জ্বালানি দাম বৃদ্ধি কার লাভ কার ক্ষতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গত কদিন আগে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি বাড়লো ২০ টাকা করে। এই বৃদ্ধিটা দ্রব্যমূল্যের উল্মফন ঘটাবে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাপনটা হয়ে উঠেছে কষ্টসাধ্য। তেলের দাম বাড়াটা প্রান্তিক মানুষের ওপর মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে যাবে। ডিজেল আগে প্রতি লিটার ছিল ১১৫ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হলো ১৩৫ টাকা; পেট্রোল আগে ছিল ১৪০ টাকা, তা বেড়ে দাঁড়ালো ১৬০ টাকা; অকটেন আগে ছিল ১৪৫ টাকা, তা বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা; কেরোসিন তেল আগে ছিল ১৩৫ টাকা, তা বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। বাংলাদেশের বাজারে গত দশ বছরে (২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত) জ্বালানি তেলের দাম গড়ে প্রায় ৭০% থেকে ১০০% এর বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের বর্তমান দাম বৃদ্ধির হার ডিজেল ৬৫-৬৮ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, বাড়ার হার ১০০%; কেরোসিন ৬৫-৬৮ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২৫%; পেট্রোল ৭০-৭৪ টাকা থেকে ১৬০ টাকা, বৃদ্ধির হার ১৩০%; অকটেন ৭৫-৭৭ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ১১০%। তেলের দামের বিগত ২০ বছরের ইতিহাসটা দেখলে দেখা যায়, অর্থাৎ ২০০৬ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ট্রেন্ডটা বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, ডিজেল লিটারে ৩৩ টাকার জায়গায় হয়েছে ১৩৫ টাকা, বৃদ্ধি পেল প্রতি লিটারে ১০২ টাকা, ২০ বছরে বৃদ্ধির হার ৩১০%; কেরোসিন ৩৩ টাকা লিটারের দাম হয়েছে ১৫৫ টাকা, দাম বাড়ল ১২২ টাকা, বৃদ্ধির হার ৩৭০%; পেট্রোল ৫৬ টাকা লিটারের দাম হলো ১৬০ টাকা, দাম বাড়লো ১০৪ টাকা, বৃদ্ধির হার ১৮৫%; অকটেন ৫৮ টাকা লিটারের দাম বেড়ে হলো ১৬৫ টাকা, দাম বাড়লো ১০৭ টাকা, বৃদ্ধির হার ১৮৪%। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতনও বাড়িয়েছেন। গত ২০ বছরে সরকারি কর্মীদের বেতন বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। সরকার সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়িয়েছেন যে উদ্দেশ্যে তা হলো, যেন ঊর্ধ্ব মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরকারি কর্মীরা সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে। দেশে কতজন সরকারি কর্মী রয়েছে। দেশে মাত্র ৩০ লাখ লোক সরকারি চাকরি করে। আর বাকি মানুষের কথা কি সরকার কখনো ভেবেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ষষ্ঠ জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৫ সালের এই ষষ্ঠ বেতন স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন প্রথমবারের মতো ২০ হাজার টাকার বেশি নির্ধারণ করা হয়। সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে ২,৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ৫৩.৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২৩,০০০ টাকা করা হয়েছিল। তারপর বর্তমান সরকার ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের সাথে মূল্যস্ফীতির তুলনা করে সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়িয়েছেন। ২০১৫ সালে মূল বেতন দ্বিগুণ বা প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এবার ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামো সরকার ঘোষণা করেন, এই কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা আর সব্বোর্চ্চ বেতন স্কেল ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। গত ২০ বছরের বেতন বাড়ার ট্রেন্ডটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সর্বনিম্ন স্কেলে বেতন বেড়েছে ৭৭০ শতাংশ আর সর্ব্বোচ্চ স্কেলে বেতন বেড়েছে ৬৫০ শতাংশ। একজন কৃষকের সারের দাম বাড়ানো হয়েছে গত ২০ বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। অপরদিকে গত ২০ বছরে বাংলাদেশে সরকারিভাবে নির্ধারিত ও বাজারদর অনুযায়ী ধানের দাম কেজিতে প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র। ২০০৬ সালে যেখানে প্রতি কেজি মোটা ধান বা চালের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকার ঘরে ছিল, ২০২৬ সালে সরকারিভাবে বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা কেজি (প্রতি মণ প্রায় ১,৪৪১ টাকা)। ২০০৬ সালে প্রতি কেজি ধানের বাজার/সরকারি দর ছিল প্রায় ৯ থেকে ১১ টাকা (মণ প্রতি প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা)। ২০২৬ সালে প্রতি কেজি বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা (মণ প্রতি ১,৪৪৪ টাকা)। তবে বাজারের সাধারণ কৃষক অনেক সময় স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, সরকার ঘোষিত মূল্য যা-ই হোক না কেন। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দৈনিক প্রথম আলোর সংবাদ থেকে জানা যায়, ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ জেলা নওগাঁয় এবার আউশ ধানের বাম্পার ফলন হলেও চাষিদের মুখে হাসি নেই। কারণ, আউশ ধান বিক্রি করে উৎপাদনের খরচ উঠছে না কৃষকের। দাম না পেয়ে এখন তাঁরা হতাশ। নওগাঁর বিভিন্ন হাটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায়। অথচ সরকার ঘোষণা দিয়েছে প্রতি মণ ধান ১৪৪৪ টাকা, কৃষক পাচ্ছে ৯৮০ টাকা, বাকি টাকা কার পকেটে ঢুকছে, সেই খবর কয়জন রাখেন বা সরকার কি তা তদারকি করছেন। কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধান ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। অথচ সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে ধানের উৎপাদন খরচ গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। একজন কৃষকের মূল আয় হয় ধান বিক্রির মাধ্যমে। গত বিশ বছরে ধানের দাম বেড়েছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩৫০ শতাংশ। সেই হিসাবে কৃষকের আয় বেড়েছে কত? সার, বীজ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য উপকরণের দামের হিসাবে যা ধানের মূল্য হয়েছে তাতে কৃষকের লোকসান গুণতে হয়। অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে গত বিশ বছরে প্রায় ৭০০ শতাংশের বেশি। অথচ দেশে প্রায় ৫৬-৬০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এই বৈষম্যমূলক আয় বাড়ার ক্ষেত্রে একজন কৃষকের জীবনযাপন করাটাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বাড়বে। শহরের বাজারের দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লেও গ্রামের প্রান্তিক চাষির কাছ থেকে পাইকারের পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে কম দামে পণ্য কিনবে। ফলে কৃষকের আয় আরও কমে যাবে। তাই জ্বালানি পণ্য বাড়ার ফলে এদেশের প্রান্তিক মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সরকারের উচিত ছিল জ্বালানী তেলে ভর্তুকি বাড়ানোর। তাহলে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একটু স্বস্তিতে থাকতে পারতো। এদেশের একজন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সরকারকে দিচ্ছেন, ১. ইনকাম করার পর ইনকাম ট্যাক্স, ২. ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য সার্ভিস ট্যাক্স ৩. এমএফএস (বিকাশ ও অন্যান্য) লেনদেনে ১.৮% ট্যাক্স, ৪. ডেবিট কার্ড রাখার জন্য বার্সিক ট্যাক্স, ৫. ক্রেডিট কার্ড রাখার জন্য বার্ষিক ট্যাক্স (৩ থেকে ৬ হাজার), ৬. কেনাকাটার সময় ১৫% সেল ট্যাক্স/ভ্যাট, ৭. হোটেলে খাবার সময় ৫% ভ্যাট, ৮. হোল্ডিং/বিদ্যুৎ/পানির বিলের জন্য ভ্যাট, ৯. মোবাইল বিলের ওপর ভ্যাট, ১০. বিভিন্ন ব্যবসায়িক লাইসেন্স ১৫% ভ্যাট, ১১. মেডিকেল সার্ভিসের জন্য ৫% ভ্যাট। এই বৃহৎ ট্যাক্স দাতারা দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এদের কথা কি সরকার কখনো বিবেচনা করেন? সরকার যদি ভাবে ৩০ লাখ মানুষের বেতন বাড়লেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিটা ক্রয়ক্ষমতার সহনীয় পর্যায়ে এসে যাবে, তাহলে সেই ভাবনাটা হবে দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তাই বিষয়টা সরকারের নীতি নির্ধারকদের ভাবা জরুরি। দেশটা জনগণের, তাই যে কোনো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আগে জনগণের কথা চিন্তা করা দরকার। লেখক: কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..