
(রাশিয়ার মস্কোতে গত ২৪ থেকে ২৮ মে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধনীতি ও গণতন্ত্রবিরোধী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। সম্মেলনে গত ২৫ মে ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব উন্নয়নের জন্য তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরামে গৃহীত ঘোষণাপত্র পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো)
‘আমরা আপনাদের উদ্দেশে আবেদন জানাচ্ছি মস্কো থেকে–সেই বীর শহর, যে শহর হিটলারের বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছিল। ১৯৪১ সালের কঠিন দিনগুলোতে সোভিয়েত জনগণ সমগ্র বিশ্বকে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে ফ্যাসিবাদ সর্বশক্তিমান নয়; সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ জনগণ যদি তার মোকাবিলা করে, তবে সে পরাজিত হবেই।
তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরাম এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মানবসভ্যতা আবারও গুরুতর বিপদের সম্মুখীন। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো সর্বাত্মক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামরিকতাবাদ, নব্য-ঔপনিবেশিকতা, নব্য-ফ্যাসিবাদ এবং কমিউনিজমবিরোধিতা তাদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। অন্ধকারতম শক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করে অলিগার্কিক পুঁজি জাতিসমূহের ওপর, তাদের শ্রম ও প্রতিভার ওপর, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর এবং মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ও জোরদার করতে বদ্ধপরিকর।
আমাদের চোখের সামনেই পুঁজিবাদ ক্রমশ উদার গণতন্ত্রের বহুরঙা আবরণ সরিয়ে ফেলছে। স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা কম বলছে, আর ক্রমশ বেশি ঝুঁকছে একনায়কতন্ত্র, সন্ত্রাস, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধের দিকে। নানা রূপে ফ্যাসিবাদের পুনর্জাগরণ ঘটানো হচ্ছে। হিটলার, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কো, সালাজার, হোর্থি ও আন্তোনেস্কুর সমর্থকেরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আগ্রাসী সামরিক জোটগুলো তাদের কার্যক্রম বাড়িয়ে তুলছে। জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সাম্রাজ্যবাদীরা রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ, নিষেধাজ্ঞার ফাঁস এবং সামরিক শক্তিকে আরও নির্মমভাবে ব্যবহার করছে।
এসবই মূলত ফ্যাসিবাদী প্রতিশোধের রাজনৈতিক প্রস্তুতি। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো জনগণকে তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতি থেকে বঞ্চিত করতে, প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমগ্র ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধের বীরত্বপূর্ণ অবদানকে খাটো করতে চায়।
আমরা পুনরায় আমাদের আনুগত্য ঘোষণা করছি “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবতাকে রক্ষা করো” শীর্ষক বিশ্বজনগণের ঐক্যের ম্যানিফেস্টোতে উত্থাপিত ধারণা ও উপসংহারগুলোর প্রতি। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে মিনস্কে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরামে গৃহীত এই ম্যানিফেস্টো তার প্রাসঙ্গিকতা সম্পূর্ণভাবে প্রমাণ করেছে। আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সংহতির চেতনা আমাদের ঐক্য ও যৌথ কর্মসূচির ভিত্তি।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন সংগ্রাম আমাদের লড়াইয়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আমরা ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র–যে কোনো উৎস থেকে আসা; স্বেচ্ছাসেবী বা ভাড়াটে; সামরিক, অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক–সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানাই। সন্ত্রাসবাদ মৃত্যু ও ধ্বংস ডেকে আনে, মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে, ভয় ও ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং দুঃখ-কষ্ট ছড়িয়ে দেয়।
জনগণের কর্তব্য হলো সন্ত্রাসবাদের গভীর শিকড়গুলোকে চিহ্নিত করা। এটি কেবল কিছু গোষ্ঠীর উগ্রতা বা কিছু ব্যক্তির অপরাধপ্রবণতার ফল নয়। সামাজিক বৈষম্য, অধিকারহীনতা, দারিদ্র্য, অপমান, বেকারত্ব, হস্তক্ষেপ, গণহত্যা, আধিপত্যবাদ, নব্য-ঔপনিবেশিক নীতি, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা এবং অবরোধের পরিবেশেই সন্ত্রাসবাদ বিকশিত হয়।
আমরা জোর দিয়ে বলি যে পুঁজিবাদ শুধু সন্ত্রাসবাদ দমন করতে অক্ষমই নয়, বরং তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পূর্বশর্তগুলো ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। সন্ত্রাসবিরোধী সংগ্রামকে কেবল পুলিশি অভিযান বা সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এর কারণগুলো–শোষণ, নব্য-ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন, সামাজিক বৈষম্য, বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য, বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য এবং সাম্রাজ্যবাদী জোটগুলোর অস্তিত্ব দূর করাই সময়ের দাবি।
তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরামের অংশগ্রহণকারীরা ইউক্রেনে পরিচালিত বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ফ্যাসিবাদবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানায়। আমরা এই সংগ্রামকে বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সামরিকতাবাদ ও নব্য-নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখি। ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের প্রচেষ্টার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
আমরা জোর দিয়ে বলি যে নব্য-নাৎসিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম নীতিগত প্রশ্ন। এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। এই সংগ্রাম তাদের বিরুদ্ধে, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলকে পুনর্বিবেচনা করতে চায়, হিটলারবাদের সহযোগীদের পুনর্বাসন করতে চায়, ফ্যাসিবাদবিরোধী বীরদের স্মৃতি মুছে ফেলতে চায় এবং বিশ্বকে পুঁজির একচ্ছত্র আধিপত্যের অধীন করতে চায়। এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ মানে জাতিসমূহের নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব, সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমাজতান্ত্রিক পথ বেছে নেওয়ার অধিকারের প্রতি সমর্থন।
আমরা দৃঢ়ভাবে দাবি জানাই যে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা প্রজাতন্ত্রের ওপর তার ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ করুক। কয়েক দশক ধরে কিউবা মর্যাদা ও নির্বাচিত পথের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে আছে। এর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। কিউবার ওপর অবরোধ একটি সমগ্র জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শামিল। কোনো দেশের উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার কারণে তাকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা একটি অপরাধমূলক নীতির উদাহরণ।
আমরা বলিভারীয় ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্রের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি। এর জনগণের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বন্ধ করার দাবি জানাই। আমরা দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং সিলিয়া ফ্লোরেসের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাই। ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দিয়ে তার প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা সেই একই নব্য-ঔপনিবেশিক নীতির বহিঃপ্রকাশ, যা নব্য-ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সামরিক আগ্রাসনের জন্ম দেয়।
আমরা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যা বন্ধের দাবি জানাই। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে গাজা উপত্যকায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং লিবিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। ওয়াশিংটনকে অবিলম্বে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক তৎপরতা পরিত্যাগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত আগ্রাসনের নিন্দা করা।
আমরা সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই–প্রগতিশীল, বামপন্থি, কমিউনিস্ট, দেশপ্রেমিক, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করুন। ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে আমাদের প্রচেষ্টাকে একত্রিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে আমাদের সোভিয়েতবিরোধিতা ও কমিউনিজমবিরোধিতাকে উন্মোচন করতে হবে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ বিশ্বের জন্য লড়াই করতে হবে।
আমরা পৃথিবীর সকল মানুষের প্রতি আবেদন জানাই–প্রতারিত হবেন না। যারা স্বাধীনতার কথা বলে কিন্তু দাসত্ব চাপিয়ে দেয়, তাদের বিশ্বাস করবেন না; যারা গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু পুঁজির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তাদের বিশ্বাস করবেন না; যারা নিরাপত্তার কথা বলে কিন্তু যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়, তাদের বিশ্বাস করবেন না; যারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু বিভেদ ও যুদ্ধ ছড়ায়, তাদের বিশ্বাস করবেন না।
সমঅধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমজীবী মানুষের ভ্রাতৃত্ব এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতেই মানবজাতিকে ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
সাম্রাজ্যবাদ, নব্য-নাৎসিবাদ, কমিউনিজমবিরোধিতা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে না বলুন!
আমরা পৃথিবীকে ধ্বংস হতে দেবো না! নো পাসারান! তারা পারবে না!
শ্রম, সমাজতন্ত্র এবং জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের বিশ্ব জয়ী হোক!
শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি দীর্ঘজীবী হোক!’
মস্কো ২৫ মে ২০২৬