সুপার এল নিনোর প্রভাব লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : সুপার এল নিনোর প্রভাবে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের ধ্বংসাত্মক চিত্র। পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, পৃথিবীর জলবায়ুকে গ্রাস করে ফেলবে সুপার এল নিনো। এটাও এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্রকে ওলটপালট করে দিবে। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় তীব্র তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, বন্যা আর মারাত্মক খরার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দক্ষিণ পূর্ব আমেরিকায় হানা দিতে পারে শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সম্প্রতি, জলবায়ু বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিয়েছেন- সুপার এল নিনোর কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপ ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। মানুষের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিমাপের আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব এক বার্তায় বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বলছে, খরার কারণে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ভারতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বেশি। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর এই সংখ্যার আবেগীয় মূল্য অনেক বেশি। কারণ এর মধ্যে কারও মা-বাবা, সন্তান, দাদা-দাদি কিংবা অন্য কোনো স্বজন থাকতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে সম্ভাব্য পরিণতির সময়সীমা ধরা হয়েছে চলতি বছরের (২০২৬) গত জুন থেকে আগামী (২০২৭) বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কারণ তাপমাত্রা নিয়ে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেটির মেয়াদ ওই সময়ের মধ্যে শেষ হবে। তবে তাপজনিত মৃত্যুর হার আগামী বছরজুড়ে অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণা প্রতিবেদনটির সহ-লেখক ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বার্কলে) সহযোগী অধ্যাপক তাম্মা কার্লটন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রচেষ্টাগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা গেলে এ বছর অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। তাম্মা কার্লটন বলেন, বর্তমানের চরম তাপমাত্রা ২০ বছর পর হয়তো ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতিতে পরিণত হবে। তাই আগামী বছরগুলো থেকে জীবন বাঁচানোর সরঞ্জাম তৈরি, প্রয়োগ ও মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এরই মধ্যে জাতিসংঘ সাবধান বার্তা দিয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, চলমান সুপার এল নিনোটি অতীতের যে কোনো এল নিনোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রলয়ংকর। কারণ এরইমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি ৪ ডিগ্রিতেও পৌঁছাতে পারে সতর্কতা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করায় পুরো পৃথিবী এখন ‘চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সুপার এল নিনো কি এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার জলবায়ুগত একটি পর্যায়; যা স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে দেয়। সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পরপর এটি ঘটে। এল নিনো ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে এবারের এল নিনোটি আখ্যা পেয়েছে ‘সুপার’ হিসেবে। এটি হল জলবায়ু চক্রের এমন শক্তিশালী ও তীব্র রূপ, যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যায়। এর প্রভাবে খরা, তাপ প্রবাহ, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ও খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ুর চরম পরিবর্তনের ফলে জনজীবন ও স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছে, চলতি বছরের জুন মাসে সুপার এল নিনো শুরু হয়। এটি আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে প্রবল হয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই খরা এবং বন্যার কারণে নানা ধরনের ধ্বংসলীলা দেখতে পাচ্ছি। এল নিনো যত তীব্র হবে, এই প্রভাবগুলো তত বাড়বে বলেই আমাদের আশঙ্কা। দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশগুলো সুপার এল নিনোর প্রভাবে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। প্রত্যেক দেশই বলছে, পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থাগুলোকে জোরদার করা হয়েছে এবং আগাম চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তারপরও এবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউএমও বলেছে, এল নিনো সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো যত সম্ভব বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তারা এক ‘ব্যাপক সর্বাত্মক উদ্যোগ’ হাতে নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এরইমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে তাপমাত্রা আরও বেশি অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে; কিছু জায়গায় তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত মহাসাগর, ক্রান্তীয় আটলান্টিক এবং অস্ট্রেলিয়া উপকূলের আশপাশের এলাকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশেও সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রচুর সামুদ্রিক জীবে সমৃদ্ধ হওয়ায় মহাসাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক ড. অ্যালিস্টার হবডে বিবিসিকে বলেন, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এটি এমন চরম তাপপ্রবাহ নিয়ে আসে; যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে ত্বরান্বিত করে। বিবিসি বলছে, অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি সামুদ্রিক সংকটের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে মৎস্য খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বিপন্ন প্রজাতিগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রবাল পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর মত উদ্যোগ রয়েছে। এল নিনোর মারাত্মক প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সেখানে তীব্র খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার বৃষ্টিপাত কমার পূর্বাভাসের কারণে পানামা খালের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও বেশি কমানো হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে দাবানল নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে। এরইমধ্যে দাবানলে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল ও গাছপালা পুড়ে ছাই হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশের মত ইন্দোনেশিয়াকেও এ বছর দীর্ঘমেয়াদী খরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..