মক্কা জোটে যোগ বাংলাদেশকে ফেলবে চরমে বিপদে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা কোনো সামরিক জোটের অংশ না হয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়-এই নীতিকেই অনুসরণ করেছি। এই অবস্থান শুধু কূটনৈতিক সুবিধাই দেয়নি, বরং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কামড়াকামড়ি থেকেও দূরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এমজেডিএ) বা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের আলোচনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত না জানালেও তাদের ইতিবাচক হাবভাবে আশঙ্কা হচ্ছে-শিগগিরই বোধ হয় আমরা ভূরাজনৈতিক দাবার আরেকটি বোর্ডে পরিণত হতে যাচ্ছি, যেখানে কোটি কোটি মানুষ কচুকাটা হওয়ার অপেক্ষায় থাকবে। প্রশ্নটি কেবল একটি সামরিক চুক্তির নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থেরও। মক্কা চুক্তির মূল দর্শন হলো সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। সদস্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ একটি দেশের সংঘাতে অন্য দেশও জড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা নয়; এটি সরাসরি নিরাপত্তা ও সামরিক অঙ্গীকার। বাংলাদেশের সামনে তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত-এই জোটে যোগ দিলে দেশের কী লাভ হবে? সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ নয়। ইয়েমেনের হুতি সংকট, সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা, তুরস্কের কুর্দি প্রশ্ন কিংবা ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা-এসব কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ অংশীদার নয়। এসব সংকটের উৎপত্তি হাজার মাইল দূরের এক ভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়। তাহলে বাংলাদেশ কেন সেই বাস্তবতার অংশ হতে যাবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই সামরিক ব্লক রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়নি। জন্মের শুরু থেকেই আমরা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সক্রিয় অংশ ছিলাম। শীতল যুদ্ধের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের কোনোটির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে না ফেলার মধ্যেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নিহিত ছিল। আজ যদি বাংলাদেশ একটি সামরিক জোটে যোগ দেয়, তাহলে সেই ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে আমাদের মৌলিক বিচ্যুতি ঘটবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই জোটের ভেতরকার সম্পর্কগুলোও স্থায়ী নয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দ্রুত বদলায়। যে দেশ আজ মিত্র, কাল সে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কয়েক বছর আগেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেছিল। তখন তুরস্ক কাতারের পক্ষে সৈন্য পাঠিয়েছিল। আজ আবার সৌদি আরব ও তুরস্ক একই জোটে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এমন অস্থির সমীকরণের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ জোটে প্রবেশ করা সহজ, কিন্তু জোটের দায়বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসা সবসময় সহজ নয়। বাংলাদেশে মক্কা চুক্তিকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তার একটি অংশ মূলত ভারতকে কেন্দ্র করে। কেউ কেউ মনে করছেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো সামরিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে। এই ধারণা বিপজ্জনক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠার কথা নয়। ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, দ্বিপক্ষীয় সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান সামরিক জোটে নয়; কূটনীতি ও আলোচনায়। কোনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে না, বরং নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এমজেডিএকে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের সামরিক জোট হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় হয়নি; বরং ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতিও। সেই বাস্তবতায় এ ধরনের সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আরও একটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সঙ্গে, ভারত ও চীনের সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে-সবার সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। একটি সামরিক জোটে যোগ দিলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অবস্থানগত নমনীয়তা। দেশটি কোনো পক্ষের নয়, বরং সবার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম। এই অবস্থানই বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করেছে। যে বা যারা এই চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বসিত এবং এই ধরনের জোটে যোগ দিতে ইচ্ছুক, তাদেরকে বিপজ্জনক না ভাবা উচিত হবে না। কোটি কোটি মানুষ এবং এই ভূখণ্ডকে এত বড় ঝুঁকিতে ফেলার আগ্রহ কোথা থেকে জন্ম নিয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। যে কোনো মূল্যে এই বিপদ রুখতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..