কমরেড হাসান নাসির : আইয়ুবের কারাগারে গণতন্ত্রের শহীদ

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি)’র সিন্ধু প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ’র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক কমরেড হাসান নাসিরের নাম প্রথম শুনি গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশকের প্রথমভাগে আমাদের এক রাজনৈতিক সহযোদ্ধা চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের নিজামপুর কলেজের সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা হাসান নাসিরের কাছ থেকে। আমি তখন একটা ব্যাংকে কাজ করি। বর্তমানে সাংবাদিক হাসান নাসির তখন কাজ করতেন একটা কোরিয়ান কোম্পানিতে। সে প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল অফিসার হিসাবে তার ব্যাংকে যাতায়াত। আলাপ থেকে পরিচয়। পরিচয় থেকে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা। একদিন হাসান নাসির গল্পচ্ছলে জানালেন তার পিতা মীরসরাইয়ের বিশিষ্ট শিক্ষক মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন যিনি পাকিস্তান আমলে প্রকাশ্য ন্যাপ ও নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি তার পুত্রের নাম রেখেছিলেন তাঁরই নেতা ১৯৬০ সালে লাহোর দুর্গে নিষ্ঠুর নিপীড়নে শহীদ হাসান নাসিরের স্মৃতিতে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের দুই পারের দুই অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে উপস্থিত পাকিস্তান অংশের এবং ভারতীয় অংশের যারা পাকিস্তানে গিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়তে আগ্রহী তাদের এক সম্মেলনে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি) গঠিত হয়। ভারতের উত্তর প্রদেশের অধিবাসী লন্ডনে ছাত্রাবস্থায় কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত পরে ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহিরকে (১৮৯৯-১৯৭৩) সাধারণ সম্পাদক করে নয় সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করা হয়। কমিটিতে পূর্ববঙ্গ থেকে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ, সুধীন রায় (খোকা রায়), নেপাল নাগ, কৃষ্ণ বিনোদ নাগ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে আসা মনসুর হাবিবুল্লাহ, পশ্চিম পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমানে পাখতুনখাওয়া) মোহম্মদ হোসেন আতা, সিন্ধু প্রদেশের জামালুদ্দিন বুখারী ও শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম। শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন ড্যানিয়েল লতিফি, মিয়া ইফতেখারউদ্দিন, কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, ফিরোজউদ্দিন মনসুর, মির্জা ইব্রাহিম, এরিক সাইপ্রিয়ান, সি আর আসলাম, সি আর মুহম্মদ আফজাল, আমির হায়দার, সৈয়দ সিবতে হাসান, মির্জা ইসহাক বেগ, হাসান নাসির ও হাসান আবিদি। কমরেড সাজ্জাদ জহির ১৯৪৮ সালের মে মাসে লাহোরে যান। তিনি লাহোর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পার্টির উর্দু মুখপত্র ‘নয়া জামানা’ প্রকাশ করেন। সেখানকার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য পাকিস্তান প্রগতি লেখক সংঘকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। পাকিস্তানের উভয় অংশে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের টার্গেটে পরিণত হয় কমিউনিস্টরা। পূর্ববঙ্গে দাঙ্গা সৃষ্টি করে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। হাজার হাজার কমিউনিস্ট দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। যারা দেশে ছিলেন তাদের আশ্রয় হয় কারাগারে। বিনা বিচারে আটক রাখা হয় তাদের। জেলের ভেতর গুলি, নিপীড়ন করে হত্যা করা হয় কমিউনিস্ট নেতাদের। পশ্চিম পাকিস্তানেও কমিউনিস্টদের ওপর একই কায়দায় নিপীড়ন চালানো হয়। বিশেষ করে যে সকল কমিউনিস্টরা ভারত ভূখণ্ড থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তাদের ওপর নিপীড়ন ছিল অসহনীয়। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের অভিযোগ এনে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলা রুজ্জু করে। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) মেজর জেনারেল আকবর খান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষ করে কাশ্মীর নীতির প্রতি রুষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালের ৪ মার্চ সামরিক অভুত্থানের পরিকল্পনা করেন। এতে তিনি তাঁর অনুগত সামরিক কর্মকর্তাদের যুক্ত করেন এবং এ পরিকল্পনা নিয়ে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহম্মদ হোসেন আতার সাথে আলোচনা করেন। জেনারেল আকবর কর্তৃক আস্থায় নেয়া একজন সিআইডি কর্মকর্তা আসগর আলী খান সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয়টি ফাঁস করে দিলে তা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর এগারো জন কর্মকর্তা ও চার জন বেসামরিক ব্যক্তিকে আসামি করে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলা রুজ্জু করা হয়। বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল আকবর খানের স্ত্রী নাসিম আকবর খান, সাংবাদিক ও কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাজ্জাদ জহির এবং পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক কমরেড মোহম্মদ হোসেন আতা। মামলার রায়ে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সাজ্জাদ জহির ও মোহম্মদ হোসেন আতা প্রত্যেকের চার বছর কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও একবছর কারাদণ্ড হয়। এ সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথে কমিউনিস্ট পার্টির যারা যুক্ত ছিলেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন কমরেড হাসান নাসির। রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলার পর পশ্চিম পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর তীব্র নিপীড়ন নেমে আসে। পার্টি নিষিদ্ধঘোষিত না হলেও প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই নিদারুণ কঠিন সময়ে যে কয়জন সদস্য কমিউনিস্ট পার্টির হাল ধরে রাখেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন কমরেড হাসান নাসির। ১৯৫৪ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিকে পাকিস্তানের উভয় অংশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কমরেড হাসান নাসির ১৯২৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারতের হায়দারাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। নানা নবাব মহসিন উল মুলক মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভারতীয় ও ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে মার্কসবাদী হন। দেশে ফিরে তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলে পার্টির নির্দেশে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। তিনি ১৯৫১ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র ফেডারেশন (ডিএসএফ) গড়ায় ভূমিকা রাখেন। কৃষক-শ্রমিকের মাঝে জনপ্রিয় সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৫৪ সালে গ্রেফতারের পর এক বছর কারাবন্দি ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তাকে ভারতে পুশব্যাক করা হয়। তিনি গোপনে পুনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠনে ভূমিকা রাখেন। ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হন। পাশাপাশি নিষিদ্ধঘোষিত পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি সিন্ধু প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর কমিউনিস্টদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন পুনরায় শুরু হয়। কমিউনিস্টদের পুনরায় জেলে ভরা হয়। পাকিস্তান রক্ষা আইনে ১৯৬০ সালের ৬ আগস্ট কমরেড হাসান নাসিরকে করাচি থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে লাহোর দূর্গে আনা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ব্যাপক নিপীড়ন করা হয়। ১৯৬০ সালের ১৩ নভেম্বর রটিয়ে দেয়া হয় কমরেড হাসান নাসির পাজামার ফিতা দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে লাহোর দূর্গে হাসান নাসিরের সহবন্দি রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি পরবর্তীতে পাকিস্তানের বাম আন্দোলনের অন্যতম নেতা মেজর ইসহাক হাসান নাসিরের বিষয়ে জানতে চেয়ে লাহোর হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস রিট করেন। আদালত রিট গ্রহণ করে ২২ নভেম্বর হাসান নাসিরকে কোর্টে উপস্থিত করার আদেশ দেন। ২৪ নভেম্বর সিআইডির এক কর্মকর্তা আদালতকে জানান ১৩ নভেম্বর বেলা ১১টায় হাসান নাসিরকে তাঁর সেলে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, ‘হাসান নাসির পাজামার ফিতে দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলেন।’ ১৯৬০ সালের ৪ ডিসেম্বর হাসান নাসিরের মা মিসেস জারা আলামদার হুসেন হায়দরাবাদ থেকে লাহোরে আসেন সন্তানের লাশ নিয়ে যেতে। প্রথমে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সরকার গড়িমসি করে লাশ দেখাতে। পরে আদালতের নির্দেশে যে লাশ দেখানো হয় তা হাসান নাসিরের লাশ বলে সনাক্ত করতে তাঁর মা অস্বীকৃতি জানান। সরকারের দিক থেকে বলা হয়, হাসান নাসিরকে লাহোরের বিখ্যাত মিয়ানি সাহেব কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু মেজর ইসহাকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা তদন্তকালীন সময়ে কবরস্থানের পাহারাদার ও গোরখোদকদের ভাষ্যানুযায়ী ১৩ নভেম্বরের সমসাময়িককালে পুলিশের তত্ত্বাবধানে কোনো লাশ দাফনের ঘটনা ঘটেনি। অর্থাৎ মিয়ানি সাহেব কবরস্থানে তাঁর দাফন হয়নি। নিষ্ঠুর সামরিক শাসক অজ্ঞাত কবরস্থানে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তাঁকে দাফন করেছে। তাই আজ তাঁর কবরের চিহ্নটুকুও নেই। সন্তানের লাশ না নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় শোকার্ত মা জারা আলামদার হুসেন ১২ ডিসেম্বর কবরস্থানে এক বক্তব্যে বলেন, ‘সে মহৎ কাজের জন্য জীবন দিয়েছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমার আরো সন্তান আছে যারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, যার জন্য হাসান নাসির তার জীবন উৎসর্গ করে গেছে।’ কমরেড হাসান নাসির আইয়ুবের কারাগারে গণতন্ত্রের শহীদ। কমরেড হাসান নাসিরের হত্যাকাণ্ডের ৫৭ বছর আতিক্রান্ত হয়েছে। আজও পাকিস্তানের প্রগতিশীল আন্দোলনে হাসান নাসির এক বীরের মর্যাদায় আসীন। কমিউনিস্ট পার্টির পঞ্চাশের দশকের নেতা সিবতে হাসান তাঁর বই ‘শের-ই-নিগারান’ এ হাসান নাসির সম্পর্কে লিখেছেন। মেজর ইসহাক লিখেছেন ‘হাসান নাসির কি শাহাদাৎ’। পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি), কমিউনিস্ট মজদুর কিষাণ পার্টি, গণতান্ত্রিক ছাত্র ফেডারেশনসহ অন্য বামপন্থি দলসমূহ প্রতিবছর ১৩ নভেম্বর দিনটিকে ‘হাসান নাসির দিবস’ হিসেবে পালন করে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..