ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তির কোনো প্রয়োজন নেই শি জিন পিংয়ের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং গত বছর যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন চীনের নেতা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর তাঁর দেশের নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর সেই দৃঢ় অবস্থান ট্রাম্পকে এক বছরের বাণিজ্যবিরতি বা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য করেছিল। এই সপ্তাহে যখন সি বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আতিথ্য দিচ্ছেন, তখন তাঁর হাতে খেলার আরেকটি শক্তিশালী কার্ড থাকবে- ইরান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধে ব্যস্ত, সি তখন শান্তির ডাক দিচ্ছেন। উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, যাঁরা এই সংকট অবসানে তাঁর সহযোগিতা চাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিং সফর করেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাবের কথা আরও একবার স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ লি দাউকুই বলেন, ইরান ইস্যুটি আসলে চীনকে সাহায্য করছে। সম্প্রতি শুরু হওয়া শীর্ষ সম্মেলনে ইরান যুদ্ধ সি চিন পিংকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। গত অক্টোবরের পর এটিই দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। হোয়াইট হাউস চীনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যাতে তারা তেহরানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেয়। কারণ, চীন নিষিদ্ধ ইরানি তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। সংঘাত অবসানে সহায়তা করতে চীনের নিজস্ব কিছু কারণ রয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দা চীনের রপ্তানিকে আঘাত করবে, যা দেশটির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি। চীনের কৌশলগত তেলের মজুত সহায়ক হলেও তা সীমাহীন নয়। চীন ইরান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য উৎসাহিত করেছে। তবে তারা এমন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক, যা সমাধানের দায়িত্ব মূলত ওয়াশিংটনের বলে তারা মনে করে। চীন সরাসরি সামরিকভাবে না জড়ালেও তারা হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়েই চীনের আমদানি করা তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। লি বলেন, চীনের পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে যেখানে বলা হবে, ‘চলুন আমরা ইরানকে প্রণালিটি খোলা রাখতে রাজি করাতে একসঙ্গে কাজ করি।’ তিনি আরও যোগ করেন, বেইজিং সম্ভবত এই নিশ্চয়তাও চাইবে, যুক্তরাষ্ট্র যেন ওই জলপথ অবরোধ না করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করার বিনিময়ে তেহরানকে ঋণ, বিনিয়োগ ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে সহায়তার মতো বিভিন্ন প্রলোভন দেখাতে পারে চীন। তবে বেইজিং সম্ভবত তেহরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে চাপ দেবে না। ট্রাম্পের কাছ থেকে সি চিন পিং যা সবচেয়ে বেশি চান, তা অন্য কিছু, সেটি হচ্ছে তাইওয়ানে। সি এই দ্বীপ ভূখণ্ডটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শিথিল করতে চান; সেটি হতে পারে অস্ত্র বিক্রি বিলম্বিত বা হ্রাস করার মাধ্যমে, অথবা ওয়াশিংটন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধী-এমন কোনো বিবৃতির মাধ্যমে। সি যাতে ক্ষুব্ধ না হন, সে জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা স্থগিত করেছে। ট্রাম্প এই সপ্তাহে আবারও বলেছেন, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি যদি তা করেন, তবে ট্রাম্প ‘সিক্স অ্যাসিউরেন্স’ বা ছয় নিশ্চয়তা নামক দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন নীতির একটি স্তম্ভ। ১৯৮২ সালে রোনাল্ড রিগান আমলের এই নিশ্চয়তাগুলো তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যার একটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করবে না। ট্রাম্প যদি এ বিষয়টি আলোচনার টেবিলে তোলেন, তবে তা হবে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে এক বড় বিচ্যুতি এবং এটি সির জন্য বড় এক বিজয় হিসেবে গণ্য হবে। কট্টরপন্থি চীনা পণ্ডিতদের মতে, ইরান যুদ্ধ মার্কিন সামরিক দুর্বলতাকেও উন্মোচিত করেছে, যা বেইজিংকে তাইওয়ান ইস্যুতে চাপ দিতে আরও বেশি সাহস দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধে গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব এশিয়া থেকে তাদের সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজের পণ্ডিত উ জিনবো বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাইওয়ান নিয়ে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এটি এখন বেশ স্পষ্ট। বেইজিংয়ের জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন হয়তো নির্দিষ্ট কিছু ছাড় আদায়ের চেয়েও দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পর্কের ধরনটি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সি হয়তো স্বীকৃতি চাইতে পারেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির তাঁর দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমান। তিনি তাঁর দেশের নেতা হিসেবে ট্রাম্পের সমকক্ষ। ২০১২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সি এটি চেয়ে আসছেন। চীনা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের বোঝাপড়া একটি স্থিতিশীল সম্পর্কের সূচনা করবে, যেখানে অস্বস্তি থাকলেও দুই পক্ষ সহাবস্থান করতে পারবে। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের চীনা প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি মুক্ত বিশ্বের নেতা হন এবং সি চিন পিং তাঁর সমকক্ষ হন, তবে তা সির নেতৃত্ব সম্পর্কে কী বার্তা দেয়? এর অর্থ হলো তিনিও একজন বিশ্বনেতা।’ চীন যুক্তি দিয়েছে, অতি সম্প্রতি সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির একটি সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘বড় শক্তি হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একে অপরের সঙ্গে চলার সঠিক পথ খোঁজা’। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে দ্বিমুখী সুবিধা আশা করতে পারে না। ওয়াশিংটন একদিকে বেইজিংয়ের কাছে তাদের সমস্যার (যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাচাররোধ) সমাধান চায়, আবার অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চীনের স্বার্থের ক্ষতি করে- এই নীতির সমালোচনা করেছে বেইজিং। তবে আট বছর ধরে এই টানাপোড়েনই সম্পর্কের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কোভিড-১৯ মহামারির উৎস থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনা গোয়েন্দা বেলুন ওড়া নিয়ে দুই পক্ষ বিতর্কে জড়িয়েছে। এখন ইরান ও রাশিয়াকে চীনের সমর্থন এবং চীনের কাছে উন্নত কম্পিউটার চিপ ও প্রযুক্তি বিক্রির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষ একে অপরের মুখোমুখি। শেষ পর্যন্ত চীন আরও বেশি স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্য যুদ্ধে বিরতির ধারাবাহিকতা চায়। এর অর্থ হলো আর কোনো শুল্ক নয়, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নয় এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন শাখার পরিচালক আমান্ডা সিয়াও বলেন, তারা কেবল ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের শক্তিশালী করতে কিছুটা সময় এবং সুযোগ চায়। বেইজিং ইতিমধ্যে সেটি করতে শুরু করেছে। সি চিন পিং প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিজ্ঞানে যাকে ‘জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা’ বলছেন, তা তারা গড়ে তুলছে। ছয় মাস আগে দুই নেতার শেষ সাক্ষাতের পর থেকে চীন প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে আঘাত করার সরঞ্জামগুলো আরও শাণিত করেছে। বছরের পর বছর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর এখন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব চিপ তৈরি করছে। ডিপসিকের মতো প্রতিষ্ঠান এমন এআই সিস্টেম ডিজাইন করছে, যা পশ্চিমা বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলে। উসকানি দিলে চীন যে পাল্টা আঘাত করতে পারে, সেটিও তারা প্রমাণ করেছে। গত এপ্রিলে যখন ওয়াশিংটন ইরানি তেল কেনার দায়ে একটি চীনা শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন চীন তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে পরিবেশ ইতিবাচক রাখতে চীন হয়তো বোয়িং বিমান, যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন ও গরুর মাংস কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। মিস সিয়াও বলেন, স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চীনাদের কাছে এটি একটি মূল্য বটে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..