ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে

মুকুল বিশ্বাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু Dhaka University Central Students Union (DUCSU) গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার কথা এবং এক বছরের জন্য। ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের জন্য ভিপি নির্বাচিত হন অরবিন্দ বোস এবং জিএস নির্বাচিত হন গোলাম আযম। ভাষা-আন্দোলনের পর্ব দুটি। একটি ১৯৪৮ এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং অন্যটি ১৯৫২ এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতার প্রস্তুতিলগ্নে জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের অনুরূপ পদক্ষেপ হিসেবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করে বক্তব্য রাখেন। এর পরিপ্রক্ষিতে বাঙালি বহুভাষাবিদ ও দার্শনিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ “পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা” প্রবন্ধে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে বাঙালির জন্যে তা “রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হবে” বলে মতপ্রকাশ করেন। আবার একই নিবন্ধটি ৩ আগস্ট ১৯৪৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টির- সাপ্তাহিক কমরেড পত্রিকায় “The Language Problems of Pakistan” নামে ইংরেজিতে প্রকাশ হয়। ফলে ছাত্র শিক্ষক সাধারণ মানুষ সচেতন হতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৭ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তারিখে “তমদ্দুন মজলিস” নামক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তারিখে সকাল ১০টায় ১৯ নম্বর আজিমপুরস্থ অফিসে (বর্তমান ছাপরা মসজিদের পাশে, পুরাতন ভবন ভেঙে নতুন বহুতল ভবন হয়েছে) অধ্যাপক আবুল কাসেম ভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্র “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা - না উর্দু?” নামক প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রচারণা, সভা চলতে থাকে। ১৪ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ৪ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে হাজার হাজার লোকের স্বাক্ষর সম্বলিত আরও একটি স্মারকলিপি মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির নিকট প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিছিল নিয়ে ৫ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে খাজা নাজিমুদ্দীনের বাস ভবন বর্ধমান হাউসে (বর্তমানে বাংলা একাডেমি ভবন) মুসলিম লীগের মিটিং চলাকালীন সময়ে যায়। পাকিস্তানের করাচীতে ২৭ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে এক শিক্ষা সম্মেলনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের লিংগুয়া ফ্রাঙকা (সাধারণ ভাষা) করার প্রস্তাব করেন। এর ফলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় প্রথম ছাত্র সভা হয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে। সমাবেশ শেষে প্রায় তিন হাজার লোক মিছিল করে সচিবালয় ঘেরাও করে। এভাবে জনতার অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। এ সময়ে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি ফরিদ আহমদ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১২ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী বাসে করে বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করে এবং বাসে দুটি মাইক দিয়ে প্রচার করে “রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাই, উর্দুভাষার বিরোধীরা কাফের, এই কাফেরদের শায়েস্তা করতে হবে।” প্রতিবাদে ১৩ ডিসেম্বর সরকারি অফিসে ধর্মঘট পালিত হয়। সেদিন আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশাল প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করে। সরকারি কর্মচারীরা পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণ করে। সরকার ভীত হয়ে ১৫ দিনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এই ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করে। ভাষা আন্দোলনে তখন পর্যন্ত কোথাও গোলাম আযম নেই। প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে ড. নুরুল হক ভুঁইয়া-কে আহ্বায়ক করে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই প্রথম কমিটিতে খ্যাত অখ্যাত অনেকেই ছিলেন। কিন্তু গোলাম আযম নেই এখানে। এই কমিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে আন্দোলনের জন্য “বাংলা ভাষা প্রচার তহবিল” নামে অর্থ সংগ্রহ করে। এই কমিটির ডাকে দুইবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। এই সময়েই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে বাংলাকে, ইংরেজি ও উর্দুর সাথে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি ২৫শে ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে আলোচনায় এলেও স্পিকার কর্তৃক তা অগ্রাহ্য হয়। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট এবং ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম হরতাল। সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম ডাইরেক্ট অ্যাকশন হিসেবে ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী সর্বত্র হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত হয়। হরতালের ব্যাপক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২ মার্চ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। কামরুদ্দীন আহমদ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- অধ্যাপক আবুল কাসেম, সরদার ফজলুল করিম, কাজী গোলাম মাহবুব, রণেশ দাশগুপ্ত, আজিজ আহমদ, অজিত কুমার গুহু, শামসুদ্দিন আহমদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, তোফাজ্জল আলী, আলী আহমদ, মহীউদ্দীন, আনোয়ারা খাতুন, শামসুল আলম, শওকত আলী, আবদুল আউয়াল, অলি আহাদ, শামসুল হক, মুহম্মদ তোয়াহা, শহীদুল্লাহ কায়সার, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুর রহমান চৌধুরী, লিলি খান প্রমুখ। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যুক্ত হয়। এখানেও গোলাম আযম নেই। দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চের হরতালকে সামনে রেখে গঠিত হয় এই সম্প্রসারিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। কেউ কেউ একে প্রথম “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” বলেন। ২ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এখানে আগের কমিটির অনেকে বাদ যান, আবার অনেকে যুক্ত হন। এখানেও গোলাম আযম নেই। এসএম হলের ভিপি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ফজলুল হক হলের ভিপি মুহম্মদ তোয়াহা আছেন, কিন্তু কমিটিতে ডাকসুর মূলনেতা ভিপি-জিএস কেউ নেই। ১১ মার্চ হরতালে শেরে এ বাংলা এ কে ফজলুল হক, মুহম্মদ তোয়াহা, অধ্যাপক আবুল কাসেম’সহ প্রায় ৫০ জন আহত হন। এই হরতালেই সচিবালয়ের সামনে পিকেটিংয়ের সময় অনেকের সাথে শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। ১৯ মার্চ ১৯৪৮ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে ভাষণ দেন। দুই ভাষণেই তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। ২৪ মার্চ বিকেলে গভর্নর হাউজে (আজকের বঙ্গভবনে) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বৈঠক হয়। এসময় বৈঠকে ছিলেন - শামসুল হক (পরে যিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন), নইমুদ্দিন আহমদ (আওয়ামী মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক), কামরুদ্দিন আহমদ, আজিজ আহমেদ, অধ্যাপক শামসুল আলম, তাজউদ্দীন আহমদ (পরে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী), সৈয়দ নজরুল ইসলাম (পরে বাংলাদেশের প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি), অধ্যাপক আবুল কাসেম, মোহাম্মদ তোয়াহা (কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রনেতা ও ফজলুল হক হলের তৎকালীন ভিপি), অলি আহাদ (বামপন্থিদের প্রকাশ্য সংগঠন যুবলীগ নেতা) এবং লিপি খান। এই বৈঠকেও কিন্তু গোলাম আযম নেই। যা হোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে মারা গেলেন। বাঙালি নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থেকে পুরো পাকিস্তানের গভর্নর হলেন। গভর্নর হয়ে তিনিও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চান। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৮ সালে ২৭ নভেম্বর পুর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তার সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ২৭ নভেম্বর ছাত্র সভার আয়োজন করা হয়। লিয়াকত আলী খানের ছাত্র সভায় ডাকসুর পক্ষ থেকে একটা মানপত্র পাঠ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কে পাঠ করবে সেই মানপত্র? ভিপি অরবিন্দ বোস একজন হিন্দু, সে মানপত্র পাঠ করলে সদ্য স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান সরকার সন্দেহ করে বলবে ভারতের ষড়যন্ত্র আছে! তাই ডাকসুর মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় ভিপি অরবিন্দ বোস একজন হিন্দু, কিন্তু জিএস গোলাম আযম একজন মুসলমান। তিনিই মানপত্র পাঠ করবেন। মানপত্র লিখবেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য আবদুর রহমান চৌধুরী। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মানপত্র পাঠ করার সাথে সাথে গোলাম আযম মঞ্চ থেকে উধাও হয়ে গেলেন। লিয়াকত আলী খান ভাষণের সময় মঞ্চে উঠেই জানতে চান কে মানপত্র পাঠ করলো? পিনপতন নিরবতা কোন উত্তর নাই। কারণ মানপত্রে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব আছে। ততক্ষণে গোলাম আযম সরে পড়েছেন। এ বিষয়টি ভাষা আন্দোলনে কারাবরণকারী তৎকালীন ডাকসু নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রাণেশ সমাদ্দারের কাছ থেকে জানা যায়। ১৯৫০ সালে গোলাম আযম রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন। মানে লেখাপড়া শেষ করেন। তিনি ১৯৫০ সালের ৩ ডিসেম্বর রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। যার ১ নম্বর দফা হলো- “বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে”। নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। ১৯৫৪ সালের ৭ই মে গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয় এবং পরে ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ২১৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয় “উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা”। ১৯৭০ সালের ১৮ জুন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সিন্ধু প্রদেশের শক্কর শহরে এক সংবর্ধনা সভায় বলেন- “বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে”। তার বক্তব্য ২০ জুন দৈনিক আজাদ এবং ২১ জুন দৈনিক গণশক্তিতে প্রকাশিত হয়। গোলাম আযম সারাজীবন শহীদ মিনারে যাননি, উল্টো শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া বেদাত প্রচার করেছেন। তবে তার মৃত্যুর পর তার দল জামায়াত এবার প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে গেলো। ১৯৫২ থেকে ২০২৬ সাল, দীর্ঘ ৭৪ বছর লাগলো জামায়াতের শহীদ মিনারে যেতে। ভাষা আন্দোলনে একক কোনো হিরো নেই। ভাষা আন্দোলন ছিল মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশ, পাকিস্তানের নিষিদ্ধ গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের যৌথ নেতৃত্ব। অন্যদিকে বাঙালি হয়েও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন, ‘৪৮ এর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রেডিও ভাষণে বলেছিলেন “রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন হলো কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র।” সেই তিনি পুরো পাকিস্তানের গভর্নর হয়ে আবারও ‘৫২ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। গোলাম আযম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সামনে মানপত্র পাঠ করেছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে একজন মানপত্র পাঠক, স্মারকলিপি প্রদানকারী নয়। তিনি যখন বুঝতে পারলেন এই ভাষা আন্দোলন হলো অসাম্প্রদায়িক সেকুলার বাঙালির আন্দোলন, ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি, তখন তিনি ভাষা আন্দোলনের বিরোধী হয়ে গেলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের মধ্যে তিনি হয়ে উঠলেন সশস্ত্র প্রধান প্রতিপক্ষ, খলনায়ক। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা দিয়ে ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানে চলে যান, এরপর সৌদি আরব, ব্রিটেনে অবস্থান করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। জিয়ার আমলে তিনি ১৫ আগস্ট ১৯৭৮ সালে মায়ের অসুস্থতার কথা বলে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। নাগরিকত্ব ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে সারাদেশে আন্দোলন দানা বাঁধে। ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে জনগণ তাকে জুতা নিক্ষেপ করে। তিনি একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য দোয়া করতে গেলে জনগণের বাধার মুখে পড়েন। জামায়াত দলগতভাবে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছিল না। উপরন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস গঠন করে সশস্ত্রভাবে বিরোধিতা করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, গণআদালত গঠন করে সারাদেশে বিশাল আন্দোলন গড়ে ওঠে। জামায়াত এবং গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জনগণের বিশাল ক্ষোভ প্রশমনের জন্য, তাকে মহিমান্বিত করে ভাষা সৈনিক হিসেবে প্রচারণা চালানো হয়। তিনি ভাষা সৈনিক হলে কেন বললেন “বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে”। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও বিশ্বাস অস্বীকার করার পর গোলাম আযমকে ভাষা সৈনিক বলা এবং শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া জামায়াতের আরেক রাজনৈতিক প্রতারণা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..