
বিউটি রানী মন্ডল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সম্প্রতি তাঁর একটি ব্যক্তিগত ভিডিও রিল স্থানীয় ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচকভাবে এক ব্যক্তি ছড়িয়ে দেন। শিক্ষক মব সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সাইবার বুলিং ও ট্রলের শিকার হয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন। ভিডিওতে যা দেখলাম চলতি শ্রাবণ মাসে “শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হোল আকাশে” গানের সাথে হাঁটছেন, প্রাকৃতিক হাওয়ায় তার শাড়ির আঁচলটা আলতো উড়ছে- এই হোল তোলপাড় করা ভিডিও। এখানে অশ্লীলতা, কোন ব্যত্যয়, আইন-শৃঙ্খলা লঙ্ঘন বা প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা কারিকুলাম বহির্ভূত কিছু ঘটেছে বলে মনে হয় না। জানতে ইচ্ছে করে- বাংলাদেশের নারীর জাতীয় পোশাক কী? দেশে কি গান-বাজনা ব্যান হয়েছে? জানলাম- এখানে আইনগতভাবে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। তাহলে কেন কিছু লোকের দৃষ্টিতে এটি অশোভন-দৃষ্টিকটু? নিজের মতের বিপরীতে গেলেই হায়নার মতো কেন হামলে পরতে হবে? দেশে কি আইন-আদালত বা বিচারক নেই যে নিজ দায়িত্বে বিচারপতি হয়ে বসতে হবে?
তবে মনে রাখা দরকার এটি বাংলাদেশ। অধিক সংখ্যক সাধারণ জনগণ অত্যন্ত সংস্কৃতিবান। সাধারণের শক্তি নিশ্চিতভাবে অপরিসীম। আর এই সাধারণ মানুষ যা চায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন বিউটি রানী মন্ডলের সমর্থনে প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করেছেন শিক্ষক সমাজসহ সাধারণ নাগরিক ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন আঙ্গিকে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা চোখে পড়েছে। দেশের শিক্ষক সমাজ পাশে না থাকলে কেসটি হয়তো ভিন্ন মাত্রা পেতো।
কথা পুরোনো হলেও একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে দেশে সক্রিয় সংস্কৃতিচর্চা বিরোধী শক্তির উদ্দেশ্যে বলতে চাই- সংস্কৃতি জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে সংস্কৃতি আমাদের পরিচয় ও মূল্যবোধ। সংস্কৃতি আমাদের শেখায় আমরা কে এবং আমাদের শেকড় কোথায়? ভালো ও মন্দের তফাত বোঝাতে, প্রতি পদে চলার ধরন ও কাজের ওপর সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। সংস্কৃতি মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে এবং সমাজের মধ্যে শান্তি বজায় রাখে। অন্যদের সম্মান করতে, ভিন্ন মতকে মেনে নিতে, মানুষের ভাবের আদান-প্রদান সহজ করে তোলে সংস্কৃতি। শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে সংস্কৃতি আমাদের মনে আনন্দ দেয়। নতুন কিছু শেখায় ও ভাবার শক্তি যোগায়। গান শুনলে মানুষের মন শান্ত হয়, ক্লান্তি দূর করে দুশ্চিন্তা কমায়, আনন্দ বাড়ায়। কথা দিয়ে যা বলা যায় না গান দিয়ে তা সহজে প্রকাশ করা যায়। পছন্দের গান শুনলে মস্তিষ্কে আনন্দের হরমোন ডোপামিন বাড়ে। পুরোনো গান অনেক পুরোনো স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। নিয়মিত গান গাইলে ফুসফুস ভালো থাকে, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম হয়। নৃত্য মনের ভাব ও আবেগ প্রকাশের চমৎকার একটি মাধ্যম। সমাজের মানুষের সাথে মিশতে ও নতুন সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে। সমাজের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। নৃত্য হৃদপিণ্ড ভালো রাখে, শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা বাড়ায়, রক্ত চলাচল সচল রাখে। নৃত্য অবসাদ দূর করে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। আরো বহু সুস্থ- ইতিবাচক দিক রয়েছে। কিন্তু এখানে অসামাজিক, ক্ষতিকারক ও অস্বাস্থ্যকর কিছু নেই। দেশে সামাজিক অবক্ষয়ের বিপরীতে ইতিবাচক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসার ঘটাতে না পারলে আমাদের সামনে মহাবিপদ অপেক্ষা করছে। চলুন আমরা প্রথমে মানুষ হই, সাধ্যমতো দেশের জন্য কাজ করি, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করি।