বিএনপির পাঁচ মাসের অপশাসন
জনগণের স্বপ্নভঙ্গ
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তরকালে সরকার গঠন করেছে দক্ষিণপন্থি বিএনপি, স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধীদল গঠিত হয়েছে চরম দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সমন্বয়ে; যাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ক্ষমতালোভী কিছু তরুণদের দ্বারা গঠিত দল এনসিপিও শামিল রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ দক্ষিণপন্থি ও অতি দক্ষিণপন্থিদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সংসদে বাম, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির কোনো অবস্থান নেই। দেশের এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই আমরা ‘অভিনব’ বলে আখ্যায়িত করেছিলাম। এই অভিনব পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে আমরা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলেছিলাম- “বিএনপি সরকার তার চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। তার প্রাণভোমরা দেশের জনগণের স্বার্থের মধ্যে নেই অন্য কোনো সিন্দুকে লুকায়িত রয়েছে। লুটেরা ধনিক শ্রেণির সরকার সাময়িকভাবে জনমনরঞ্জনকারী যত কর্মসূচি গ্রহণ করুক না কেন অবশেষে তা জনবিরোধী হতে বাধ্য। তাই রাজপথের লড়াইয়ে কমিউনিস্ট পার্টি ও তার রাজনৈতিক সহযোগীদের সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকতে হবে। পরিস্থিতির অভিনবত্ব হচ্ছে সবসময় আমাদের লড়াই ছিল ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে। একই শ্রেণির দল হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের প্রধান বিরোধীদলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কর্মসূচি দিতে হয়নি। এবারই প্রথম এমন এক প্রধান বিরোধীদল আমরা পেয়েছি যারা স্বাধীনতাবিরোধী, আদর্শগত দিক থেকে পুঁজিবাদী এবং পশ্চাৎপদ চিন্তা প্রচারকারী। যারা সাম্প্রদায়িকতার আলখেল্লার নীচে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী। ফলে এবার সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
বিএনপি ক্ষমতায় বসেছে পাঁচ মাস হয়েছে। এই পাঁচ মাসের শাসনে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেনি। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি ও ব্যক্তির সাথে আপোষ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কিন বশংবদ খলিলুর রহমানকে টেকনোক্রেট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করিয়ে আনার মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোষ করেছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেয়া বিএনপি সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত দেশবিরোধী ‘বাণিজ্য চুক্তি’ বাতিল করেনি। বরং চুক্তি অনুযায়ি বোয়িং কোম্পানির ১৪টি বিমান ক্রয়ের জন্য ৩০ এপ্রিল ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার (৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) চুক্তি করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান একক উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জ্বালানি বিষয়ে এমওইউ স্বাক্ষর করেছে।
বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচন ইশতেহারের কোথাও ‘জনগণের সম্পত্তি’ ব্যক্তিমালিকদের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো অঙ্গীকার না থাকলেও ক্ষমতায় আসীন হয়েই তারা ৪৪টি রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান লুটেরা ধনিকদের কাছে বিক্রি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইস্পাত, বস্ত্র, রাসায়নিক, চিনি, খাদ্য ও পাট খাতের ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পজমি, বিদ্যমান ভবন, ইউটিলিটি সংযোগ ও শিল্প অবকাঠামো, চিনিকলসমূহের আখ চাষের ১০ হাজার একর কৃষি জমি সব কিছু নিলামে তোলা হচ্ছে।
বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেট প্রণয়ন করে জনগণের উপর কর ও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়ায় এ সরকারের চরিত্র পরিপূর্ণভাবে জনগণের কাছে উন্মোচিত হয়েছে। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করে করছাড় কমানো এবং কর আদায় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করের আওতা বৃদ্ধি করার নামে আরো বেশি মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জাল বিছানো হয়েছে। যার ফলাফল হবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর আরো শোষণ বাড়বে। এবারের বাজেটের আকার ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি দুই লাখ তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকা। তাই বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এবারের বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে যে ঋণ নিতে হবে তা ঋণের পরিমাণ বাড়াবে এবং ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বাড়াবে। কর ও ঋণের পুরো বোঝা দেশের গরিব-মেহনতি-শ্রমজীবী মানুষের ঘাড়ে চাপবে।
পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে জননিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হয়েছে। হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন, মব সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বললেও আসলে সংস্কার গতিলাভ করেনি। দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, ব্যাংক লুটসহ অর্থনৈতিক অপরাধের বিচার ও প্রতিকারে সরকার দৃঢ় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, অর্থপাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনা এবং প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরে এখন চালু টার্মিনালের সংখ্যা চারটি। তার মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি রেড সি গেট ওয়ে নামের সৌদি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান টার্মিনাল যা বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড এটি পরিচালনা করছে। বন্দরের এই টার্মিনালটি ড. ইউনূস সরকার যে কোনোভাবেই হোক বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশপ্রেমিক জনতার আন্দোলন ও প্রতিরোধের মুখে তারা বিদেশিদের কাছে বন্দর ইজারা দিতে পারেনি। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার সেই অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
বিএনপি সরকার সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সুরক্ষায় গঠিত নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশকে যুক্ত করেছে। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। তবুও এটি করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার নিজেদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বশংবদে পরিণত করেছে।
বিএনপি সরকার তাদের পাঁচ মাসের শাসনে নিজেদের ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির বরখেলাপ করে পরিপূর্ণ মাত্রায় প্রশাসন দলীয়করণ করেছে। সকল জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশন মেয়র, বিভিন্ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এমনকি নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপির পদাধিকারীকে পদায়ন করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে দলীয় পদাধিকারীদের নিয়োগ দিয়েছে। শিক্ষা প্রসাশন তাদের দখলে নিয়ে নিচ্ছে। ফ্যাসিবাদী আমলেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে বিএনপি সরকার।
সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ওষুধের মূল্য নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান নীতিগত ভিত্তি জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বাতিল করেছে বিএনপি সরকার। এটি ক্ষমতাসীন সরকারের আরেকটি গণবিরোধী পদক্ষেপ। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের স¦াধীনতা দিবস উদযাপনের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন্ন করেছে বিএনপি সরকার।
মোদ্দা কথা বিএনপি সরকারের গত পাঁচ মাসে প্রধানমন্ত্রী নিজের ব্যক্তিগত ইমেজ বাড়ানোর অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু তাদের গৃহিত বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে জনবিরোধী বলে পরিগণিত হয়েছে।
এসময়ে প্রধান বিরোধীদল স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সৎ লোকের শাসনের দাবি অসৎ লোকের অপশাসনে পরিণত হয়েছে। তাদের এমপিদের বিরুদ্ধে সরকারি আর্থিক সহযোগিতা নিজের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে লোপাট, চাকুরির লোভ দেখিয়ে কিশোরীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সারাদেশে জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপকর্মের অভিযোগ উঠছে। শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মব সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠছে। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক শিবির নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির ভিতর বেলচা হাতে প্রবেশ করে ছাত্রদের নিগৃহীত করেছে। মোট কথা জামাত-শিবিরের অপশাসনের রুপ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের প্রতিহত ও প্রতিরোধের যে আওয়াজ গত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আমরা দিয়েছি তা সঠিক ও যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। অপরদিকে তাদের জোট মিত্র এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে দেশের রাজনীতিতে গালি-গালাজের সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে। জামাত জোট শেষ বিচারে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয় করে লুটেরা ধনিকদের স¦ার্থে রাজনীতি করে। এদের বিরুদ্ধে দ্বিবিধ লড়াই শাণিত করতে হবে। তরুণ সমাজসহ দেশবাসীর সামনে ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালে জামাতের ভূমিকা উন্মোচন করতে হবে তেমনি শ্রেণি অবস্থান থেকে সাম্প্রদায়িক মোড়কে পুঁজিবাদী যে রাজনীতি জামাত করে তার বিরুদ্ধেও শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
গত পাঁচ মাসে সরকার ও বিরোধীদলের অপশাসনের নমুনা জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়েছে। এরা জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নিয়ে মশগুল হয়ে আছে। দক্ষিণপন্থি-অতি দক্ষিণপন্থিদের দখলে থাকা জাতীয় সংসদ শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর, মেহনতি জনগণের স্বার্থ দেখবে না। তাই ২৪-র জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর, মেহনতি জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজপথ দখলে নিতে হবে। অপশাসনের রাজনীতির কবর দিতে হবে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন