জুলাই অভ্যুত্থান : ছাত্র-জনতাই ইতিহাসের প্রকৃত মালিক

তামজীদ হায়দার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শুরুতেই পাঠকদের উদ্দেশে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আমরা যে স্বাধীন ভূখণ্ড লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করেছি, সেই বিজয়ের প্রকৃত নায়ক কারা? আবার, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপট কোন শক্তি তৈরি করেছিল? ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানসহ অসংখ্য সংগ্রাম- এসব কি কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির কৃতিত্ব, নাকি ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতার সম্মিলিত লড়াইয়ের ফল? আমার বিশ্বাস, অধিকাংশ মানুষের উত্তর হবে- জনগণই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কোনো গণআন্দোলনের নজির খুবই বিরল, যা ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সফল হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ব বাংলার জনগণের দ্বন্দ্বের মূল কারণ কী ছিল? কেন ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে মানুষ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছিল? মোটাদাগে এর তিনটি প্রধান কারণ ছিল-অর্থনৈতিক শোষণ, জাতীয়-সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ। পূর্ব বাংলার উৎপাদিত সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হলেও পূর্ব বাংলা ছিল চরমভাবে বঞ্চিত। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। তাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার সংগ্রাম। এই লড়াইয়ে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা শ্রেণি নির্বিশেষে সাধারণ মানুষই ছিল প্রধান শক্তি। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের দিকে তাকালেই দেখা যায়, যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্রশ্ন জাগে- রাষ্ট্র কি সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, এখনো কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না, শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন, লাখো শিক্ষিত তরুণ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পান না। শিক্ষা এখনো সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত নয়; অর্থনৈতিক সামর্থ্যই অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নির্ধারণ করে। রাষ্ট্র এখনো নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি, বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাও বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার অসাম্প্রদায়িক, শোষণ বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এদেশের জনগণ পায় নাই। সেজন্য এদেশের শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র জনতা তাদের লড়াই জারি রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশে যত শাসক দেশ শাসন করেছে কারো কাছেই এদেশের মানুষ মাথা নত করে নাই। মাথা নত করে নাই বলেই এদেশে ৯০’র স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নূর হোসেন, আমিনুল হুদা টিটো, শাহাদাত হোসেনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। এদেশের মানুষ মাথা নত করে নাই বলেই ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থান করেছে বিএনপিকে সরকারের বিরুদ্ধে, আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে এক এগারোর আর্মির শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য করেছে, সবর্শেষ বিগত ১৭ বছরের একটা স্বৈরাচারী সরকার সেই হাসিনা সরকারের কাছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী-জনতা তাদের জীবন দিয়ে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য করে। ২৪’র গণ-অভ্যুত্থানের পর কি ছাত্র-জনতা কার কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পেল? এখানে উত্তর “না”। বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর জন্য বার্টোল্ট ব্রেখটের উক্তিটি খুবই প্রাসঙ্গিক “যে যুদ্ধ আসছে, সেটি প্রথম নয়; আগেও যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধ শেষে বিজিতদের মধ্যে সাধারণ মানুষ অনাহারে থেকেছে, বিজয়ীদের মধ্যেও সাধারণ মানুষ অনাহারে থেকেছে।” প্রতিটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর যারা জনগণের বিজয়কে ছিনতাই করে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে লুটপাটতন্ত্র কায়েম করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে তাদেরকে যারা কাঠগড়ায় না দাড় করিয়ে অন্য কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় তারা কি আসলে জনগণের পক্ষের শক্তি হতে পারে? জনগণের পক্ষের কণ্ঠ হতে পারে? ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কি শুধু জুলাই মাসের এক মাসের লড়াইয়ের ফল, নাকি শুধু ২০১৮ ও ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা? ইতিহাস বলে- না। শেখ হাসিনা একদিনে ফ্যাসিবাদী শাসক হয়ে ওঠেননি, তেমনি গণ-অভ্যুত্থানও একদিনে তৈরি হয়নি। ১৭ বছরের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা (রামু, নাসিরনগর, খাগড়াছড়ি), গুম-খুন, দমন-পীড়ন, তনু ও ত্বকী হত্যাকাণ্ডের মতো বিচারহীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মতপ্রকাশের দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে গড়িমসি-আপোস, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, ২০১৫ সালের নারী নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন- সব মিলিয়েই মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমেছে। তাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল সেই দীর্ঘ ১৭ বছরের গণবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে সঞ্চিত জনরোষের বিস্ফোরণ, কোনো একক আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতি নয়। অনেকে মনে করেন, ২০১৪ সালের পর অল-আউট ইউনিটি হলে শেখ হাসিনার পতন আরও আগে ঘটত। এ ব্যাপারে লেলিনের একটি উক্তি হয়তো বোঝাতে সক্ষম যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সঠিক সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। গণ-আন্দোলন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেলিন বলেছিলেন, একটি অভ্যুত্থান সফল হতে হলে তা ষড়যন্ত্র বা কেবল একটি দলের ওপর নয়; বরং অগ্রসর শ্রেণি এবং জনগণের বিপ্লবী জাগরণের ওপর নির্ভর করতে হবে। — *গধৎীরংস ধহফ ওহংঁৎৎবপঃরড়হ* (১৯১৭) ফলে অল-আউট ইউনিটি করলেই, জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল হতে পারত না। জনগণ কি আসলে পুরোনো সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ২০২৪-এর জুলাইয়ে জীবন দিয়েছিল? অবশ্যই না। জনগণ কী চেয়েছিল- তা ২০১৮-২০২৪ সালের বিভিন্ন আন্দোলনের স্লোগান ও গ্রাফিতিতেই স্পষ্ট। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় এবং পরে লেখা স্লোগান ও গ্রাফিতিই তার প্রমাণ। যেমন- “বিকল্প কে? তুমি, আমি, আমরা!”, “পাতা ছেঁড়া নিষেধ!”, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার!”। তাছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের তরফ থেকেই স্লোগান দেওয়া হয়েছিল- “সন্ত্রাস করে তিনটি দল- লীগ, শিবির, ছাত্রদল।” ফলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অনুধাবন করেই হাসিনা সরকারের আমলে সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আন্দোলন করেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো ছাত্রলীগের হামলা ও নির্যাতন উপেক্ষা করেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে মাঠে থেকেছে। বিশেষত ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ১৯৯০-এর অভ্যুত্থানের তিন-জোটের রূপরেখা বাস্তবায়ন করেনি। বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচনে কারচুপি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যাকারী দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন- এসব কারণে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিএনপির সহযোগী ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার করে এবং ভিন্নমতাবলম্বী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তাছাড়া জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে দমন করতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ব্যবহার করা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদাহরণ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। একই সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিস্তার বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে গভীরভাবে আঘাত করে। ফলে প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক জনগণ মানুষের বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষাকে মূল্যায়ন করেই হাসিনা সরকারের শাসনামলে নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে আন্দোলন করেছে। তাই যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রগতিশীলদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়, তারা সচেতন বা অসচেতনভাবেই জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কেন রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিতে পারেনি, সেই দায় কি প্রগতিশীলদের? আমি বলব, না। কারণ একমাত্র প্রগতিশীল দলগুলোই আন্দোলনের শুরু থেকেই এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। হ্যাঁ, প্রগতিশীল দলগুলো আরও ব্যাপকভাবে সামনে থাকতে পারত- সেই সমালোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু সারাদেশে প্রগতিশীল দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কাদের এই আন্দোলনের নায়ক বানাতে চাওয়া হচ্ছে? কোটা আন্দোলন যখন মাত্র শুরু হলো, তখন আন্দোলনটি যাতে প্রতিক্রিয়াশীলদের খপ্পরে না পড়ে, সেই কাজ শুরু থেকেই গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট করে গেছে। গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট সংবাদ সম্মেলন, মিছিল ও সমাবেশ করে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিটিকেই সামনে এনেছিল। আন্দোলনকারীরাও তা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া ঢাকার শাহবাগে যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছিল, তখন সারাদেশে এই আন্দোলনকে কারা ছড়িয়ে দিয়েছিল? নীলক্ষেত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটসহ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। আবু সাঈদকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন বিকেলে বাম জোটের কর্মসূচি থেকে সর্বপ্রথম সচিবালয়ের গাড়ি আটকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ১৯ জুলাই কারফিউ ঘোষণা করা হলে সারাদেশে লড়াই প্রগতিশীলরাই জারি রেখেছিল। যারা প্রগতিশীল রাজনীতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান, তারা কি ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রামের দিনগুলো ভুলে গেছেন? চারদিকে যখন মৃত্যুর মিছিল, তখন শেখ হাসিনার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলির তোয়াক্কা না করে ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে উদীচী, বিবর্তন, চারণসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে গানের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ জুলাই গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট গণগ্রেপ্তার বন্ধ ও ছাত্র গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে কারফিউ ভেঙে কর্মসূচি পালন করে। আবার ৩১ জুলাই সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রেসক্লাব থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত কর্মসূচি- এসবই সেই সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহস ও আস্থার সঞ্চার করেছিল। ১৯ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকার কর্মসূচিগুলোও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো কোনো দ্বিধা ছাড়াই সফল করেছে। ২ আগস্টের দ্রোহযাত্রায় তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রাগীব নাঈম এবং আনু মুহাম্মদের কণ্ঠে প্রথম এক দফার ঘোষণা আসে। সেই দ্রোহযাত্রাই ৩ আগস্ট এক দফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। প্রগতিশীলরা কখনো কোনো আন্দোলন দখল করে নিজেদের আন্দোলন বানাতে চায়নি। তারা আন্দোলনের সামনেই ছিল, কিন্তু তা কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করার কথা ভাবেনি। কারণ জনগণের পক্ষে সঠিক সময়ে সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়াই প্রগতিশীল রাজনীতি। ২০২৪-এর রাজনীতির কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্ট দক্ষিণপন্থী রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দুই বছর দেশ চালিয়েছে, তারাও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল, ২০২৪-এর পর তারা তা পায়নি। শ্রমিক তার ন্যায্য বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন করে গুলি খেয়েছে জুলাইয়ের নামে ক্ষমতায় যাওয়া সরকারের কাছেই। সারা দেশে মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর হামলা এবং ভিন্ন তরিকার মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। জুলাইয়ের পর আদিবাসীদের আন্দোলনে হামলা করা হয়েছে, তাদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। অথচ সেই আদিবাসীরাই জুলাইয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। যে ভোটাধিকারের জন্য শিক্ষার্থীরা লড়াই করেছিল, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিক্রি করে এ দেশে আবারও স্বাধীনতাবিরোধী গণহত্যাকারী দলের সঙ্গে রাজনীতি করা হয়েছে। যারা গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের অমর্যাদা করেছে, তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় না করে প্রগতিশীলদের কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে? ফলে জুলাইয়ের পর আমরা স্লোগান তুলেছিলাম- “মুক্তিযুদ্ধ হারেনি, হেরে গেছে হাসিনা”; “জুলাই হারবে না, হেরে যাবে দেশবিরোধী সকল শক্তি।” প্রগতিশীলরা মনে করে, জনগণই ইতিহাসের মহানায়ক। তাই জুলাইয়ের পর যারা দাসত্বের মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীলরা অতীতের যেকোনো আন্দোলনের মতোই সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আর জনগণই এ দেশের বুকে যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করে স্বৈরাচার কায়েম করতে চেয়েছে, তাদের বিতাড়িত করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে যারা এ দেশে মব সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মামলা-বাণিজ্য এবং দেশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের দিকে ঠেলে দেবে, জনগণ তাদের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবে। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..