অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : একটি মার্কসবাদী মূল্যায়ন

স্বপন বাগচী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সিলেটের রাজন, খুলনার রাজন-রাকিব, তুরাগবাগের সায়মা, মাগুরার আছিয়া, ঝিনাইদহের সাবা, পাবনার কলির পর শিশু ও কিশোর হত্যার রক্তাক্ত মিছিলে যুক্ত হওয়া সর্বশেষ ও অত্যন্ত নৃশংস সংযোজন হলো কুমিল্লার অপ্রতিম। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সারাদেশকে নাড়িয়েছে। স্যোশাল মিডিয়ার কারণে প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা। কিন্তু কেন এই হত্যাকাণ্ড? শুধু কি আইফোন কিংবা অর্থনৈতিক কারণ? আমরা অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের মত এই হত্যাকাণ্ডকেও সাধারণ একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখবো? যতদিন আমাদের ঘরে বিপদ ততদিন নিশ্চুপ থাকবো। ১৩ বছর বয়সী এই কিশোরের নির্মম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ফৌজদারি অপরাধ বা কোনো আকস্মিক পারিবারিক ট্রাজেডি নয়। এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে বর্তমান সমাজের এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক সংকট। বুর্জোয়া মূলধারার গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারে এই পৈশাচিক ঘটনাটিকে স্রেফ ব্যক্তিগত লোভ, একটি আইফোন হস্তগত করার আকুলতা, সামান্য টাকার লেনদেন কিংবা খণ্ডিত ‘কিশোর অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করার প্রয়াস বিদ্যমান। এটি পুঁজিবাদী চশমা দিয়ে বিশ্লেষণ করার একধরনের সুবিধাবাদী প্রবণতা। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই ঘটনা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়, তীব্র বাজার সংস্কৃতি এবং নষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অনিবার্য ও নির্মম বহিঃপ্রকাশ। মার্কসের মতে, পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে মানুষ যখন কোনো বস্তু বা পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থাকা মানুষের শ্রম ও সামাজিক সম্পর্ককে বিস্মৃত হয় এবং পণ্যটির বাজারমূল্য বা ব্র্যান্ডের প্রতি অন্ধভাবে আকৃষ্ট হয়ে তাতে একধরনের জাদুকরী শক্তি আরোপ করে, তখনই জন্ম নেয় পণ্যের ফেটিশবাদ বা পণ্যের পূজাবাদ। পুঁজিবাদের এই চরম বিকাশের যুগে মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক ও আত্মিক সম্পর্কের জায়গা দখল করে নিয়েছে বস্তু বা পণ্যের সাথে সম্পর্কের এক অসম প্রতিযোগিতা। বর্তমান ডিজিটাল পুঁজিবাদে একটি ১৩-১৪ বছরের শিশুর কাছে আধুনিক প্রযুক্তির দামি স্মার্টফোন বা আইফোন কেবল পণ্য নয়; তা হয়ে ওঠে শ্রেণিমর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক আভিজাত্যের প্রধানতম মাপকাঠি বা স্ট্যাটাস সিম্বল। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে একটি আইফোন বা সামান্য অর্থমূল্যের যে প্রত্যক্ষ কারণ পুলিশ ও গণমাধ্যম আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, তা মূলত আমাদের সমাজব্যবস্থার চরম নগ্ন রূপকেই উন্মোচিত করেছে। পুঁজিতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির নির্মম থাবায় বস্তুগত ও ভোগবাদী প্রলোভন আজ মানুষের জীবনকে এতটাই মূল্যহীন করে তুলেছে যে, একটি যান্ত্রিক ডিভাইসের মালিকানা অর্জনের জন্য কিশোররা নিজেদের মৌলিক মানবিক সত্তা ও নৈতিকতা বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। এখানে একটি তরতাজা মানুষের জীবন বড় নয়, বরং বড় হয়ে উঠেছে ভোগবাদী পণ্য ব্যবহারের চরম অধিকার। পুঁজিবাদ আমাদের তরুণ ও কিশোর সমাজকে এমন এক অন্ধ ভোক্তা সংস্কৃতিতে বন্দি করে ফেলেছে, যেখানে সহমর্মিতা, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং মানবিক বোধের স্থান দখল করে নিয়েছে চরম আত্মকেন্দ্রিকতা ও তাৎক্ষণিক ভোগ-লালসা। মার্কসবাদী তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, একটি সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি বা উৎপাদন সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে তার ওপরিকাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচার—যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আইন, বিচারব্যবস্থা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় যে লুটেরা ও কর্পোরেট পুঁজিবাদ বিরাজ করছে, তা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে। একদিকে সমাজের মুষ্টিমেয় পরজীবী গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে অঢেল অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতা। অন্যদিকে, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রতিদিন বেঁচে থাকার চরম অনিশ্চয়তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র বৈষম্য সমাজে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক হতাশা ও নৈরাজ্যের জন্ম দিচ্ছে। যে কিশোরদের বা তরুণদের হাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তাদের পারিপার্শ্বিকতা ও সামাজিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা গভীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা কিংবা লক্ষ্যহীন মূল্যবোধহীনতার শিকার। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার মাঠ, চিত্রাঙ্কনের তুলি বা মুক্ত সংস্কৃতির সুবাতাস, সেই বয়সে তারা পুঁজিবাদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অন্ধ ভোগবাদ ও ক্ষমতার ছোট ছোট বৃত্ত কিংবা ধর্মীয় পরিসরে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করার মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত। তথাকথিত ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও সামাজিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়ারই প্রত্যক্ষ ফলাফল। রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণমুখী শিক্ষা ও সুস্থ বিনোদনের দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সমাজকে মুক্তবাজারের নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেয়, তখন যুবসমাজ বিপথগামী ও অপরাধপ্রবণ হতে বাধ্য হয়। মূলধনের অশুভ বিকাশ নিশ্চিত করতে গিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তরুণ সমাজকে সচেতন রাজনৈতিক নাগরিক বানানোর বদলে সস্তা বিনোদন ও অপরাধের অভয়ারণ্যে ঠেলে দিচ্ছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর পর যেভাবে কেবল একক কোনো পরিবার, বাবা-মা বা বিশেষ একটি ডিভাইসকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে, মার্কসবাদী বিশ্লেষণে তা মূল সংকট থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একধরনের বুর্জোয়া চাতুরি। পুঁজিবাদী গণমাধ্যম কখনোই এই নির্মম সত্যটি স্বীকার করবে না যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও আইনি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দেউলিয়াত্ব। রাষ্ট্র যখন সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তা, সর্বজনীন শিক্ষা ও সুস্থ মানসিক বিকাশের পথ অবরুদ্ধ করে দেয়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অমানবিকতার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, অপরাধীরা এখানে তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের জোরে পার পেয়ে যায়। পুঁজিবাদী রাজনীতিবিদ ও আমলাতান্ত্রিক প্রশ্রয়ই অপরাধীদের প্রতিনিয়ত আরও বেশি দুঃসাহসী ও বেপরোয়া করে তুলছে। মার্কসবাদ কেবল বিদ্যমান বিশ্বকে ব্যাখ্যার দর্শন নয়; এটি সমাজকে আমূল পরিবর্তন করার এক বিপ্লবী হাতিয়ার। অপ্রতিমদের রক্তে ভেজা এই সামাজিক বাস্তবতার ইতি টানতে হলে কেবল আবেগঘন প্রতিক্রিয়া, প্রতীকী প্রতিবাদ কিংবা সাময়িক কিছু আইনি কঠোরতা প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমাজকাঠামোর সমূল পরিবর্তন। এজন্য ভোগবাদী ও পণ্যপূজার সংস্কৃতি থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে মানুষের মূল্য তার ধারণ করা পণ্যের ওপর নয়, বরং তার মানবিক গুণাবলি ও সামাজিক অবদানের ওপর নির্ধারিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল মুনাফা অর্জন বা কর্পোরেট বাজারের দাস তৈরির কারখানা না বানিয়ে, তাকে মানুষের বিবেক, বুদ্ধিবৃত্তি ও মনুষ্যত্ব বিকাশের মূল হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি অপরাধীকে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক শ্রেণি পরিচয়ে না দেখে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ করে নিরপেক্ষ বিচারের পথ সুগম করতে হবে। কুমিল্লার অপ্রতিমের করুণ মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে এটিই স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে যে, বর্তমানে আমাদের সমাজব্যবস্থা এক গভীর নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। এই পচনশীল, বৈষম্যমূলক ও পণ্যমুখী ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে একটি শোষণহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল অপ্রতিম, রাজন বা সায়মাদের মতো নিষ্পাপ শিশুদের অকালমৃত্যুর স্থায়ী ও প্রকৃত প্রতিকার সম্ভব। অন্যথায়, পুঁজিবাদের এই অন্ধপ্রবাহ ও কৃত্রিম চাকচিক্যের আড়ালে এমন নৃশংস মানবীয় অবক্ষয় বারবার আমাদের ঘরের দরজায় করা নাড়বে, এবং এক একটি তাজা প্রাণ ঝরে গিয়ে আমাদের বিবেককে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ করতে থাকবে। লেখক: সভাপতি, সিপিবি, ঝিনাইদহ জেলা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..