হাম-ডেঙ্গুতে এত প্রাণহানির জন্য দায়ী কারা...

শুভ চন্দ্র শীল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাম ও হামের প্রাদুর্ভাব দেশে এখন মহামারি রূপ ধারণ করেছে। গত দুই বছর যাবৎ হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দেশবাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নবজাতকের মৃত্যু মেনে নেওয়া সত্যি খুব কঠিন। এবছর যে শুধু হাম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে তা নয়, ডেঙ্গুও চোখ রাঙাচ্ছে। করোনা মহামারির পর হাম ও ডেঙ্গুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য আতঙ্ক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৬৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে প্রাণ হারিয়েছে ৯৩ শিশু। অর্থাৎ, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৭৪৫ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার ১৮০, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৭০ জন। সরকারের জরিপ বলছে, প্রতিদিন প্রাণহানি ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৫৫৭ জনের। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের মতো। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে এবারের হামের প্রাদুর্ভাব মূলত বিগত করোনা মহামারির প্রভাবের কারণে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৫-এর শুরুতে ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফ একটি যৌথ প্রতিবেদনে জানায় যে, করোনার কারণে টিকাদান কর্মসূচির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ও অব্যবস্থাপনাপূর্ণ তা করোনা মহামারির সময় মানুষ বুঝতে পেরেছে। জনবল সংকট, অবহেলা, অনিয়ম ও চিকিৎসা খাতে সঠিক তদারকি না থাকায় করোনার পর ডেঙ্গু-হাম জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা দাবি করছেন, স্বাস্থ্যখাতে এবং টিকা-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা আজ ৮০০ ছুঁই ছুঁই। সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে ৯ মাস বয়সী এক শিশু সাউদা মুসকান মারা যায়। তার মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ চারজনের বিরুদ্ধে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে শিশুটির বাবা সিরাজুল ইসলাম মামলার আবেদন করেন। মামলার আরজিতে বলা হয়, শিশুদের টিকার জোগান সময়মতো না থাকা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া, টিকা কেনা এবং তা দেওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মারাত্মক খামখেয়ালিপনা এবং অবহেলার কারণে দেশে ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাউদা মুসকানও একজন। এর আগেও, হাম ইস্যুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছিল। পরে আদালত সেই মামলাও খারিজ করে দেয়। তবে যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তা হচ্ছে- শত শত শিশু মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কেন মামলার আবেদন গ্রহণ করা হবে না। কেন এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে না, কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? শুধু পূর্ববর্তী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে এ সমস্যার সমাধান হবে তা নয়- এর জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ও শৃঙ্খল ফিরিয়ে আনা। যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের মৃত্যুর পেছনে যেমন অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে তেমনই চলতি সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বিক যে ব্যবস্থাপনা দরকার, সেদিকে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সরকার কতটা মনোযোগী তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। হাম ও হামের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বাড়ার পরও হামকে মহামারি ঘোষণা করে সারাদেশে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করাটা সরকারের একটা ‘বড় ভুল সিদ্ধান্ত’ ছিল বলেও মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি জানান, সরকারের মিস ম্যানেজমেন্টের জন্যই এত মৃত্যু হয়েছে। ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ভালো করা গেলে এত মৃত্যু হতো না বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তাই চলমান হাম পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে- বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নাকি বর্তমান বিএনপি সরকার। এসব দায় ও দরদের রাজনীতি বাদ দিয়ে সঠিক পদক্ষেপ ও স্বাস্থ্যখাতে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং হাসপাতালগুলোতে হাম-ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় তৎপর হবার পরামর্শ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের। কারণ, যেভাবে প্রতিদিন প্রাণহানি ঘটছে এতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামীতে হাম-ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে হাম প্রতিরোধে শিশুদের জন্য সরকারের যে টিকাদান কর্মসূচি ও ডেঙ্গু মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে রাজধানীতে মশক নিধনের যে কার্যক্রম–এসব কতটা সুফল বয়ে আনবে তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য সেবাখাত নিয়ে এখনই যথাযথ উদ্যোগ না নিলে বারবার সামনে উঠে আসবে- রোগী মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা-অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণগুলো। লেখক : সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..