়ী হয়ে উঠেছে। শংকরের উপন্যাস অবলম্বনেই ১৯৭৭-এ তপন সিংহের পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছিল ‘এক যে ছিল দেশ’। নাম ভূমিকায় দীপঙ্কর দে, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। তবে তাঁদের আগলে রেখেছিলেন ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। বাংলা পেরিয়ে শংকরের সৃষ্টি পাড়ি দিয়েছিল বলিউডেও। ১৯৮৬-তে পরিচালক বাসু চট্টোপাধ্যায় শংকরের লেখা ‘মান সম্মান’ উপন্যাসটিকে নিয়ে বানিয়েছিলেন হিন্দি ছবি ‘সিসা’। এতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন মিঠুন চক্রবর্তী ও মুনমুন সেন। এর মাধ্যমে শংকরের গল্প সর্বভারতীয় দর্শকের কাছেও পরিচিতি পায়। পরে ২০১৯-এ পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় শংকরের সৃষ্টি ‘চৌরঙ্গী’কে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন রূপ দিয়েছেন ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ ছবিতে। সৃজিত বলেন, ‘যে দিন প্রথম দেখা হয় ওঁর সঙ্গে, আমি জানিয়েছিলাম ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটা পড়েই নতুন করে শহরের প্রেমে পড়ি। কলকাতাকে নতুন করে আবিষ্কার করি। আমার কাছে কলকাতা এবং ‘চৌরঙ্গী’ সমার্থক। অনেকের কাছেই ‘চৌরঙ্গী’ মানে সাদা-কালো ছবি। সেই কল্পনায় আমি খানিক রং দিতে চেয়েছিলাম।’ সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত শাহজাহান রিজেন্সিতে অভিনয় করেন আবির চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ও মমতা শঙ্কর। এই ছবির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও পৌঁছে যায় শংকরের সৃষ্টি। এছাড়া শংকরের উপন্যাস কত অজানারে অবলম্বনে ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন প্রখ্যাত নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। প্রায় কুড়ি দিনের শুটিংও হয়েছিল। তবে আর্থিক ও প্রযোজনাগত জটিলতায় ছবিটি শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি এক অপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই উল্লেখযোগ্য। বড় পর্দার পাশাপাশি ধারাবাহিকেও শংকরের হাতেখড়ি হয়েছে। শংকরের উপন্যাস ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ নিয়ে তৈরি ধারাবাহিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মঞ্চেও নাকি ‘চৌরঙ্গী’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। চলচ্চিত্র তৈরিতে সুললিত গদ্যের আকর্ষণ আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে। তবে জীবিতকালে তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে হওয়া সিনেমা থেকে শংকর যে ভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এসেছিলেন, এমন সৌভাগ্য সচরাচর সব গদ্যকারের জীবনে আসে না। উপন্যাস ভাবতে শেখায়, আর চলচ্চিত্র সেই ভাবনাকে দৃশ্য ও শব্দের মাধ্যমে অনুভব করায়। আর এই দুই মাধ্যম মিলিয়ে শংকরের সৃষ্টি থেকে যাবে... আজীবন। ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর যশোরের বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই লেখক। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই চলে যান কলকাতার ওপারে হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ও সাহিত্য সাধনার শুরু। জীবনের শুরুতে কখনো ফেরিওয়ালা, টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনো প্রাইভেট টিউশনি, কখনো শিক্ষকতা অথবা জুট ব্রোকারের কনিষ্ঠ কেরানিগিরি করেছেন। এক ইংরেজের অনুপ্রেরণায় শুরু করেন লেখালেখি। সাহিত্যজগতে অসামান্য অবদানের জন্য মণিশংকর অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২১ সালে ‘একা একা একাশি’ বইয়ের জন্য মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাহিত্যের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।
শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোক উৎসব

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..