কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

উর্বর কৃষি জমিতে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প না করার আহ্বান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : উর্বর কৃষি জমি নষ্ট, বসতভিটা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন না করার দাবি জানিয়েছে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে সংগ্রাম পরিষদ আয়েজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও ক্ষেতমজুর সমিতির কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন রেজা। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএমএ সবুর, ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান, জাতীয় কৃষক-ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সহ-সাধারণ সম্পাদক নিখিল দাস, বাংলাদেশ কৃষক ফোরামের সভাপতি জগলুল পাশা, কৃষক ক্ষেতমজুর সংগঠনের আলমগীর হোসেন দুলাল, ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল মজিদ প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সারা বিশ্বই কার্বন নিঃসরণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সংকোচন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে। তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে নীতিমালা অমান্য করে ফসলী জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে কৃষক কৃষিজমি হারাচ্ছে, এর ফলে দেশের মানুষ খাদ্যসংকটে পড়বে। ময়মনসিংহের ভালুকায় সৌরবিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি ফসলী জমি, বসতবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, কবরস্থানের মধ্যে পড়েছে। এছাড়াও কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলে ১টি করে ও কক্সবাজারে ২টি করে মোট ১০টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে গত এপ্রিলে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) পদ্ধতিতে ২০২৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে এসব কেন্দ্র উৎপাদনে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইপিপি পদ্ধতিতে কোনো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ১৭৩.১৩ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে জমি নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দরপত্রে অংশ নিতে হলে নির্ধারিত জমির বিপরীতে কৃষি বিভাগের অনাপত্তি প্রয়োজন। উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নে ৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ‘কৃষিজমি’ উল্লেখ করে প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল উপজেলা কৃষি বিভাগ। পরে ‘চাপের মুখে’ অনাপত্তিপত্র দিতে কৃষি বিভাগ বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের মতামতের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় সাংসদের স্ত্রীর নামে দরপত্র পাওয়া উক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি জবরদখলের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় কৃষি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়। তাতে বেকায়দায় পড়েন কৃষক ও মৎস্য চাষিরা। এই প্রকল্পের কারণে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ফসলি জমি ও মাছের ঘের। প্রতিদিন সেচ মেশিন দিয়ে পানি নিষ্কাশন করেও রেহাই পাচ্ছেন না হাজারো চাষি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরাসরি কৃষি জমি বা চাষযোগ্য ফসলি জমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। সরকারের ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী দুই বা ততোধিক ফসলি জমি নষ্ট করে কোনো বাণিজ্যিক সোলার প্ল্যান্ট করা যাবে না। যে জমিতে মানুষের স্থায়ী ঘরবাড়ি রয়েছে কিংবা যেসব জমি নিয়ে আইনি বিরোধ বা স্বত্বাধিকারের জটিলতা রয়েছে, সেখানে সোলার পার্ক নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। সরকার কর্তৃক ঘোষিত যেকোনো বিশেষ কৃষি জোন বা সংরক্ষিত কৃষি বনে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ। উন্নয়নমূলক কাজে ভূমির প্রয়োজন হলে এবং তার জন্য অকৃষি খাস জমি পাওয়া গেলে খাস জমি ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষি জমিতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী ও দলীয় লোকজনকে মুনাফার সুযোগ করবে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশায় পড়বে। সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সারা দেশে একটা ম্যাপ করতে পারে সরকার। সেই ম্যাপের বাইরে যাতে কেউ কোনো সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে না পারে সরকারকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ‘প্যারিস চুক্তি’তে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে কৃষককে কৃষি জমি থেকে উচ্ছেদ করে দেশের মানুষকে খাদ্যসংকটে ফেলতে পারে না। এর প্রভাব হবে অত্যন্ত নেতিবাচক। এভাবে কৃষিজমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়ার পেছনে দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না। তাঁদের মতে যে প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে তা সরকারকে বন্ধ করতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন, অতীতে কৃষকরা তাঁদের জমি রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ ও মাস্তানের নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও কারাভোগ করতে হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধী নই। বরং কিভাবে তা বাড়ানো যায় সে দাবি আমাদের সকলের। কিন্তু অবশ্যই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্থাপন করতে হবে। জমির স্বল্পতার কারণে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অনাবাদী বা পতিত সরকারি জমি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রেলপথ ও সড়ক বিভাগের অব্যবহৃত খালি জায়গা এবং বিশেষ করে কলকারখানা ও বাসাবাড়ির ছাদ ব্যবহার করার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে। সংবাদ সম্মেলনে কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবিদ হোসেন, সহ-সভাপতি নিমাই গাঙ্গুলী, নির্বাহী কমিটির সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, জাহিদ হোসেন খান, ক্ষেতমজুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক অর্ণব সরকার, নির্বাহী কমিটির সদস্য অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, জাতীয় কৃষক খেতমজুর সমিতির মোশারফ হোসেন নান্নু, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের জুলফিকার আলী, কৃষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, শহিদুল ইসলাম সবুজ সহ কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..