নিয়ম নেই, ‘গায়ের জোরে’ ভাওয়াল বনে ময়লার ভাগাড়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রকৃতি ডেস্ক : ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশেই গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। সংরক্ষিত এ বন একসময় ছিল জীববৈচিত্রের নিরাপদ আবাস; যা দখল আর একের পর এক স্থাপনা নির্মাণে পড়েছে হুমকির মুখে। এসবের মধ্যে এখন বনের মাঝে স্থাপন করা হচ্ছে ময়লা ফেলার স্থান। কয়েক দশক ধরেই ভাওয়ালের এ বনে অবৈধভাবে গাছ কেটে দখল ও নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে শালবনের এ সংরক্ষিত বন। শুধু ভাগাড় নির্মাণ নয়, এটি চালাতে সেখানে অস্থায়ী বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। এটিও বনের জন্য হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বনের ভূমিতে নির্মাণের সেই ধারাতেই পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে বর্তমানে তৈরি হয়েছে একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন-এসটিএস)। এ বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও আমলে না নেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বনের যে জায়গায় এসটিএসটি নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে মোট তিনটি দাগ। এর দুটি সরকারি, একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি। বনের ভেতর এ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতেই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে গাজীপুর সিটি। সেখানে সম্প্রতি বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশবিদ ও বন কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বনের ভেতর গিয়ে দেখা গেছে, দ্রুত গতিতে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। সেখানে কর্মরত ঢাকা ডক ইয়ার্ডের প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলম বলেন, ‘ডক ইয়ার্ড নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ওই কাজ সাব-কন্ট্রাকে করছে ডেলমা স্টাকচার বিল্ডার্স।’ ডেলমা স্টাকচার বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল মদবর বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতা ও নিরাপত্তহীনতার মধ্যেই কাজ করছি। সাড়ে সাত হাজার বর্গফুটের এ ময়লার ভাগারের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। ৪ অগাস্ট এটির কাজ শেষ হওয়ার সময় ধার্য করা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে কাজ করতে গিয়ে কয়েক দফা রড, ১০০ ফুট হোল্ডার ক্যাবল, তিন কয়েল বৈদ্যুতিক তার, পাঁচ টন রড, ওয়েল্ডার মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি গেছে। তারপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের এ জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকত। এখন এসব ময়লা মহাসড়কের পাশে না জমিয়ে ভাগাড়ে ফেলার জন্যই গাজীপুর সিটি করপোরেশন এ উদ্যোগ নেয়। এতে সড়কের পাশের এলাকায় ময়লা আবর্জনা কমলেও এখন শালবনের ভেতরের পরিবেশ আরও হুমকি ও উদ্বেগজনক হয়ে পড়বে। এরই মধ্যে উদ্যানের সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে সেখানে প্রবেশ পথ তৈরি করা হয়েছে। সেই পথ ধরে ভেতরে গেলে দেখা যায়, এসটিএসকে ঘিরে বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এটিই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র। অথচ এর পাশেই ঝুলছে সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাইনবোর্ড; যা আসলে পরিবেশ রক্ষার ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ। বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রে কর্মরত এক কর্মী বলেন, এ সপ্তাহের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তারা। এই স্থাপনায় একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার টন বর্জ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। অনুমতির বালাই নেই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বিট কর্মকর্তা আশানুর তুহিন বলছিলেন, এ প্রকল্পের শুরু থেকেই তারা বাধা দিয়েছেন। কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন একপ্রকার ‘গায়ের জোরেই’ সেখানে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র তৈরি করেছে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ‘কোর জোন’ এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে এ ময়লার ভাগার। যদিও বন আইনে ‘কোর জোন’ এলাকায় ময়লার ভাগাড়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি হাই কোর্টে এ বিষয়ে একটি রিট আবেদন করে। এতে বলা হয়, সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে এসটিএস নির্মাণ এবং সেখানে বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন ও ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন। ৪ মে রিটটি আমলে নিয়ে উদ্যানের ভেতরে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। একই সঙ্গে ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশপাশে বর্জ্য ফেলা থেকেও গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে বিরত থাকতে বলা হয়। আদালতের নির্দেশের পর কিছুদিন নির্মাণকাজ বন্ধও ছিল। সিটি করপোরেশন সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ আদালতের মাধ্যমে ওই আদেশ ‘ভ্যাকেট’ করে পুনরায় কাজ শুরু করে বলে জানান জাতীয় উদ্যানের বিট কর্মকর্তা মো. আশানুর তুহিন। তুহিন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন তাদের ক্ষমতা বলে পরে ওই প্রকল্পের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগও নিয়েছে। আমরা কাজের শুরুতে বাধা দিয়েছি, কিন্তু তারা মানেনি। পরে প্রচলিত আইনে বনবিভাগের পক্ষ থেকে আমি বাদী হয়ে জবরদখলের মামলা করি।’ ‘বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাই। মন্ত্রণালয় আবার বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলেও সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। জমিটির একটি অংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন।’ এই বন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা সংরক্ষিত বনের বাইরে তেমন কাজ করি না। এক্ষেত্রে আমাদেরও কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। ‘কোর জোনের’ মধ্যে স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ব্যক্তি মালিকানায় জমিতে কিছু স্থাপনার ক্ষেত্রআইনে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই। ‘তবে এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিপ্তরের কিছু করার আছে। কারণ ময়লা ড্যাম্পিং “হলুদ ক্যাটাগরির” কাজ। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র লাগে। তাদেরও বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেলেও তারা কার্যত কী পদক্ষেপ নিয়ে তা বোধগম্য নয়।’ বাধার পরেও কাজ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রকল্পটি শুরু থেকেই বনবিভাগের আপত্তির মুখে পড়ে। ১১ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের নিয়োগ করা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কাজ শুরু করতে গেলে রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চান। তারা কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও কাজ চলতে থাকে। বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পর দিন রাতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে উদ্যানের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সেখানে রাস্তা তৈরি করা হয়। এরপর নির্মাণকাজ বন্ধ করতে গেলে ‘মব’ সৃষ্টি করা হয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে জড়ো হলে বন কর্মকর্তারা অসহায় হয়ে পড়েন।’ বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য বনবিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেয়নি সিটি করপোরেশন। ১৬ ও ২০ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের নির্মাণকাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, কাজ বন্ধ রাখতে তারা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। তবে তারা কাজ বন্ধে রাজি হননি। সিটি করপোরেশনের দাবি, অবকাঠামোটি ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি জোত জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই জমি জাতীয় উদ্যানের সীমানার মধ্যে অবস্থিত। বহু বছর ধরে সরকারি নীতিমালার কারণে সেখানে শুধু কৃষিকাজের অনুমতি রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকলেও সেখানে বর্জ্য স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হলেও এর ব্যবহার আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য কেন্দ্র নির্মাণের আইনি ভিত্তি নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে কীভাবে একটি বর্জ্য স্টেশন নির্মাণের চিন্তা করা হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, ‘উপযুক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একাধিক এসটিএস প্রয়োজন হলেও জমি সংকটে আমরা বিকল্প পাচ্ছি না।’ গোদের ওপর বিষফোঁড়া বনে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণকাজ চলার মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয়ের বন অধিশাখা-১ ১৪ জুলাই এক চিঠিতে শ্রীপুর পৌরসভা থেকে নির্মিত ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের জন্য বনভূমির ভেতরের প্রায় দশমিক ০৬৩ একর এলাকায় শর্তসাপেক্ষে অস্থায়ী বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। এ চিঠির পর পরিবেশবিদদের মধ্যে উদ্বেগ আরও ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলেন, একদিকে বনে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে; অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ ধুঁকতে থাকা প্রাণ-প্রকৃতিকে আরও বিপন্ন করবে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, “ভাগাড় নির্মাণে বনবিভাগের কোনো অনুমতি নেয়নি সিটি করপোরেশন। জাতীয় উদ্যানের সীমানা প্রচীর ভেঙে তারা প্রথমে যে শেড করেছিল তা উচ্ছেদ করি। ‘এটা নিয়ে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। ময়লার ভাগাড়ের নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে গেলে বনের লোকজন বাধা দিলে ‘মব’ সৃষ্টি করে তাদের সঙ্গে মারমুখী অবস্থা সৃষ্টি করা হয়। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে প্রতিবেদনও পাঠাই। স্থাপনা নির্মাণের শুরুতে কাগজপত্র চাইলেও তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি (তারা)।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন একরকম গায়ের জোরেই বনের ভেতরে ভাগাড় নির্মাণের কাজ করছে। এখন আর সেখানে যেতে পারছি না। আমরা সেখানে গেলে মারমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয়। তবে গাজীপুরবাসীকে এক সময় পরিবেশগত বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হতে হবেই।’ বন কর্মকর্তা ইকবাল বলেন, নানা রকম বর্জ্য যদি এখানে নিয়মিত জমা হতে থাকে, তাহলে পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশ ও বায়ুর মান খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য খেয়ে অসুস্থ হবে, মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে এবং এতে পুরো বাস্তুসংস্থান স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে। ‘পাশাপাশি গভীর নলকূপের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে শালবনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকাও হুমকির মুখে পড়বে। তারপরও এখানকার পরিবেশ রক্ষায় আমরা সর্বোচ্য চেষ্টাটুকু করেছি।’ এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা ভাওয়ালের মত বনভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..