সাহিত্যশিল্পকলার চালিকাশক্তি

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আমাদের বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে ৩০ লক্ষ মানুষের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। এখানে সর্বাধিক অংশগ্রহণ ছিলো মেহনতি মানুষের। সাধারণত তাদের স্বপ্ন ছিলো রাষ্টক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে। কিন্তু নেই, এর দখল নিয়েছে লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী। এখন শিল্পকলা ও সাহিত্য দখলে আছে তাদের। সত্যকে আড়াল করাই শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য। কিন্তু একদিন রাষ্টক্ষমতা দখল করবে শ্রমজীবী জনগণ। সাহিত্য ও শিল্পকলার দখল নেবে তারা। সেদিন শিল্পকলা ও সাহিত্যের হবে নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ। সেটা হবে শোষণহীন সমাজবাস্তবতার নিরিখে। শ্রমজীবী মানুষের কর্মকাণ্ড, ইচ্ছা ও ভাবনাই হবে সাহিত্যশিল্পকলার চালিকাশক্তি। এই লক্ষ্যে আমাদের কবিদের এগিয়ে আসতে হবে। সে জন্য বাংলা কাব্যের নতুন বিন্যাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন যার সূচনা করেছিলেন নজরুল, সুকান্ত প্রমুখরা। মানুষ এখন কাব্যে যেমন চায় ব্যক্তির বিশেষত্ব, প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুভব, সেরকমটা আগামীতেও চাইবে। মানুষ খুঁজবে গণ-রূপান্তরের কাজ ও সৌন্দর্যকে। আমাদের কবিদের শোষণহীন সমাজবাস্তববাদের নতুন ভিত্তি ও অধিকাঠামো (ঋৎধসব) বিন্যাসের কাজ একই সাথে করতে হবে। লক্ষ্য পূরণের জন্য কাব্যে শ্রমজীবীদের নিরবিচ্ছিন্ন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেজন্য কবিদের কাজের একাগ্রতা আবশ্যক। কোনো প্রথা অর্থাৎ রীতি, নিয়ম, প্রণালি সমাজে তৈরি হয় শাসকগোষ্ঠীর নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায়। নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা সেটা করে। শ্রেণি বিভক্ত সমাজের এই প্রথা বজায় রেখে নতুন সমাজে পা রাখা সম্ভব না। তাই শ্রমজীবীদের স্বার্থবিরোধী প্রথা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। নতুন-সমাজ-যাত্রী কবিকে এক নতুন প্রভাতে অরুণোদয় দেখতে প্রথা বিরোধী হতে হবে। আমাদের আছে পোশাক-শ্রমিক ও অন্যান্য কারখানার শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ঠেলাচালক, অটোচালক, সিএনজি চালক, পরিবহন শ্রমিক, টিকা শ্রমিক, কৃষক ও ক্ষেতমজুর এমন নানা শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের জীবনযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কবি দরদ দিয়ে সংগ্রহ করবেন এবং শোষণহীন বাস্তবতার সাথে মেলাবেন। আবহমান কাল ধরে মূলত কবিতার দুটি ধারা চলে আসছে। একটি লোককাব্য ও অন্যটি গীতিকবিতা। লোককাব্যের ধারাটিতে শ্রমজীবী মানুষের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হলেও এটি পরিশীলিত নয়। বর্তমান গীতিকবিতার পরিশীলিত ধারাটিতে শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি নগণ্য। এটা প্রাচীর সদৃশ। নতুন ধারার কবিকে এ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রাশিয়ার কবি মায়াকভস্কি, চিলির কবি পাবলো নেরুদা এমনটাই করেছিলেন। নতুন স্বপ্নের কবিকে চর্চার মাধ্যমে তার সৃষ্টিকে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করতে হবে। কবি হবেন চারণ কবি। তিনি শ্রমজীবীদের সমাবেশে তার কবিতা আবৃত্তি করবেন। কবিতা পাঠ করবেন কৃষকের পালা-পার্বণে। কারখানার শ্রমিক নিয়মিত শুনবে তাঁর কবিতা। সুতরাং শ্রমজীবীর জীবন, জীবন-সংগ্রাম, স্বপ্ন, প্রেম, অঙ্গীকার, সাহস, ত্যাগ উঠে আসবে কবিতায়। কবি ঘুরে বেড়াবেন দ্বারে-দ্বারে, পথে-প্রান্তরে, জীবনের মেলায়। তিনি হবেন নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মী। কবি যেমন নিজের দেশের মানুষের জন্য শিল্প সৃষ্টি করবেন, তেমনি দুনিয়ার মুক্তিকামী মেহনতি মানুষের শিল্পীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলবেন। কারণ শোষণের রূপটি যেমন আন্তর্জাতিক তেমনি শোষণমুক্তির লড়াইটিও হবে বিশ্বজনীন। তাই মাতৃভূমির অভিজ্ঞাকে মেলাতে হবে বিশ্বের মেহনতি মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে। এই মুহূর্তে এর প্রয়োজনের ব্যাপকতা অনস্বীকার্য। কারণ দুনিয়াটা এখন প্রযুক্তির বিকাশের ফলে একটি বৈশ্বিক গ্রাম। নতুন দিনের কবির কবিতা ধনিকদের কাগজে, প্রচার মাধ্যমে কমই ছাপবে, প্রচার করবে। প্রকাশনীগুলোর একমাত্র লক্ষ্য ব্যবসা, লাভ তাদের সংস্কৃতি। এর ওপর আছে সাম্রাজ্যবাদের লোমশ হাতের সম্প্রসারণ। কবির বই তারা প্রকাশ করতে চাইবেন না। আর অর্থের বিনিময়ে প্রকাশ করলেও বিপননের দায়িত্ব দেবে কবিকে। তাই কবিগণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন নিজস্ব কাগজ ও প্রচার মাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য। শ্রমজীবী মানুষ সকল অগ্রগতি, সংস্কৃতি, শিল্প সভ্যতার মূলে। তারা নিজেদের জন্য কি কাগজ বের করতে, প্রচার মাধ্যম স্থাপন করতে পারবে না? অবশ্য পারবে। কবি তাদের সাথে মিলে এ লক্ষ্যে কাজ করবেন। কবিকে শ্রমজীবীর সকল গুণ আয়ত্ব করতে হবে। তাদের হৃদয়ের হাজারো প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হবে। কবিকে শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরন্তর ভাবতে হবে। তাঁকে মানুষের জন্য ভাবনাগুলোকে মাথায় নিয়ে ঘুরতে হবে। সকল ভাবনাকে কবি যেনোতেনোভাবে প্রকাশ করবেন না, প্রকাশ করবেন অত্যন্ত শিল্পসম্মতভাবে। হাজার হাজার শব্দের ভেতর থেকে একেকটি শব্দ তিনি বের করে আনবেন। শ্রমিক যেমন যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে তিনি তেমনি শব্দ নিয়ে কাজ করবেন। তার কবিতায় থাকবে আধুনিক সূক্ষ্ম কারুকাজ যা শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করবে। কবির বজ্রনাদী সব শক্তি সঁপতে হবে মেহনতি মানুষের ন্যায়যুদ্ধে। রূপান্তরের কবির কবিতায় থাকবে ঝড়ের গতি। মানুষ ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় বিশ্বাস। সাম্প্রদায়িকতা ও সকল পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে থাকবে কবির স্পষ্ট ঘোষণা, সত্যের পক্ষে মানুষের জন্য ঐক্যের সুর, থাকবে দুনিয়ার মেহনতি মানুষের ঐক্যের প্রেরণায় অমিত তেজ। কবিতা উড়িয়ে দেবে রক্তিম পতাকা একটি সুন্দর মানবিক পৃথিবীর জন্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..